ধ্রুব অনায়াসে বিনা দ্বিধায় জড়িয়ে ধরল নোটনকে। বলল, ওরকম করিস না। আমি ভাল লোক নই। আমার জন্য কেউ বেশি উতলা হলে খুব খারাপ লাগে।
বউদি তোমাকে খুব ভালবাসে না?
তা বোধহয় বাসে। কিন্তু একথা আগে হয়ে গেছে নোটন।
হয়েছে তোক। আরও হবে। আজ কেবল উলটো-পালটা বকে যাওয়ার দিন।
সরে বোস। স্টেশন আসছে।
না।
লোকে দেখবে।
দেখুক গে।
ধ্রুব হাসল, নোটনের মাথাটা নেড়ে দিয়ে বলল, তোর যত সাহস আছে আমার তত নেই। সরে বোস।
নোটন মাথাটা তুলল। স্টেশনে গাড়ি থেমে আবার চলল। কেউ উঠল না তাদের কামরায়। নোটন আবার ঘন হয়ে বসে বলল, বড্ড জ্বালাচ্ছ। বলছি না আজ আমি মরব! মরার দিনটায় একটু দয়ামায়া করবে তো আমাকে।
মরবি কেন তা কিন্তু বলিসনি। হেঁয়ালি করছিস।
আর বেঁচে থাকার কি কোনও মানে হয়?
এটাও হেঁয়ালি।
তোমার কাছে হেঁয়ালি লাগছে কেন জানো? তুমি আমার মনকে তো বুঝতে পারোনি।
মন বোঝাবুঝির সময় দিলি কোথায়? এখনকার এই তোকে আমি কতটুকু চিনি বল তো! তুই বা কতটুকু এখনকার আমাকে চিনিস?
তেমনি স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখে নোটন নিম্পলক কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে ধ্রুবর দিকে। ঠোঁটদুটি অল্প ফাঁক। এক মায়াবী আলো যেন ঘিরে আছে মুখমণ্ডল। জীবনে এই প্রথম নিজের স্ত্রী ছাড়া দ্বিতীয় কোনও মেয়ের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে তেমন অস্বস্তি বোধ করছে না ধ্রুব। বরং ভাল লাগছে। মায়া হচ্ছে।
ধ্রুবর মাথাটা কেমন হয়ে গেল। বুকের মধ্যে সামান্য তরঙ্গ খেলে গেল। নোটনকে সোজা করে বসিয়ে দিয়ে বলল, মরিস না, নোটন। তুই তো পাগল, হয়তো যা বলছিস তাই করে বসবি।
নোটনের দুই চোখ টলটল করে উঠল জলে। ধরা গলায় বলল, আমি তোমাকে কিন্তু চিনি। খুব চিনি।
কীভাবে চিনিস?
সারা দিন রাত এক সময়ে তোমাকেই ধ্যান করতাম তো। বোঝাতে পারব না। তবে চিনি। তুমি আমাকে একটুও চেনো না।
ধ্রুব চুপ করে কাঁকা দীর্ঘ কামরাটার দিকে চেয়ে রইল শূন্য চোখে। তারপর বলল, আমার সেন্টিমেন্ট বলে কিছু নেই। আবেগ নেই। আমি সত্যিই ইমোশন্যাল ব্যাপারগুলো বুঝি না। যদি বুঝতাম তা হলে তোর অবস্থাটাও বুঝতে কষ্ট হত না।
সবই বোঝো। স্বীকার করতে অহংকারে বাধে।
অহংকার! তা একটু বোধহয় আমার আছে।
আছেই তো। তুমি অহংকারী, নাক উঁচু। কিন্তু ওরকমই থেকো। অহংকারই তো তোমাকে মানায়। সস্তা হবে কেন?
ও বাবা! আবার উলটো চাপান!
নোটন মাথা নেড়ে বলে, এও তুমি বুঝবে না। আজ তোমাকে যত কাছে টেনে এনেছি এত কাছে টানা উচিত নয়। তোমাকে একটু তফাতে, একটু দূরে রাখলেই ভাল। তবে আজকের কথা তো আলাদা। এরকম দিন তো আর আসবে না।
ফের, নোটন!
তোমাকে ছুঁয়ে বলছি আজ আমি মরব।
গাড়ি শিয়ালদায় ঢুকছে, নোটন।
চটকা ভেঙে নোটন তাকাল। বলল, ফুরিয়ে গেল রাস্তা?
তোকে কি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাব?
অসুবিধে না হলে দাও।
অসুবিধে কী! বেশি রাতও হয়নি।
তা হলে চলল।
প্ল্যাটফর্ম পার হওয়ার সময় কেউ কথা বলল না তেমন। মল্লিকপুরের কুয়াশাচ্ছন্ন সেই স্টেশনের স্বপ্নলোক গাড়ির কামরার নিরঙ্কুশ নির্জনতার পর এত আলো আর লোকজনের মধ্যে এসে একটা বেসুর বাজল।
ধ্রুব বাইরে এসে একটা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করল। নোটনকে পাশে বসিয়ে বলল, আমাদের ফোন নম্বর তো জানিস।
জানি।
কাল একবার ফোন করিস।
কাল! কেন বলো তো!
করিস তো। কথা আছে। তোর ভাইয়ের একটা চাকরির ব্যাপারে কিছু হয়ে যেতে পারে।
নোটন হঠাৎ খিল খিল করে দুলে দুলে হাসতে লাগল।
হাসছিস কেন?
তুমি ভয় পেয়েছ।
ভয় কীসের?
কাল আমি সত্যি বেঁচে থাকব কি না সেটা ভেবে ভীষণ ভয় পেয়েছ তুমি।
আবার খিলখিল হাসি। অনাবিল, সত্যিকারের খুশিতে ভরা সেই হাসি শুনে ধ্রুবও হেসে ফেলল।
নোটন বলল, বলো ভয় পেয়েছ কি না?
একটু পেয়েছি।
আমি মরলে তোমার কী?
মরার কথায় আমার ভীষণ খারাপ লাগে।
কিন্তু আমার যে ইচ্ছে করছে।
ইচ্ছে ওরকম হয়। রোমান্টিক ইচ্ছে। ওটার কোনও মানে নেই।
নোটন এবার নিঃশব্দে হাসতে লাগল। ছোট্ট একটা চিমটি দিল ধ্রুবর হাতে। বলল, আজ আমাদের কী হয়েছে গো!
ধ্রুব চুপ করে ভাবতে লাগল। এই যে লঘুভার সময় সে কাটাচ্ছে, উপভোেগ করছে একটি চপলা বেহায়া মেয়ের সঙ্গ, এর মানে কী? কেন ওরকম হচ্ছে? নিজেকে সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। কদিন আগে তার ভিতরকার আর-এক ধ্রুব ধারার গলা টিপে ধরেছিল। আজ আর-এক ধ্রুব এই কবেকার চেনা একটা মেয়ের সঙ্গে দেয়ালা করছে। এর কোনও মানে হয়?
কী ভাবছ?
কিছু না।
চুপ করে আছে যে!
তোকে একটু পরে ছেড়ে দিতে হবে তো, তাই মন খারাপ।
আবার চিমটি দিয়ে নোটন বলে, ইয়ার্কি দিচ্ছ? তোমাকে আমি চিনি না, না?
সত্যিই।
তুমি অন্য কথা ভাবছ।
তুই কি অন্তর্যামী?
তাই তো।
তবে বল কী ভাবছি।
একটা খারাপ মেয়েকে ছুঁয়ে আজ অপবিত্র হয়েছ কি না তাই ভাবছ।
দূর বোকা। পবিত্রতা-অপবিত্রতা নিয়ে বহুদিন মাথা ঘামাইনি। ওসব নয়। তবে তোর কথা ভাবছি।
কী ভাবছ?
সে তোর শুনে কাজ নেই।
পায়ে পড়ি, বলো। না শুনলে মরে যাব।
তব কথাই ভাবছি, সঙ্গে নিজের কথাও।
কী ভাবছ বলো।–বলে নোটন ধ্রুবকে আঁকড়ে ধরে।
ধ্রুব নিজেকে ছাড়াল না। নরম হাতে নোটনের মাথাটা নিজের শরীরে একটু চেপে ধরে বলে, আমাকে তুই আজ হিপনোটাইজ করলি কী করে? আজ অবধি কেউ এতটা পারেনি।
সত্যি বলছ?
সত্যি ছাড়া মিথ্যে বলব কেন? তাই ভাবছি আমার কি বয়স হয়ে গেল? প্রতিরোধ ভেঙে যাচ্ছে।
নোটন চুপ করে বেড়ালের মতো কাছ ঘেঁষে বসে রইল কিছুক্ষণ। সামনে ড্রাইভার বার বার আয়না দিয়ে তাদের দেখছে। কিন্তু তারা গ্রাহ্য করল না। নোটন বলল, আমি জানি। বলব?
