কেন তার মাঝে মাঝে মাথাটা এমন কুয়াশায় ঢেকে যায় সেটা সে কিছুতেই ভেবে পায় না। কী হয় তার? কেন হয়?
রেমি এখনও কাউকে বলেনি তার সমস্যার কথা বলার মতো কে-ই বা আছে তার। একমাত্র কৃষ্ণকান্ত। কিন্তু বুড়ো মানুষকে নতুন করে উদ্বেগে ফেলতে চায় না রেমি। ধ্রুবর সঙ্গে তার বড় একটা দেখাই হয় না। ছেলে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর থেকেই রেমি থাকে দোতলায়, ধ্রুব ওপরে আসে না। যতদূর খবর পায়, ধ্রুব আজকাল মদ খাচ্ছে না। একটু রোগা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে অফিসের কাজ নিয়ে বাইরে যাচ্ছে। কিন্তু রেমিকে বা বাড়ির আর কাউকেই সে কিছু বলে যায় না।
রেমির এখন কাউকে দরকার। সব কথা তো সবাইকে বলা যায় না। ঘনিষ্ঠ বিশ্বাসযোগ্য একজন আপনজন দরকার। ধ্রুব ছাড়া আর কেউ তো নেই সেরকম। পরের মতো ব্যবহার বটে তার, কিন্তু রেমির তো আর কেউ নেই।
রেমি অন্যমনস্কভাবে সুন্দর পাত্রটির দিকে চেয়ে ডাকল, রাধা!
কী বলতেছ?
তোর কাকাবাবুর খবর কী রে?
বাড়িতেই তো ছিলেন সকালবেলায়।
এখন নেই?
দেখছি।
তাড়াতাড়ি দেখ। থাকলে একটু ওপরে আসতে বল।
রাধা বউলটা নিয়ে চলে গেল। রেমি প্রত্যাশ্যাহীন অপেক্ষা করতে লাগল। হয়তো আসবে। হয়তো আসবে না। ধুবর তো কিছু ঠিক নেই।
কিন্তু একটু বাদেই সিঁড়িতে হাওয়াই চপ্পলের চেনা শব্দ পেল রেমি। ধক করে উঠল তার বুক। আজও বুকটা এরকম করে! কেন করে তা কে বলবে?
ধ্রুব দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াতেই রেমি দুর্বল শরীরে ওঠে। ভাল করে চেয়ে দেখে মানুষটার দিকে। কীরকম মেজাজে আছে? রাগ না স্বাভাবিক? ঘেন্না নয় তো?
না, ধ্রুবর মুখে ঘেন্না নেই। বরং একটু উজ্জ্বল হাসির পূর্বাভাস তার ঠোঁট ছুঁয়ে আছে।
রেমি আশ্বস্ত হল। বলল, এসো, ঘরে এসো।
চটি খুলে, না না-খুলে?
তার মানে?
শুনলাম ওপরতলাটা নাতির সম্মানে তোমার শ্বশুরমশাই পুরো স্টেরিলাইজ করে রেখেছেন, যার-তার যে-কোনও অবস্থায় ওপরে আসার অধিকার নেই।
আমি তো অতসব জানি না।
আমরা ভুক্তভোগীরা জানি।
তোমাকে ওপরে আসতে কি উনি বারণ করেছেন?
ডাইরেক্টলি করেননি। তবে ফরমান জারি আছে যে, হাত-পা সাবান দিয়ে না ধুয়ে এবং পরিষ্কার জামাকাপড় না পরে কেউ যেন ওপরে না আসে।
তাই বুঝি তুমি আসো না?
অনেকটা তাই। কাজ কি বড়লোকদের সঙ্গে মাখামাখি করে? নীচের তলার লোক আমরা নিচুতেই বেশ থাকি।
বড়লোকের তুমি বুঝি কেউ নও?
আমি! আমি আবার কে? এ লায়াবিলিটি।
তোমার ছেলের জন্যই এসব প্রিকশন নেওয়া হচ্ছে, পরের জন্য তো নয়।
ছেলে? বাপ রে! ও আমার ছেলে নাম-কো-বান্তে। ওর আসল পরিচয় হল, কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীর নাতি।
রেমি হেসে ফেলে। বলে, খুব ইয়ার্কি শিখেছ! এসো তো, তোমার সঙ্গে কথা আছে। চটিটা বাইরেই রাখো বরং।
ধ্রুব চটি ছেড়ে ঘরে আসে। চারদিকে উৎসুক চোখে তাকায়। তারপর বলে, সে ব্যাটা কোথায়? সেই খাঞ্জা খায়ের নাতি?
কার কথা বলছ? ছেলে?
তাই না হয় হল।
তাকে তোমার দেখতে ইচ্ছে করে তা হলে?
ইচ্ছে তো করে মাঝে মাঝে ভাই। তবে কী জানো, আমার তো মোহর নেই যা দিয়ে মুখ দেখব।
ছেলের মুখ দেখতে বাপের বুঝি মোহর লাগে?
তাই তো শুনছি। দাদু নাকি পাঁচ মোহর ডাউন করেছে।
দাদুর ছিল তাই দিয়েছে। তোমার নেই, তুমি দেবে না।
ভরসা দিচ্ছ?
রেমি খুব হাসল। বলল, আসল কথাটা বললেই তো হয়। ছেলে, বউ, সংসার এসবের ওপর তোমার কোনও টান নেই। খামোকা শ্বশুরমশাইকে দুষছ কেন?
ধ্রুব বিছানায় বসে। তারপর পেঁয়ো লোকের মতো চারদিকে চেয়ে চেয়ে ঘরের আসবাবপত্র দেখতে থাকে। স্ট্যান্ডে ছোট্ট দোলনা, ঘরের কোণে পাথরের টেবিলে নতুন কেনা একটা স্টেরিলাইজার, নানারকম ওষুধপত্র, জীবাণুনাশক, একটা ওজন নেওয়ার যন্ত্র, তোয়ালে ন্যাপকিন, বাচ্চার জামাকাপড়ের ছড়াছড়ি। ধ্রুব একটা খাস ফেলে বলে, এত আয়োজন মাত্র একজনের জন্য?
রেমি একটু লজ্জা পেয়ে বলে, শ্বশুরমশাই ওকে বড় ভালবাসেন।
তা বাসুন। কিন্তু ফুটপাথেও বাচ্চা জন্মায় এবং বেঁচে থাকে।
ওসব কথা থাক। প্লিজ!
ধ্রুব হাসল। মাথা নেড়ে বলল, থাক। এখন কেন ডেকে বলো।
আমার একটা বিদঘুটে অসুখ হয়েছে।
কী অসুখ?
মাঝে মাঝে আমি সব ভুলে যাই। এই ঘর, এই বাড়ি, কিছুই চিনতে পারি না। আজ একটু আগেও হল। বাথরুম থেকে ঘরে পা দিয়েই মনে হল, এ ঘর তো আমার নয়। অন্য কার ঘরে ঢুকে পড়লাম আমি। বেশিক্ষণ থাকে না ব্যাপারটা, কিন্তু প্রায়ই হয়।
ধ্রুব মুখ গম্ভীর করে শুনছিল। বলল, মানুষজনকেও চিনতে পারো না?
না।
নিজের ছেলেকেও না?
রেমি একটু ভাবল। তারপর বলল, যখন ওরকম হয় তখন মিনিটখানেকের জন্য মাথাটাই ফাঁকা হয়ে যায়। কিছুই স্মৃতি থাকে না। ছেলেকেও তখন চেনা লাগে না।
ডাক্তারকে বলেছ?
না। ভাবলাম আগে তোমাকে বলি।
ডাক্তার তো রোজই আসে।
আসে।
আজ ডাক্তারকে বোলো। আমরা লে ম্যান, অসুখের কী বুঝি?
আমার কি মাথার গণ্ডগোল হবে গো?
তা কেন? এটা কোনও ডেফিসিয়েন্সি থেকেও হতে পারে। খুব সিরিয়াস কিছু বলে মনে হয় না।
আমার ভীষণ ভয় করে, মনে হয় পাগল হয়ে যাব না তো! সেই ভয়ে ডাক্তারকেও কিছু বলি না।
ডাক্তারকে ভয় কী?
যদি বলে, আপনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন!
দূর বোকা। ডাক্তাররা কখনও ওরকমভাবে বলে না।
রেমি মাথা নেড়ে বলে, আমি পারব না। তুমি ডাক্তারকে বলো।
আমি! আমি কেন?
তুমি আমার স্বামী না?
নাম-কো-বাস্তে।
সে তো জানিই। তবু স্বামী তো। তুমিই বলো।
