দায়িত্বে জড়াচ্ছ?
না হয় জড়ালাম। হাত দিয়ে তো পারলাম না, যদি দায়িত্ব দিয়ে পারি।
ডাক্তার কখন আসে?
দশটা নাগাদ।
এখন মোটে আটটা! দুঘণ্টা দেরি।
রেমি একটু নাকি সুরে আবদার করে বলে, তা হোক, আজ না হয় অফিসে একটু দেরিই হবে।
ধ্রুব একটু হাসল। আজ সকালে পরিষ্কার করে দাড়ি কামিয়েছে, চুল আঁচড়েছে, পরনে একটা ধবধবে সাদা পায়জামা, গায়ে পিত্তি রঙের একটা র-সিল্কের পাঞ্জাবি। চেহারাটা বড় বেশি ধারালো দেখাচ্ছে আজ। একটু শীর্ণতায় ওর লাবণ্য নষ্ট তো হয়ইনি, বরং শক্তপোক্ত দেখাচ্ছে। হাসির বিদ্যুৎ মুখখানায় এক দারুণ সৌন্দর্যের আলো ফেলল।
হয়তো-বা ধ্রুবকে এত সুন্দর দেখে রেমি একাই। বারবার এক বিভোর তন্ময়তা পেয়ে বসে। পেয়ে বসে মুগ্ধতা, কাম, তীব্র আকর্ষণ, আজও বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে গেল রেমির। হঠাৎ সে ঘন শ্বাস ছেড়ে বলল, তুমি কি জানো তোমার মতো সুপুরুষ আর-একজনও নেই?
এরকম কথা রেমি কখনও বলে না। ধ্রুব অবাক হয়ে রেমির দিকে চাইল। তারপর বলল, তাই নাকি?
কথাটা কি তোমাকে আর কেউ বলেছে?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, না। কারণ কথাটা সত্যি নয়।
বটে!–বলে রেমি ধ্রুবর কাছ ঘেঁষে বসল। আলতো করে হাত রাখল কাঁধে।
ধ্রুব বলল, সত্যি হলে কেউ না কেউ বলতই। তাছাড়া আর-একটা কথা। আমার শরীরে জমিদারের রক্ত আছে। ব্লু ব্লাড়। জমিদাররা সব সময়ে সুন্দরী মহিলাদের বিয়ে করতেন। ফলে বংশানুক্রমে তাদের বাচ্চারাও সুশ্রীই হত। আমার সেই উত্তরাধিকার থাকতেই পারে। কিন্তু কেবল শারীরিক সৌন্দর্য দিয়ে পুরুষের বিচার চলে না। তার মধ্যে আরও কিছু থাকা চাই।
সেটা কী?
পৌরুষ এবং চরিত্র। আমার তা নেই। এক রকমের চেহারা আছে যা দিয়ে কেবল মেয়ে পটানো চলে। পুরুষের সত্যিকারের সৌন্দর্য ওটা নয়। চেহারা হবে এমন যার সামনে পুরুষ নারী নির্বিশেষে মাথা নোয়াবে।
রেমি শুনছিল না। ধ্রুবর খুব কাছে বসে, তার কাঁধে থুতনি রেখে মুখের দিকে অপলক চোখে চেয়ে ছিল। আফটার-শেভ লোশনের মৃদু গন্ধ আসছিল নাকে। মুগ্ধ, সম্মোহিত হয়ে যাচ্ছিল। এতসব কথার পর হঠাৎ মৃদু স্বরে বলল, আমার সঙ্গে এক ঘরে থাকতে কি তোমার খুব অসুবিধে হয়?
ধ্রুব একটু হাসল। বলল, থাকিনি কি? কিন্তু তোমার মাননীয় শ্বশুরমশাই তো তা হতে দিচ্ছেন না।
উনি বিবেচক বলেই দোতলায় রেখেছেন আমাকে। উনি ভাবেন, বাচ্চা থাকলে সে তো রাতে কদবে, বিছানা ভেজাবে, তুমি হয়তো বিরক্ত হবে।
তাই বুঝি?
তা নয়? একা আমাকেই তো তুমি সইতে পারো না। মাঝরাতে ছেলে রোজ কাঁদলে পারবে?
পারব বললে কি বিশ্বাস করবে? আমাকে তো ট্রায়াল দিয়ে দেখোনি।
ট্রায়াল দেব না হয়। আজই নীচের ঘরে ব্যবস্থা করছি।
ধ্রুব একটু তটস্থ হয়ে বলল, আজ থাক।
কেন? থাকবে কেন?
একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট আবার পালটানো অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার। পরে হবে।
রেমি একটু হেসে বলে, ভয় পেলে?
ভয় না।
রেমি হাসল। করুণার হাসি। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল, জানি গো জানি। আমি মরলে তুমি বাঁচতে।
ধ্রুব খুব গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলে, না। তুমি মরলে আমার কোনও লাভ হত না, রেমি। আমি যদি অন্য কোনও মেয়েকে চাইতাম তা হলেও না হয় হত। আমার সেরকম কেউ নেই।
কিন্তু আমি তো তোমাকে বেঁধে রেখেছি।
তা রেখেছ। তবু প্রথমে যতটা খারাপ লাগত এখন ততটা লাগে না। আচ্ছা, দরজা-ফরজা খোলা রেখে এমন গা ঘেঁষাঘষি করছ আজ কোন সাহসে বলল দেখি? কেউ দেখে ফেলবে না?
দেখুক গে। পরপুরুষ তো নও।
খুব সাহস হয়েছে তো আজকাল?
রেমি একখানা হাত বাড়িয়ে ধ্রুবর মুখ চাপা দিল। বলল, তুমি কাছে থাকলে আমার শরীর-মন সব অন্যরকম হয়ে যায়। কত ভালবাসি তা তো বুঝলে না।
ধ্রুব কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু আচমকাই ঘরের বাতাস প্রকম্পিত করে একটা বাজ পড়ল। বউমা!
সচকিত রেমি ছিটকে উঠে দাঁড়াল। ধ্রুব একা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দেখল, দরজার অতি সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ পর্দার ওপাশে কৃষ্ণকান্ত দাঁড়িয়ে আছেন। কোলে কাঁথায় সযত্নে মোড়া নাতি। ঘরের ভিতরটা তিনি খুব স্পষ্ট ও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন।
ধ্রুব বা রেমি কেউ একটাও শব্দ করতে পারেনি বিমূঢ়তায়।
কৃষ্ণকান্ত পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন। ধ্রুবর দিকে দৃপাত করলেন না। রেমির দিকে চেয়ে বললেন, বাপের বোধহয় এখনও ছেলের মুখ দেখার সময় হয়নি, না মা?
রেমি ঘোমটায় ঢাকা মুখ নত করে থাকে। জবাব দেয় না।
কৃষ্ণকান্ত তপ্তস্বরে বললেন, যদি বাপের সময় বা ইচ্ছে হয় অন্তত তা হলে তাকে একবার আমার দাদাভাইয়ের মুখখানা দেখিয়ে রেখো। অন্তত মুখচেনাটা হয়ে থাক।
এবারও ঘরে স্তব্ধতা।
কৃষ্ণকান্ত নাতিকে রেমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, শরীরটা একটু লালচে দেখাচ্ছে আজ। বুঝলে! হাম-টাম হতে পারে। আজ আর গায়ে জলস্পর্শ কোরো না। তেল-টেলও দিয়ো না। ডাক্তার এলে একবার ভাল করে দেখতে বোলো।
রেমি ছেলেকে কোলে নেয়।
কৃষ্ণকান্ত নাতির ঘুমন্ত মুখখানার দিকে মায়াভরে একটুক্ষণ চেয়ে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে দরজার কাছে যান। একটু থেমে পিছন ফিরে বলেন, পৌরাণিক অভিধান আর কয়েকটা বই থেকে গোটা দশেক নাম বেছে রেখেছি। কোনটা খাপ খাবে তা বুঝতে পারছি না। লিস্টটা পাঠিয়ে দেব, ছেলের বাপকেও বোলো একটু দেখে রাখতে।-বলে কৃষ্ণকান্ত চলে গেলেন।
রেমি ছেলেকে বিছানায় শুইয়ে স্ট্যান্ডের মশারি দিয়ে ঢাকা দিল। তারপর চাপা স্বরে বলল, ওগো।
