বল না।
আমি তোমাকে এত ভালবাসি বলেই তুমি ঠেকাতে পারেনি আমাকে। সত্যিকারের ভালবাসার কাছে ধরা তো দিতেই হয়।
সমস্যা সেখানেও।
কীসের সমস্যা?
তোর অত ভালবাসা কোথা থেকে এল? ইজ ইট বিলিভেবল?
আমি ঢং করছি না গো।
জানি। তবু বিশ্বাস হচ্ছে না।
এক কাজ করবে?
কী কাজ?
আজ রাতটা আমার কাছে থাকো।
তার মানে?
মানে আমার দুরকম হয় নাকি? মানে একটাই। আজ আমার কাছে থাকো।
ধ্রুব কিছুক্ষণ নোটনের দিকে চেয়ে থেকে বিভ্রম বোধ করল। প্রস্তাবটা তার প্রত্যাখ্যান করতে ইচ্ছে হল না। কিন্তু সে বললও না কিছু।
ঘেন্না হচ্ছে?
বার বার ঘেন্নার কথা বলছিস কেন?
তা হলে থাকো।
ধ্রুব মৃদু একটু হাসল। বলল, বাড়িতে মা ভাই নেই?
ওখানে কে যাবে?
তা হলে?
কোনও হোটেলে চলো।
ধ্রুব হতাশায় মাথা নাড়ল, না রে। ওটা খারাপ দেখাবে, খারাপ লাগবে।
খারাপ কেন?
মনে হবে যেন তোকে নিয়ে ফুর্তি করছি। তা তো নয়।
না, তা নয়। তা হলে?
নোটনের উন্মুখ ভাব দেখে ধ্রুব বলে, অত অস্থির হচ্ছিস কেন?
নোটন বলে, অস্থির হব না? কী জীবন যাপন করি জানো?
সে-জীবন থেকে তোকে বাঁচাবে কে?
তুমি। তুমি ছাড়া আর কে?
কীভাবে? তোর সঙ্গে রাত কাটিয়ে?
মাথা নেড়ে নোটন বলে, না। কিন্তু যদি আমি বুঝতে পারি আমার জন্য তুমি আছ তা হলে এখনও আমার আশা আছে।
কীসের আশা, নোটন?
এই বহু পুরুষের সঙ্গ করা, অনেকের মন রেখে চলা, দিন রাত টাকা রোজগারের কথা ভাবা, এসব থেকে মুক্তি।
রোজগার করা কি খারাপ?
খারাপই তো। মেয়ে হয়ে রোজগার করে মরছি। আমার যে ভাল লাগে না।
তোর শরীরে এখনও পুরুতের রক্ত রয়ে গেছে।
আছেই তো। আমি ইচ্ছে করে রোজগারে নামিনি।
যখন নেমেছিস তখন মেনে নেওয়াই তো ভাল।
আমাকে এড়াতে চাইছ?
মোটেই নয়।
শোনো, আমার জন্য তোমাকে কিছুই করতে হবে না। বিয়ে করতে বলব না, ভরণ পোষণ চাইব না, রাত কাটাতেও না। শুধু আমাকে তোমার বলে ভেবো একটু, একটু ভালবেসে তা হলেই হবে। আর যখন খুব কান্না পাবে তখন কাছে ডাকলে এসো। তোমাকে কিল চড় ঘুসি মারব হয়তো, তারপর বুকে পড়ে কাঁদব। সেটুকু সহ্য কোরো। পারবে না এটুকু?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, এই যা বলছিস এও তোর মনের কথা নয়। যেরকম চাইছিস সেরকম পেলেও তুই খুশি হবি না। তোর ভিতরে বড় অস্থিরতা।
ঠিকই তো। ভীষণ অস্থিরতা। মাঝে মাঝে পাগল-পাগল লাগে।
যে জীবন কাটাচ্ছিস তা অ্যাকসেপ্ট করতে পারছিস না।
ঠিক তাই।
আমি বলি অ্যাকসেপ্ট করে নে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তুমি একথা বলবে কেন?
আমি যা বিশ্বাস করি তাই বলি।
না। তুমি এরকম জীবন বউদিকে যাপন করতে দেবে?
ধ্রুব হাসল। বলল, এখন বুঝলাম তুই আমাকে সত্যিই চিনিস না।
কেন?
আমি রেমি সম্পর্কে অন্ধ নই, পজেসিভও নই।
প্লিজ, ওরকম বোলো না। ভয় পাই।
ভয় পাস কেন?
তোমাকে অত নিষ্ঠুর ভাবতে ভয় করে।
গাড়িওয়ালা লোকটা এতক্ষণ দক্ষিণে চলছিল। এবার জিজ্ঞেস করল, বাঁ হাতি রাস্তাটা নেব? ধ্রুব সচকিত হয়ে বাইরের দিকে তাকায়। জায়গাটা বুঝে নেয়। বলে, ঠিক আছে।
নোটন দুহাতে মুখটা ঢেকে রেখেছিল। সোজা হয়ে বসে হাত সরিয়ে বলল, আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাও।
কোথায় যাবি?
যেখানে খুশি। আমি বাড়ি যাব না।
কেন?
আজ বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না।
কেন সেটা বলবি তো?
বাড়িতে আমার কে আছে বলো তো। মা দিন রাত নানারকম খোঁটা দেয়, ভাই ঘেন্না করে। অথচ আমার রোজগার খেয়ে বেঁচে আছে।
এই জন্য? দূর!
আমি বাড়ির অ্যাটমোসফিয়ার সইতে পারি না।
সেটা তোর মনের দোষ।
কেন? মনের দোষ হবে কেন?
তুই রোজগার করছিস বলে নিশ্চয়ই পরিবারের সবাইকে নিজের তবে রাখতে চাস।
অত শত ভেবে দেখিনি। বাড়ি যখন ফিরি তখন ভীষণ টায়ার্ড থাকি। বোঝো তো। ফিরে এসে সকলের মুখ আষাঢ়ের মেঘের মতো দেখলে কেমন লাগে বলো তো!
আমি তো কারও মুখের দিকে তাকাই না। তুইও তাকাবি না।
না তাকালেই কী! বাক্যবাণ আছে না! কানও কি বুজে রাখতে বলো?
বলি।
না। ওসব হয় না। তার চেয়ে আমি যদি আলাদা থাকি?
একা?
ধরো যদি তাই থাকি!
আজকাল মেয়েরা তো একা থাকেই।
বলছ থাকতে?
আমি বলার কে? ইচ্ছে হলে থাকবি।
তুমি বলো। তুমি যা বলবে শুনব।
কারও আজ্ঞাবাহী না হলে চলছে না?
না। তোমার আজ্ঞাবাহী হয়ে থাকব। বলো।
তা হলে বলি এবার একটা বিয়ে করে আলাদা হ। যা রোজগার করবি তা তোর মাকে পাঠিয়ে দিবি। বিয়ে করলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে।
বিয়ে?
নয় কেন?
তুমি বলছ?
বলছি।
এই আমার প্রতি তোমার ভালবাসা?
আমার সঙ্গে তো তোর আজ হঠাৎ দেখা। না হলে কী করতিস?
আর যাই করি বিয়ে করতাম না।
কেন বল তো!
দুর, ও একটা জীবন নাকি?
আর আমার আজ্ঞাবাহী হয়ে দিন কাটানোটা জীবন?
তোমার জন্য সব পারি।
ধ্রুব মৃদু হাসল। আস্তে আস্তে তার ভিতরটা কঠিন হচ্ছে। দানা বেঁধে উঠছে প্রতিবোধ। এতক্ষণে এই অস্থিরমতি মেয়েটির প্রতি তার প্রত্যাখ্যানের ভাবটা আসছে।
সে বলল, না, পারিস না।
কে বলল পারি না?
তা হলে একটা কথা বলি, শুনবি?
শুনব।
আজ বাড়ি যা। আমাকে ছেড়ে দে।
তোমাকে কি ধরে রেখেছি?
রাখার চেষ্টা করছিস।
দুহাতে তাকে আঁকড়ে ধরে নোটন। বলে, আমাকে ঘেন্না কোরো না গো।
কে ঘেন্না করছে?
তোমার চোখ করছে। আমি টের পাচ্ছি।
ছাড় নোটন।
না। ছাড়ব না। কিছুতেই না।
০৯১. হেমকান্ত একটু সামলে উঠেছেন
হেমকান্ত একটু সামলে উঠেছেন বটে, তবু দিনরাত কৃষ্ণকান্তর কথা চিন্তা করেন। সংসারের আর সব কিছুই গৌণ হয়ে গেছে। দিন পনেরো কুড়ির মধ্যেই ছেলেমেয়েরা যে যার জায়গায় ফিরে গেল। বাড়িতে মাত্র দুটি প্রাণী। হেমকান্ত আর বিশাখা। রঙ্গময়ি ঠিক আগের মতোই স্বাভাবিক আসে যায়। তবে তার মুখে ইদানীং একটু কাঠিন্য দেখা যায়। বেশি হাসে না।
