সে যেন মহাত্মাজির সঙ্গে গিয়ে একবার দেখা করে।
হেমকান্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, মহাত্মাজি কি ওর কথা জানেন?
আমরা তাঁকে জানাব।
কেন জানাবেন?
কৃষ্ণ খুব ব্রাইট ছেলে। কিন্তু পথটা ঠিক নয়। ও পথে গিয়ে লাভ নেই।
হেমকান্ত একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তা হলে কী বলব তাকে? পুলিশের কাছে ধরা দিতে?
সোমক হাসলেন। বললেন, সেটা মহাত্মাজি স্থির করবেন।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, উনি মস্ত মানুষ। ওঁকে এইসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে বিরক্ত করবেন কেন?
উনি বিরক্ত হবেন না।
হেমকান্তর এ প্রস্তাব পছন্দ হল না। কৃষ্ণ টেররিস্টদের দলে ঢুকেছে, খুন করেছে, ফেরারি হয়ে ঘুরছে। অর্থাৎ চিহ্নিত, দাগী। সে এখন মহাত্মাজির শরণ নিলেও পুলিশ তাকে ছাড়বে না। খুন প্রমাণ না হলেও ছাড়বে না। অন্তত জেলে পুরবেই। তার চেয়ে বরং পালিয়ে থাকা ভাল।
হেমকান্ত বিরস মুখে বললেন, সে যদি আসে তখন দেখা যাবে। এখন কিছুই বলে কোনও লাভ নেই।
আমাদের বিশ্বাস, আজ হোক কাল হোক, সে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেই।
লোকগুলো চলে গেলে হেমকান্ত হাঁফ ছাড়লেন। চিন্তা অবশ্য তার আরও বাড়ল। ঘরে এসে খবরের কাগজ খুলে বসলেন। আজকাল খবরের কাগজ বড় একটা পড়েন না। খবরটা বেশ কয়েকবার পড়লেন। তারপর একজন চাকরকে ডেকে বললেন, মনুকে খবর দে।
রঙ্গময়ি আসতেই বললেন, খবর জানো?
কীসের খবর?
এই যে।
রঙ্গময়ি খবরটা পড়ে একটু সাদা হয়ে গেল। বলল, কারা এসেছিল তোমার সঙ্গে দেখা করতে?
কংগ্রেসের লোকেরা।
কী বলল?
তারাই খবরটা দিয়ে গেছে।
ওরা কী চায়?
ওরা চায় কৃষ্ণকে মহাত্মার কাছে নিয়ে যেতে।
মহাত্মা! ও বাবা! সে যে অনেক বড় ব্যাপার।
তাই তো দেখছি।
গিয়ে কী হবে?
আমি জানি না মনু, আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? পলিটিক্স আমার চেয়ে তুমি ভাল জানো।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলল, না গো, আমি মেয়েমানুষ, অত কি বুঝি? তবে কংগ্রেসের মধ্যে এখন বড় গণ্ডগোল।
পলিটিক্স মানেই গণ্ডগোল। কৃষ্ণ যে কেন ওর মধ্যে ঢুকতে গেল! বোকা ছেলে।
তুমি কিছু কবুল করোনি তো?
না। চিনিই না, কী কবুল করব?
নামগুলো জেনে নিয়েছ?
শুনেছি, তবে মনে নেই। একজনের নাম সোমক দাশগুপ্ত।
রঙ্গময়ি একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, জানি।
কীরকম জানো?
নাম শুনেছি।
নেতা নাকি!
নেতাই। তবে বড় কিছু নয়। নামটা শোনা যায় লোকের মুখে।
কী করব বলল তো!
কী আর করবে? কিছু করার নেই।
ওরা বলল, কৃষ্ণ নাকি ঠিক আমার সঙ্গে দেখা করবে। আমার বিশ্বাস হয় না।
আমার হয়। কৃষ্ণ আসবে?
আসবে। সে তোমাকে ভীষণ ভালবাসে। হেমকান্ত হতাশ গলায় বলেন, সকলেই ওই কথা বলে, কিন্তু আমি তো কিছু বুঝি না। ভালবাসে তো এরকম একবস্ত্রে একবারও না বলে চলে গেল কেন?
নিমাই যখন সন্ন্যাস নেয় তখন কি শচীমাকে বলে গিয়েছিল? ওরকম নিয়মরীতি কিছু নেই গো।
হেমকান্ত চুপ করে রইলেন। হাতে খবরের কাগজ। মনে দুশ্চিন্তা।
রঙ্গময়ি বলল, কতবার বলতে হবে যে, কৃষ্ণর জন্য চিন্তা করার কিছু নেই। ভগবান আছেন, তিনি দেখবেন।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, তোমার মতো ঈশ্বরবিশ্বাসটা আমার পাকা নয়।
তোমার কোনও বিশ্বাসই পাকা নয়।
হেমকান্ত একটু হাসলেন। বললেন, শুধু তোমার ওপর বিশ্বাসটাই খুব পাকাপোক্ত, তাই না?
রঙ্গময়িও একটু হাসে। তারপর বলে, বিশাখার বিয়ে নিয়ে কথাটা কবে এগোবে?
হেমকান্ত বিরক্ত হলেন। তবে বিরক্তি প্রকাশ না করে শান্ত স্বরে বললেন, ওরা খুব অস্থির হয়ে পড়েছে, না?
না। ওরা অবিবেচক নয়। এ অবস্থায় যে তোমার পক্ষে বিয়ে নিয়ে চিন্তা করা মুশকিল তা ওরা জানে। বিশাখা তো ভাইয়ের জন্য প্রায়ই কাঁদে।
আমি ভাবছিলাম কটা দিন গেলে আমার মানসিক অবস্থাটা একটু স্বাভাবিক হত।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, সেটা হবে না। তোমার মনকে আমি চিনি। যতদিন যাবে তত বেশি করে ভাববে, দুশ্চিন্তাও বাড়বে। তার চেয়ে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে থাকো, কোমর বেঁধে কাজে নামো, তাতে খানিকটা ভাল থাকবে। দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেয় কাজ।
বলছ?
বলছি।
তা হলে বোধহয় সেটাই করা ঠিক হবে।
তা হলে বাবাকে দিন স্থির করতে বলি?
বলো।
একটা কথা।
আবার কী?
কৃষ্ণ তার ছোড়দির বিয়ের খবর যদি পায় তা হলে হয়তো এসে পড়তেও পারে।
হেমকান্তর চোখ উজ্জ্বল হল, আসতে পারে?
হ্যাঁ। তার কারণ বিয়েবাড়ির হট্টগোলের মধ্যেই তার পক্ষে আসা সম্ভব। অন্য কোনও সময়ে আসা সম্ভব নয়।
কেন বলো তো!
তুমি কি কিছু টের পাও না?
কী টের পাব?
কৃষ্ণর কথা জেনেও পুলিশ তোমার কাছে একবারও কেন আসেনি?
হেমকান্ত অবাক হয়ে বললেন, কেন? আমার কাছে কেন আসবে?
আসাই স্বাভাবিক ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ করাটাও তো দরকার। তুমি কিছু জানো কি না বা তোমার সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না।
তা বটে।
পুলিশ আসেনি, তার কারণ পুলিশ চব্বিশ ঘণ্টা তোমার বাড়ির ওপর নজর রাখছে।
বলো কী?
সত্যি কথাই বলছি।
কই, আমি তো কাউকে লক্ষ করিনি।
তুমি আবার কবে কাকে লক্ষ করো? বাইরে কদম গাছটার তলায় আজকাল একটা ভিখিরি সারাদিন বসে থাকে। পিছনের আমরাগানে কয়েকটা দারোয়ান খাটিয়া পেতে বসে সারাদিন খৈনি ডলে। একটা নতুন বোষ্টম পাড়ায় ভিক্ষে করতে আসছে আজকাল। একটা আধ-ন্যাংটা পাগলকেও দেখবে সন্ধের কেঁকে বিড়বিড় করে বকতে বকতে এদিক সেদিক ঘুরঘুর করে বেড়ায়।
ও বাবা, এত আয়োজন!
তাই বলছি, এমনিতে কৃষ্ণর পক্ষে আসা বিপজ্জনক।
