রঙ্গময়ি বলল, সব শুনেছি।
শুনেছ? যাক।
যাক কী? অত হাল ছাড়লে চলবে না।
আমার হাল নেই, মনু। বহুকাল আমার নৌকো বেহাল হয়ে স্রোতে ভেসে চলেছে।
তাই বুঝি?
তা নয় তো কী?
বেশ স্বার্থপরের মতো কথা কিন্তু।
কথাটা কি মিথ্যে?
নয়? হাল তুমি ধরোনি বলেই কি আর কেউ ধরে নেই?
হেমকান্ত একটু হাসলেন। বললেন, হাল ধরেছ নাকি? কাছেই আসতে চাও না তো হাল ধরা!
নইলে এতকাল সত্যিই স্রোতে ভেসে যেতে।
রাজেনবাবু কী প্রস্তাব দিয়ে গেলেন শুনলে তো?
শুনেছি।
এবার বলো কী করা যায়।
কী আবার! তুমি তো সবই জানিয়ে দিয়েছ।
কাজটা কি ঠিক হল?
খুব ঠিক হল। ঢাক-ঢাক গুড়গুড়ের চেয়ে ভাল।
বিয়েটা যদি ভেঙে যায়?
পাগল নাকি? মিঞা-বিবি রাজি তো কাজির সাধ্য কী?
হেমকান্ত বিষণ্ণ মুখে মাথা নেড়ে বললেন, রাজেনবাবুর একটি অন্দরমহল আছে। সিদ্ধান্ত হবে সেখানে। আমাদের বেশিরভাগ সংসারেই গুরুতর সিদ্ধান্তগুলো আসে হেঁসেল থেকে।
আসে, বেশ হয়। তোমার মতো উদাসী পুরুষদের সিদ্ধান্ত হেঁসেল থেকে আসবে না তো কোথা থেকে আসবে?
রাগ করছ কেন? আমি বলছি সেখানে যদি অন্য কোনওরকম সিদ্ধান্ত হয়?
রাজেনবাবুর অন্দরমহলকে আমি ওঁর চেয়েও বেশি চিনি।
চেনো? তা হলে বলল তার মত কী?
তাঁকে আমি সব বলেছি। উনি শুনে মোটেই রাগ করেননি। বরং নিশ্চিন্ত হয়েছেন। পাঁচজনের পাঁচ কথা রটানোর সুযোগ দেওয়ার চেয়ে বিয়ে অনেক ভাল। তাতে একটু ছিঃ ছিঃ হতে পারে বটে, কিন্তু শেষ অবধি মুখে কুলুপ পড়বেই।
হেমকান্ত একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, কৃষ্ণকান্তটা যদি কাছে থাকত।
আবার তার কথা এখন কেন?
সে থাকলে আমি স্বাভাবিক মাথায় সব কিছু চিন্তা করতে পারতাম। এখন অর্ধেক মাথায় কেবল তার কথা ভাবি, বাকি অর্ধেক মাথা নিয়ে বিষয়চিন্তা করি।
সে যে দূরে আছে সেটাও ভগবানের আশীর্বাদ বলে জেনো।
কেন বলল তো!
সে কাছে থাকলে তুমি হয়তো শেষ অবধি আমাকে বিয়ে করার কথা ভেবেই যেতে, কিন্তু করতে পারতে না। তোমার লজ্জা হত, সংকোচ হত।
হেমকান্ত চুপ করে রইলেন। কথাটা যুক্তিযুক্ত।
রঙ্গময়ি বলল, রাজেনবাবু তোমার কাছে আর-একটা কথা জানতে চাইবেন।
সেটা কী?
উনি জানতে চাইবেন তোমার আর আমার বিয়ে কবে হবে।
কী বলব বলো তো!
বলবে হয়ে গেছে।
হেমকান্ত চমকে উঠে বললেন, মিথ্যে কথা বলব?
মিথ্যে হবে কেন? তার আগেই যে আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে।
সে কী?–বলে হেমকান্ত উত্তেজনায় উঠে পড়লেন।
রঙ্গময়ি এগিয়ে গিয়ে হেমকান্তর হাত ধরে বলল, ওরকম করছ কেন? বোসো।
হেমকান্ত বসলেন। বললেন, আমি তো ভেবেই কূল পাচ্ছি না মনু, কী বলছ তুমি!
রঙ্গময়ি হেমকান্তর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার মুখের দিকে চেয়ে বলল, সেই ছোট্ট থেকে তোমার দিকে চেয়ে বসে আছি। মগডালের ফল তুমি, হাতের নাগালে তো নও। একটা জীবন তোমার দিকে চেয়েই কাটিয়ে দিতে পারতাম। আর তো বয়স নেই। রক্ত কত ঠান্ডা হয়ে গেছে। তবু আজ তোমার মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে এই কাজ তোমাকে আর আমাকে করতে হবে। ওদের বিয়ের পর আমরা না হয় কাশীবাসী হব।
কিন্তু আমাদের বিয়ের কথা কী বলছিলে?
আমাদের বিয়ে আজ।
আজ?
চমকে উঠো না। আজ লগ্ন আছে, দিন আছে।
বলো কী?
ঠিকই বলছি। এ তো সানাই বাজিয়ে লোক ডেকে বিয়ে নয়। বিয়ে হবে ঠাকুরবাড়িতে। বাবা পুরোহিত হবেন। যজ্ঞ হবে।
হেমকান্ত নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। স্থির চোখে রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে ছিলেন।
রঙ্গময়ি বলল, জানি এটা বড় সুখের সময় নয়। কৃষ্ণ বাইরে, তোমার মন ভাল নেই। তবু বলি, সময় আর কখনও হবে না।
গোপনে বিয়ে করতে হবে, মনু?
আমি তো তাই বলি। গোপনই ভাল।
হেমকান্ত অনেকক্ষণ ভাবলেন। তারপর অদ্ভুত একটা কথা বললেন, কিন্তু বিয়ে তো উপোসি থেকে করতে হয়।
বিয়ে কতরকম আছে তুমি জানো?
না। তা জানি না।
তবে ওটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। আমি জানি। তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় মতে। একটুও ত্রুটি থাকবে না।
কাজটা কি ভাল হবে, মনু?
তা আমি জানি না গো। পাত্রী পছন্দ না হলে এখনও ভেবে দেখো।
০৯৪. স্বচ্ছ গোলাপি মশারির মধ্যে
স্বচ্ছ গোলাপি মশারির মধ্যে শিশুশরীর আর টুলটুলে মুখখানা অনেকক্ষণ দেখল ধ্রুব। ঠিক বটে, তার নিজস্ব দর্শন অনুযায়ি ওই শিশুকে সে নিজের বা নিজস্ব বলে দাবি করতে পারে না। প্রকৃতির নিয়মে মানুষ জন্মায়। জন্মানোর জন্য দুটি নরনারীকে ওর দরকার মাত্র। তার শরীর থেকে জন্মগ্রহণ করেছে বলেই নিজস্ব বলে দাবি করবে এমনতরো যুক্তি সে মানে না। কিন্তু যুক্তি এক জিনিস, বাস্তবে যা ঘটে তা অন্যরকম। মশারির ভিতরে শোয়ানো ছোট্ট শিশুটিকে দেখে ধ্রুব কেমন নরম হয়ে যাচ্ছিল।
বড় মায়া!
কথাটা শুনে রেমি মুখ টিপে হাসল। তারপর বলল, তাই নাকি? এই তো কী সব অলক্ষুনে কথা বলছিলে?
সেটাও মিথ্যে নয়। আবার মায়াও মিথ্যে নয়।
অত বোকো না তো! ছেলেটাকে একটু ভাল করে চোখ চেয়ে দেখো। আমি যা পারিনি তা হয়তো ও পারবে।
সেটা আবার কী?
তোমাকে বাঁধতে।
ধ্রুব খুব হাসল। বলল, সেকেলে ডায়ালগ দিচ্ছে যে! বাঁধাবাঁধি আবার কীসের? ওকে আমি ছেলেবেলা থেকেই বন্ধনমুক্তির মন্ত্র শেখাব।
তোমার ছেলে, তুমি যা খুশি শিখিয়ো। আর আমি কী শেখাব জানো?
কী?
আমি ওকে শেখাব, এই লোকটাকে যেন সব সময়ে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে থাকে।
পারিবারিক এই আবহাওয়া খুব খারাপ লাগছিল না ধ্রুবর। যদিও সংসারের আবহাওয়া খুব তাড়াতাড়ি বদলায়, তবু সকালটা আজ তার ফুরফুর করে কাটছে। রেমি শরীরের সঙ্গে লেপ্টে বসে আছে, সামনের দরজাটা তবু খোলা।
