হেমকান্ত মাথা নাড়লেন। বুঝেছেন। তারপর বললেন, কিন্তু এ প্রস্তাবটার পিছনে অন্য কিছু নেই তো, রাজেনবাবু? কোনও গুজব বা রটনা?
রাজেনবাবু সামান্য হাসলেন। তারপর হেমকান্তর দিকে একটু চেয়ে থেকে শান্ত গলায় বলেন, রটনা যা-ই থাকুক আমি কিন্তু আপনার চরিত্র জানি। যাকে যথার্থ পৌরুষ বলে আপনার তা আছে। যদি না থাকত তা হলে আজ এ বাড়ির মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব কানেও তুলতাম না।
হেমকান্ত কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। সংকটে তার মাথা গুলিয়ে যায়। বললেন, বিশাখাকে পুত্রবধু হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে এটাই কি আপনার শর্ত?
রাজেনবাবু জিব কেটে বললেন, ছিঃ ছিঃ, শর্ত কীসের? আপনার মতো মানুষকে শর্ত দিয়ে বেঁধে কি ছোট করা উচিত? আমি প্রস্তাবটা করছি অন্য কারণে।
কারণটাই জানতে চাই, যদি বলতে বাধা না থাকে।
রাজেনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, বলতে যে হবে তা জানতাম। তাই অনেক ভেবেছি। ভেবে ভেবে বুঝলাম আপনার সঙ্গে সোজাসুজি এবং খোলাখুলি কথা বলাই ভাল। আপনি তো জানেন, পুরুষমানুষ যেমনই হোক তার পিছনে একটা অন্দরমহল থাকে!
হেমকান্ত মৃদু হেসে বললেন, আমি অন্দরমহলের বিশেষ খবর রাখি না। সুনয়নী বেঁচে থাকতেও রাখতাম না। আর এখন তো আমার অন্দরমহল বলেই কিছু নেই।
রাজেনবাবুও সহাস্যে বললেন, আপনি একদিক দিয়ে ভাগ্যবান। আমাদের শুধু অন্দরমহলের খবরই রাখতে হয় না, ওই চাবির গোছার ঝনৎকার, ওই বালা আর চুড়ির শব্দের মধ্যে যেসব সংকেত আছে সে-সম্পর্কেও হুঁশিয়ার থাকতে হয়।
দুজনেই হাসলেন।
হেমকান্তর হাসি কিছুটা ম্লান। বললেন, বুঝেছি। অন্দরমহলে আমাকে নিয়ে কোনও কথা উঠেছে। তাই না?
রাজেনবাবু হানা কিছু বললেন না। চুপ করে রইলেন। অনেকটা সময় পার করে বললেন, ঠিক তা নয়। মেয়েরা কূটকচালি পরনিন্দা পরচর্চা করে বটে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার অন্দরমহলে একটু অন্যরকম মনোভাবও আছে। আপনার প্রতি আমাদের এক ধরনের দুর্বলতা আছে। আমরা বাস্তবিকই আপনার সুখে সুখী এবং দুঃখে দুঃখী হই। কৃষ্ণ নিরুদ্দেশ হওয়ায় আমার স্ত্রী খুবই কান্নাকাটি করেছেন।
কৃষ্ণকান্ত প্রসঙ্গে হেমকান্ত ফের উদাস হয়ে গেলেন। স্থির দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, আমি বড়ই হতভাগ্য। জীবনে কোনও কিছুকেই আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। যা ঘটবার সবই ঘটে যাচ্ছে, আমার যেন কিছুই করার নেই।
রাজেনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ওরকমভাবে বলবেন না। মানুষ সবসময় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তা বলে আপনাকে কেউ দুর্বলচিত্ত বলে ভাবে না।
হেমকান্ত মৃদু হেসে বললেন, ঠিক সেটাই ভাবে। আমিও জানি যে, আমি দুর্বলচিত্ত। কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন, আমার কখনও কোনও পদস্খলন ঘটেনি।
ছিঃ ছিঃ, সে ইঙ্গিত আপনার শত্রুও করে না।
করে। আমি জানি।
কিছু দুর্মুখ থাকতে পারে, তাদের কথা আলাদা।
দুর্মুখ নয়, যেটা ঘটা স্বাভাবিক সেটাই তারা বলে। কিন্তু আমি এমনই দুর্বলচিত্ত যে, মনু সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে আমার বহু বছর লেগেছে।
মনু!–বলে রাজেনবাবু সোজা হয়ে বসলেন।
হেমকান্তর আর ভয় করল না। দুর্বলতা তিনি কাটিয়ে উঠেছেন। সহজভাবে রাজেনবাবুর দিকে চেয়ে বলেন, হ্যাঁ। মনু। তাকে নিয়েই তো যত রটনা।
রাজেনবাবুর মুখ থেকে হাসিটা মুছে গিয়েছিল। আবার ফিরে এল। বললেন, আপনি কি সত্যিই কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
নিয়েছি। আমরা বিয়ে করার কথা ভাবছি। তবে এখানে নয়, প্রকাশ্যেও নয়।
গোপনীয়তার দরকার আছে কি?
আছে। আমার ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, তারা সামাজিক জীব। আমি তাদের কোনও অস্বস্তিতে ফেলতে চাই না।
রাজেনবাবু একটা স্বস্তির খাস ছেড়ে বললেন, আমার কাজ অনেক সহজ হয়ে গেল।
সহজ হল?
হল। আমি আপনাকে একথাটাই বলতে চেয়েছিলাম।
হেমকান্ত অবাক হয়ে বললেন, সে কী? আপনি আমাদের বিয়ে অনুমোদন করেন?
করি। কারণ আমি পুরুষমানুষ। মধ্যবয়সে স্ত্রী-বিয়োগ ঘটলে যে পুরুষের কী দুর্গতি হয় তা আমি আন্দাজ করতে পারি। অনেককে দেখেছি।
আর আপনার অন্দরমহল?
অন্দরমহলের কথা আলাদা। বাইরের জগতের সবকিছুই তাদের কাছে বাঁকাভাবে গিয়ে পৌঁছয়। আপনি ও নিয়ে চিন্তা করবেন না।
কিন্তু চিন্তার কথা আছে যে। আমার মেয়েটি যদি আপনার অন্দরমহলের কাছে আমার কলঙ্কের জন্যই গ্রহণযোগ্য না হয়?
কলঙ্ক আর থাকছে কই? আপনি যদি মনুকে বিয়ে করেন তা হলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল।
বুড়ো বয়সের বিয়েই কি খুব প্রশংসাযোগ?
আমার অন্দরমহল মনে করেন, পুরুষের বিয়ের বয়সটা বড় কথা নয়। আর আপনার তেমন বয়স হয়েছে বলেও তো আমরা জানি না। আপনি আমার চেয়ে বয়সে অন্তত সাত-আট বছরের ছোট। তাই না?
আমার পঞ্চাশ পূর্ণ হয়েছে।
ছেলেমানুষ। আর মনুও তো হামা দেয় না। সেও যথেষ্ট বয়স্কা মহিলা।
তবু আপনার অন্দরমহলে সব কথাই জানাবেন। আপত্তি থাকলে আমি আর মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে অগ্রসর হব না।
জানাব। তবে আপত্তি যে আর উঠবে না এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন।
রাজেনবাবু চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ স্থিরভাবে বসে রইলেন তিনি। খুব অন্যমনস্ক। গভীর বিষণ্ণ।
সামনেই একটু নড়াচড়া লক্ষ করে চিন্তারাজ্য থেকে বাস্তবে নামলেন। চোখের দৃষ্টি চিন্তামুক্ত হতে সময় নিল। তারপর দেখলেন, রঙ্গময়ি।
