বিয়েবাড়িতে কি নজর রাখবে না বলছ?
রাখবে। নিশ্চয়ই রাখবে। তবে অনেক লোক নিমন্ত্রিত হয়ে আসবে। কাজের লোক থাকবে অনেক। তার মধ্যে নজর রাখা খুব মুশকিল।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, আমি চাই না বিপদ মাথায় নিয়ে কৃষ্ণ আসুক।
সে বুদ্ধিমান ছেলে। বিপদ বুঝলে আসবে না।
হেমকান্ত হঠাৎ সন্দিহান দৃষ্টিতে রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে বললেন, মনু, একটা কথা বলবে?
কী কথা? বলো।
তোমার সঙ্গে কি কৃষ্ণর যোগাযোগ আছে?
রঙ্গময়ি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, সরাসরি নেই। তবে মাঝে-মধ্যে খবর পাই।
কী খবর পাও?
ভাল আছে। চিন্তা কোরো না।
ভাল বলতে?
ফেরারি অবস্থায় যতটা ভাল থাকা যায়।
যাদের সঙ্গে আছে তারা তো বিপজ্জনক লোক।
হ্যাঁ। তবে কিশোরগঞ্জে দলের প্রায় সবাই ধরা পড়ে গেছে। বিপজ্জনক হলেও তারা কৃষ্ণকে বুকে করে রাখত। তারা ধরা পড়ায় একটু চিন্তার কথা।
হেমকান্ত হাত বাড়িয়ে রঙ্গময়ির একটা হাত চেপে ধরলেন, মনু, বাপের মুখের দিকে চেয়ে সত্যি কথা বলো।
রঙ্গময়ি বড় বড় চোখদুটো হেমকান্তর চোখে রাখে। তারপর স্ফুরিত অধরে একটু অভিমান প্রকাশ করে বলে, আর আমি ওর মা, একথাটা ভুলে যেয়ো না।
হেমকান্ত তটস্থ হয়ে বললেন, জানি। জানি।
তার জন্য আমারও বুক পোড়ে।
মানছি, মনু।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, মানলে আমাকে সন্দেহ করতে না।
সন্দেহ! কীসের সন্দেহ।
সন্দেহ যে, আমি কৃষ্ণর খবর জেনেও লুকোই।
লুকোও তো ঠিকই মনু, সব কথা আমাকে তো বলো না।
সেটা লুকোব বলে নয়। বলি না বলার মতো খবর নয় বলে।
হেমকান্ত রঙ্গময়ির হাতটা ছাড়লেন না। একটু চেপে ধরে বললেন, বিয়েবাড়িতে সে আসবে এসব কি ঠিক?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, না। আমার সন্দেহ সে আসতে পারে।
সে কোথায় আছে জানেন?
না। কী করে জানব?
হেমকান্ত হতাশায় চোখ বুজলেন! অনেকক্ষণ ঝুম হয়ে বসে থাকার পর উঠলেন। বললেন, ঠিক আছে, ব্যবস্থা করো। বিশাখার বিয়েটাই আগে দিই।
দিন স্থির করা আছে। আমিই দেখে রেখেছি। বাবাকেও দেখিয়ে নেব।
কবে?
ফাল্গুন। তেরোই। মোটে এক মাস হাতে আছে।
০৯২. বাথরুমের দরজা খুলে
বাথরুমের দরজা খুলে এক অচেনা ঘরে পা দিল রেমি। বিশাল জানালা দিয়ে সকালের রোেদ এসে লুটোপুটি খাচ্ছে ঘরে। মস্ত ঘর। আলোয় ঝলমল। কিন্তু অচেনা। রেমির কেমন ভয়-ভয় করল, কেমন অনিশ্চিত হয়ে গেল হাত-পা। কার ঘর? কে থাকে এখানে? তাকে দেখে কেউ কি চেঁচিয়ে উঠে বলবে, কে? কে তুমি? এখানে কেন?
রেমির মুখ থেকে, মাথা থেকে টপটপ করে জল পড়ছে মেঝেয়। মুখ মুছতে ভুলে গেছে সে। কিন্তু তোয়ালেটা হাতে ধরা আছে এখনও। ভ্রু কুঁচকে সে মস্ত তোয়ালেটার দিকে তাকায়। সাদা জমির ওপর আবছা গোলাপি ফুল। খুব দামি, নরম তোয়ালে। কিন্তু কার? অন্য কারও ব্যবহার করা নয় তো! অন্যের ব্যবহার করা ভোয়ালে বা গামছায় মুখ মুছতে বড় ঘেন্না তার।
একটা টাইমপিস টিকটিক করছে নিচু টেবিলের ওপর। বাইরে কাকের ঝগড়া। একটা-দুটো গাড়ির শব্দ। রেমি ঘরের মধ্যে আরও এক পা এগোল। তারপর ফের দাঁড়িয়ে তোয়ালেটা দুহাতে বুকে চেপে ধরে রইল প্রাণপণে। ভয়। ভ্রু কুচকে মনে করার চেষ্টা করল। কিছু মনে পড়ল না। মাথার ভিতরে খুব ঘন কুয়াশা। কিন্তু বিছানার ওপর পাতা মণিপুরি এই ঢাকনাটা তার চেনা। তার ওপর পাতা একটা সবুজ অয়েল ক্লথ। দুটো খুদে পাশবালিশ, একটা ছোট্ট মাথার বালিশ, কথা। কোনও শিশু নেই অবশ্য। এসব খুব অবাক চোখে দেখল রেমি। কিছু মনে পড়ছে না।
বউদি! ও বউদি! জলে যে মেঝে ভিজে গেল গা! ওম্মা!
রেমির বিস্মৃতি এক ঝটকায় কেটে গেল। ঝম করে যেন মাটিতে পড়ল পা। স্বপ্ন থেকে চোখ মেলল জাগরণে। একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল সে। তারপর লজ্জায় তাড়াতাড়ি মুখ মুছতে মুছতে বলল, বাচ্চাটা কোথায় গেল রে, রাধা?
কোথায় আবার? বড়বাবু তাকে টেবিলে শুইয়ে পেট বুক চোখ কান সব দেখছেন মন দিয়ে। দেখো গে যাও। আর তোমার বাচ্চাও বটে দাদুকে চিনেছে। অমন আঁতুড়ে ছেলে যে এমন শেয়ানা হয়!–বলতে বলতেই রাধা একটা ন্যাকড়া বের করে মেঝেটা মুছে ফেলল। তোয়ালেটা রেমির হাত থেকে নিয়ে বাথরুমে রেখে এলা
রেমি দুর্বল শরীরে বিছানায় বসল একটু। রাধা একটা মস্ত চিনেমাটির ঢাকনা দেওয়া সুপ বউল এনে রেখেছে টেবিলের ওপর। ওতে আছে গরম দুধ-সাগু। খেতে হবে। বাধ্যতামূলক এই দুধ-সাগু দেখলেই রেমির ভয় করে, বমি আসতে চায়। কিন্তু তার শ্বশুরের আদেশ খুব কড়া। খেতেই হবে। এতে স্বাস্থ্য ভাল হবে। বুকে দুধ আসবে।
খেয়ে নাও গো বউদি।
আজ অর্ধেকটা খাই, বাকি অর্ধেক বাথরুমে চুপি চুপি ফেলে দে।
চাকরিটা খেতে চাও আমার? গর্দানটাও না যায় সেই সঙ্গে।
উঃ, কী যে জ্বালা।
খেয়ে নাও না নাক চোখ বুজে! খারাপ জিনিস তো নয়। পোয়াতিদের খেতে হয়।
রেমি ঢাকনা খুলে দুহাতে সাদা বউলটা তুলল মুখের কাছে। সহনীয় করার জন্য রাঁধুনি খানিকটা ভ্যানিলা মিশিয়ে দিয়েছে। ছড়িয়ে দিয়েছে এলাচের গুঁড়ো। তবু গা গুলিয়ে ওঠে। খুব ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে খায় রেমি৷ তার শাশুড়ি নেই, মা কাছে থাকে না, কিন্তু একজন তার সব অভাব পূরণ করে চলেছেন। কী আপ্রাণ চেষ্টা! এই দুধ-সাগুর অরুচিকর পদার্থটির মধ্যেও শ্বশুরমশাইয়ের গভীর স্নেহ মিশে আছে।
রেমি বেঁচে ওঠার পর আনন্দে কৃষ্ণকান্ত ঘণ্টা দুয়েক কেঁদেছেন। সেকথা ভাবলে আজও চোখ ভরে জল আসে রেমির। কষ্ট হয় বটে, তবু সে নিঃশেষে দুধ-সাগুটা খেয়ে নেয়।
