কী বলছ?
ছেলে দেখো।
দেখছি।-বলে ধ্রুব হাসল। আড়চোখে গোলাপি নাইলনের মশারির মধ্যে শোয়ানো ছেলের টুলটুলে মুখখানা কয়েক সেকেন্ড চেয়ে দেখল সে।
রেমি বলল, কী মনে হচ্ছে?
কী আবার মনে হবে?
নিজেকে বাবাবাবা লাগছে না?
ধুর! কে কার বাবা? জন্মানোর জন্য ওর আমাকে এবং তোমাকে দরকার ছিল মাত্র।
ও আবার কীরকম কথা?
দুনিয়াটা ঠিক ওরকমই প্রকৃতির নিয়মে চলে, রেমি।
চুপ করো তো। অত জ্ঞানের কথা ভাল নয়।
০৯৩. প্রস্তাবটা দ্বিতীয়বার তুলতে
প্রস্তাবটা দ্বিতীয়বার তুলতে খুবই লজ্জা করছিল হেমকান্তর। রাজেনবাবু ভাল মানুষ, হয়তো কিছু মনে করবেন না, বরং খুশিই হবেন। কিন্তু হেমকান্ত নিজের মানমর্যাদার কথা ভেবে সংকোচ বোধ করছিলেন। বিয়ের কথা আগে একবার হয়েছিল, বিশাখা অরাজি থাকায় এগোয়নি। এখন আবার এখন নতুন করে প্রস্তাব ভোলার একটা ভাল অজুহাত থাকা চাই।
ভেবেচিন্তে যে কিছু স্থির করবেন তার উপায় নেই। তেরোই ফাল্গুন বিয়ের দিন ধার্য করলে হাতে সময় খুবই কম। রঙ্গময়ি রোজ তাগাদা দিচ্ছে। বলছে, এত সংকোচ করছ কেন? রাজেনবাবুরাও জানে যে, শচীন আর বিশাখা এখন বিয়ের জন্য মুখিয়ে আছে। কেউ কিছু মনে করবে না।
দিনকাল পালটে গেছে। আজকাল ছেলেমেয়েরা নিজেদের বিয়ে নিয়ে নিজেরাই বোধহয় মাথা ঘামায়।
ছুটির দিন দেখে হেমকান্ত একদিন রাজেনবাবুকে দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে পাঠালেন। খুবই একান্তে এবং সাধারণভাবে প্রস্তাবটা করবেন বলে।
নির্দিষ্ট দিনে রাজেনবাবু এলেন। খাওয়াদাওয়ার পর দুজনে বসলেন বাইরের ঘরে।
হেমকান্ত বিনীতভাবে বললেন, আমার দুর্ভাগ্যের কথা তো সবই জানেন।
দুর্ভাগ্য! দুর্ভাগ্য কী বলছেন?
ছেলেটা গৃহত্যাগী হল। মা-মরা ছেলে।–বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হেমকান্ত।
রাজেনবাবু ম্লান হেসে বললেন, বাপ হয়ে ছেলের জন্য উদ্বেগ থাকবে না, তা তো হয় না। তবু বলি অমন ছেলের বাবা হতে পারলে আমি নিজে ভারী গৌরব বোধ করতাম।
একথায় হেমকান্তর চোখে জল এল। সামলাতে একটু সময় নিলেন। তারপর ধরা গলায় বললেন, আমি নানা দিক দিয়েই ভাগ্যতাড়িত। স্ত্রী অকালে চলে গেলেন, ছেলে বিবাগী।
আমরা সব খবরই রাখি, হেমবাবু। ভগবান সবসময়ে তো শুধু দেন না, কিছু নেনও। কত্রী বড় লক্ষ্মীমন্ত ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ায় আমরাও একরকম মাতৃহারা হয়েছি। আমার দুর্দিনে তিনি অনেক সাহায্য করেছেন।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, একবার শচীনের সঙ্গে বিশাখার বিবাহের একটা প্রস্তাব তুলেছিলাম। আপনিও সম্মতি দিয়েছিলেন। নানা ঘটনায় আর সে ব্যাপারে এখোনো সম্ভব হয়নি। এখনও যদি আপনার মত থাকে তবে অগ্রসর হই।
রাজেনবাবু সহসা জবাব দিলেন না। চুপ করে রইলেন। তার বিচক্ষণ মুখখানায় কোনও ভাব প্রকাশ পেল না। একটু পর বললেন, প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য বলেই মনে করেছিলাম। এখনও অমত কিছু নেই। বিশেষত পাত্র ও পাত্রীরও যখন পরস্পরকে পছন্দ। কিন্তু একটা ছোট্ট বাধা হচ্ছে।
হেমকান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কী বাধা?
যদি অভয় দেন তো বলি।
অভয় না দেওয়ার কিছু নেই। আমি খোলামেলা মানুষ।
রাজেনবাবু আবার একটু ভাবলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, আপনি বিপত্নীক। কিন্তু বেশ কম বয়সেই বিপত্নীক হয়েছিলেন। ইচ্ছে করলে আবার বিয়ে করতে পারতেন, কিন্তু করেননি।
হেমকান্ত ভারী অসহায় বোধ করে বললেন, আবার ওসব কথা কেন রাজেনবাবু?
রাজেনবাবু মাথাটা সামান্য নেড়ে বললেন, আমি আপনার পরম শুভাকাঙ্ক্ষী বলেই কথাটা তুলতে চাইছি।
হেমকান্তর অভ্যন্তরে একটা ভয় টিকটিক করছিল। বুঝতে পারছেন, একটা আঘাত আসছে। তবু বলতে হল, বলুন না! সংকোচের কিছু নেই।
রাজেনবাবু গলাখাঁকারি দিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, মানুষ হিসেবে আপনি তুলনাহীন। এমন মাটির মানুষ খুব কম দেখা যায়। আপনার অন্যান্য গুণ সম্পর্কেও আমরা জানি। এই তো সেদিন গুন্ডার ছুরি খেলেন বিনা অপরাধে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন না। আপনার মতো মহৎ বাবা না হলে কি কৃষ্ণকান্তর মতো উজ্জ্বল ছেলে ভূমিষ্ঠ হয়?
হেমকান্ত কুণ্ঠায় চক্ষু নত করলেন।
রাজেনবাবু বললেন, কিন্তু আমরা এও বুঝি আপনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন মানুষ দরকার। যে-সে মানুষ নয়। বেতনভুক কর্মচারী দিয়ে সেবা জিনিসটা হয় না। আপনার বড় দুই ছেলে প্রবাসে, বিশাখার বিয়ে হয়ে গেলে আপনি সম্পূর্ণ একা হয়ে যাবেন। তখন যদি দেখাশোনার লোক না থাকে খুবই অসুবিধে হবে।
আমার অভ্যাস আছে।
রাজেনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, অভ্যাসের কথা বলছেন! আজ শক্তসমর্থ আছেন বলে বুঝতে পারছেন না। বয়স যখন হবে তখন বুঝবেন।
হেমকান্ত চকিতে একবার রাজেনবাবুর মুখের দিকে চেয়ে নিলেন।
রাজেনবাবু বললেন, তাই আমি আপনার কাছে আজ একটা প্রস্তাব নিয়েই এসেছি।
হেমকান্ত নড়েচড়ে বসলেন। বড় অস্বস্তি। আঘাতটা কি আসছে এইবার? যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বললেন, বলুন।
আমি মনে করি কালক্ষেপ না করে আপনার আবার দার পরিগ্রহ করা প্রয়োজন।
কথাটা প্রায় সাধু ভাষায় বলা, তবু অর্থ তো পরিষ্কার। হেমকান্ত সহসা জবাব দিতে পারলেন। চুপ করে রইলেন। রঙ্গময়ির মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। সিদ্ধান্ত তো তিনি নিয়েই রেখেছিলেন। তবু সংকোচ ছিল। ভয় ছিল।
রাজেনবাবু ন গলায় বললেন, আমি সবদিক বিবেচনা করেই কথাটা বলার সাহস পেলাম। একটু স্পর্ধা হয়তো প্রকাশ পেল, কিন্তু যদি আমার পরামর্শ গ্রাহ্য করেন তবে আখেরে মঙ্গলই হবে।
