একদিন রঙ্গময়ি বেশ চোখা গলায় বলল, দিনরাত বসে বসে ভাবলেই হবে? মেয়ের বিয়ের চিন্তাটা করবে কে? পাড়ার লোক?
হেমকান্তর কানে কথাটা ঢুকল, কিন্তু মগজে কোনও ছাপ ফেলল না। সম্পূর্ণ অন্যমনস্ক চোখে চেয়ে বললেন, কার বিয়ে? কী ভাবব?
এই মানুষকে নিয়ে কী যে করি!
হেমকান্ত মৃদু একটু হাসলেন। বললেন, এই মানুষটা যে অপদার্থ তা তো বহুকাল ধরে জানো। নতুন করে চিনলে নাকি?
অপদার্থ একবারও ভাবি না।
তুমি না ভাবলেও লোকে ভাবে।
কেউ ভাবে না। শুধু বলতে এসেছিলাম ভাবন কাজি হয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। বিশাখার বিয়ের কথাটা একটু মনে রেখো।
ও তুমি মনে রাখো গে। আমার ওসব নিয়ে ভাববার মতো মনের অবস্থা নয়।
আচ্ছা লোক, তুমি বাপ না! আমি ভাবলে কী হবে? আর শুধু ভাবলেই তো চলবে না, উদ্যোগ নিতে হবে।
কটা দিন থাক, মনু।–হেমকান্ত কাতর স্বরে বললেন।
দিন আর কত যাবে বলো তো! বিশাখার কত বয়স হল হিসেব আছে?
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন।
রঙ্গময়ি চাপা স্বরে বলে, আর শুধু তাই-ই তো নয়, দেব-দেবীর মুখ তত দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে তোমার এই উদাস ভাব দেখে। তুমি তো কোনওদিকে তাকাও না, কিছু লক্ষও করো না।
বিশাখা আর শচীনের কথা বলছ নাকি?
তাছাড়া আবার কে?
হেমকান্ত আর-একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, বিয়েটা দেওয়া তা হলে দরকার বলছ!
দরকার। খুব তাড়াতাড়ি দরকার।
সে-বিয়েতে কৃষ্ণকান্ত তো থাকবে না, মনু।
কৃষ্ণর কথা কেন ভাবছ বলো তো! বাপহয়েছ বলেই কি তার ওপর তোমার যোলো আনা অধিকার? তাকে দেশের দরকার নেই, মানুষের দরকার নেই? ছেলে বুকে আগলে বসে থাকাটাই কি রীতি?
তা বলিনি।—হেমকান্ত বিষাদমাখা মুখে বললেন, বলছিলাম যে, বিশাখাকে তো বড় ভালবাসে। ছোড়দির বিয়েতে সে থাকবে না?
ওসব মেয়েলি ভাবনা তোমাকে মানায় না। কৃষ্ণ যেমন সত্যিকারের পুরুষ, তার বাপ হিসেবে তোমারও কিছু পৌরুষ দেখানো দরকার।
তুমি বড্ড ক্যাট ক্যাট করে কথা শোনাও, মনু।
তা শোনাই। আমার কপালই যে অমন। নইলে তোমার কানে কথা ঢুকবে কেন? কৃষ্ণর কথা সারা শহরের লোক ভাবছে। সারা দেশ ভাবছে।
ভাবছে?
বিশ্বাস হচ্ছে না?
কী জানি!–বলে হেমকান্ত চুপ করে গেলেন।
কিন্তু সারা দেশ না হোক, কৃষ্ণর নাম যে রাজনৈতিক মহলে পৌঁছে গেছে তার প্রমাণ পেতে হেমকান্তর বিশেষ দেরি হল না।
একদিন সকালবেলা কয়েকজন অচেনা লোক দেখা করতে এল।
খবর পেয়ে হেমকান্ত বৈঠকখানায় গিয়ে দেখেন, ধুতি এবং পাঞ্জাবি পরা বিশিষ্ট চেহারার কয়েকজন মানুষ। যুবক, মধ্যবয়স্ক দুরকমই আছে। মধ্যবয়স্কদের একজন বেশ ফরসা, মুখে আভিজাত্যের ছাপ। হাতজোড় করে বললেন, আমার নাম সোমক দাশগুপ্ত। আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে এলাম।
সোমক দাশগুপ্ত নামটা চেনা মনে হল না হেমকান্তর। প্রতিনমস্কার করে বসলেন, লক্ষ করে দেখলেন আগন্তুকদের পরনে খদ্দরের পোশাক। একটু স্বদেশি মার্কা চেহারা।
সোমক বললেন, আমরা কৃষ্ণকান্তর কথা কাগজে পড়েছি।
কাগজে?–হেমকান্ত সোজা হয়ে বসে বললেন, কাগজে তার কথা বেরিয়েছে নাকি?
আজকের কাগজেই আছে।–বলে একজন ভাঁজ করা একটা বাংলা খবরের কাগজ এগিয়ে দিল।
ভিতরের পাতায় ছোট্ট একটু খবর লাল পেনসিলে দাগান। কিশোরগঞ্জের এক গ্রামে একদল বিপ্লবী পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। দলের কয়েকজন পালিয়ে যায়। তাদের মধ্যে পুলিশ একজনকে চিনতে পেরেছে। জমিদার হেমকান্ত চৌধুরীর নিরুদ্দিষ্ট ছেলে কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী।
হেমকান্ত আর্তনাদ করে উঠলেন, সর্বনাশ!
সকলে চুপ।
একটু বাদে সোমক বলেন, বাবা হিসেবে আপনার দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক। কিন্তু কৃষ্ণকান্ত আমার ছেলে হলে আমি গৌরব বোধ করতাম।
হেমকান্ত অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর বললেন, আমার এই ছেলেটির অনেক সম্ভাবনা ছিল। ভারী মেধাবী, সাহসী। ও চলে যাওয়ায় আমার একটা অবলম্বন হারিয়ে গেছে।
সোমক বললেন, জমিদারদের ছেলেরা যেমন হয় আপনার ছেলে তেমনি হয়নি। এটা খুব শুভ লক্ষণ। আমার বাবাও জমিদার। যশোরে আমাদের বিষয়-সম্পত্তি আছে।
হেমকান্ত চুপ করে লোকটার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। কথাগুলো ভাল বুঝতে পারছিলেন। কৃষ্ণ পালিয়েছে। কিন্তু কতদিন পালিয়ে থাকতে পারবে? হয় ধরা পড়ে জেল খাটবে, ফাঁসি হবে, কিংবা গুলি খেয়ে মরবে। অস্থিরতায় মাথাটা নাড়লেন হেমকান্ত। বলে উঠলেন, নাঃ।
সকলে তাকে নিবিষ্ট চোখে দেখছিল। হেমকান্ত সচেতন হয়ে লজ্জা বোধ করেন। শ্বাস ছাড়তে গিয়ে টের পেলেন, খাসের বাতাসটা কেঁপে গেল।
সোমক বললেন, আমরা কংগ্রেস করি। তবে টেররিস্ট দলের নই। সেই ব্যাপারেই আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলার ছিল।
আমি রাজনীতির কিছুই বুঝি না। আমাকে বলে কী লাভ?
যদি কখনও কৃষ্ণকান্ত আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে তা হলে আমাদের কথা আপনি যদি দয়া করে বলেন তা হলে খুব উপকার হবে।
আমার সঙ্গে সে কি যোগাযোগ করবে বলে আপনাদের ধারণা?
শুনেছি সে অত্যন্ত পিতৃভক্ত।
হেমকান্তর বুকটা দুলে উঠল গর্বে, আনন্দে, অহংকারে। কিছু বলার মতো খুঁজে পেলেন না।
সোমক বললেন, টেররিস্ট দলে একবার ঢুকলে অবশ্য বেরিয়ে আসা মুশকিল। তবু কৃষ্ণ হয়তো পারবে। তার নামে অন্তত মার্ডার চার্জ নেই।
নেই?–হেমকান্ত খুব উগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করলেন।
না। থাকলে আমরা খবর পেতাম।
কী বলতে হবে কৃষ্ণকে?
