এবার উইন, বাবা।
শচীনকে নিয়ে কথাটা শেষ হল না।
আপনি স্থির করেছেন আমাদের অমত হওয়ার কথাই নয়।
যা বললাম সকলের সঙ্গে পরামর্শ করে দেখো।
করব, বাবা।
হেমকান্ত উঠলেন। তিন দিন পরে স্নান করলেন তিনি। ভাতের পাতেও বসলেন একটু।
বাড়িশুদ্ধ লোক স্বস্তির খাস ফেলল।
আমরাগানে পড়ন্ত রোদের আলোয় চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাখা। চোখের দৃষ্টি হরিণের মতো ভীত ও চঞ্চল। শরীরে অস্থিরতা।
আমরাগানের পিছন দিকে একটা কাঁচা রাস্তা আছে। তার দৃষ্টি সেই দিকে। চারটে প্রায় বাজে।
খুব বেশি অপেক্ষা করতে হল না। ঝোপঝাড়ের মাথার ওপর দিয়ে এক সাইকেল-আরোহীর চলন্ত মাথা দেখা গেল।
বিশাখার হাত-পা হিম হয়ে যাচ্ছিল ভয়ে। বুকের ভিতর ঠিক উলটোরকম এক উথাল-পাথাল। সে চারিদিকে স্তভাবে চেয়ে দেখল কেউ লক্ষ করছে কি না।
না। আমরাগান সম্পূর্ণ নির্জন এবং নিঃশব্দ।
শচীন সাইকেলটা ঝোপের মধ্যে ঠেলে ঢুকিয়ে ছায়াচ্ছন্ন বনভূমিতে ঢুকল। তার মুখে সামান্য হাসি। চোখে দুষ্টুমি।
তলব কেন?
বিশাখা চোখ নত করে বলে, খুব খাটুনি পড়েছে বুঝি?
কেন? খাটুনির কী দেখলে?
আজকাল তো কাছারিতেও আসেন না!
কাজ অনেক পড়ে গেছে তোমাদের এস্টেটের। কিন্তু সময় করতে পারছি না। কৃষ্ণের ব্যাপারটা নিয়ে কদিন খুব ব্যস্ত থাকতে হল।
বিশাখা চোখ তুলে বলল, কিছু খবর পাওয়া গেল?
পাওয়া গেছে তো অনেক। কোনটা বিশ্বাসযোগ্য, কোনটা নয় তাই এখন ভাবনা।
আমরা ভেবে ভেবে পাগল হয়ে যাচ্ছি।
সেটা তো স্বাভাবিক। তবে একটা কথা আছে।
কী কথা?
কৃষ্ণের মতো কারেজিয়াস এবং বুদ্ধিমান ছেলে তো শুধু ঘরে আটকে থাকার নয়। তাকে তোমরা কী দিয়ে আটকাবে?
তা বলে এতটুকু বয়সে স্বদেশি করবে?
করবে তা তো বলিনি। কিন্তু কিছু একটা করবেই। ওর ধাতই আলাদা। তোমাদের বংশে এরকম এক-আধজন ছিলেন। ও তাদেরই রক্তের ধারা পেয়েছে।
সবাই খুব ওর কথা বলছে আজকাল, না?
সবাই বলছে বিশাখা। আই ফিল প্রাউড অব হিম।
বিশাখা চোখ পাকিয়ে বলল, ইংরিজি বলতে বারণ করেছি না?
শচীন হেসে ফেলে বলে, ওঃ তাই তো। আচ্ছা আর বলব না।
খুব রোগা হয়ে গেছেন কিন্তু।
আচ্ছা, তুমি ওই আপনি-আজ্ঞে বলার অভ্যাসটা ছাড়বে?
ছাড়ব তো ঠিকই। তবে–
তবে-টবে নয়। এখনই বলো।
লজ্জা করে।
আমাকে আবার লজ্জা কীসের?
তোমাকে ছাড়া আমার আবার লজ্জা কাকেই বা!
এই তো বলেছ।
বিশাখা জিব কেটে বলে, ইস, বেরিয়ে গেছে।
তা হলে তো হয়েই গেল।
বিশাখা মাথা নেড়ে বলে, না, হল না।
হল না কেন?
বাড়িতে কিছু শুনতে পাচ্ছি না।
কী নিয়ে শুনবে?
বিয়ে নিয়ে।
শুনছ না?
না। কী বিশ্রী যে লাগছে!
এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল। এখন বিয়ে নিয়ে ভাববার মতো মানসিক অবস্থা কি কারও আছে?
সে ঠিক কথা। কিন্তু আমাদের কী অবস্থা বলো তো!
শচীনের মুখ উদাস হয়ে গেল। বলল, এক দুর্দিনে তোমার আমার চেনা-জানা হল বিশাখা, সইতে হবে।
সইছি না বুঝি? ভাই নিরুদ্দেশ, তোমার দেখা নেই। কষ্ট কি কম?
শচীন এই ছেলেমানুষি কথায় একটু হাসল।
বিশাখা হঠাৎ বলল, সেই পেতনির কী খবর?
কোন পেতনি?
ওই যে কে এক জমিদারের মেয়ে আমার গ্রাসে ভাগ বসাতে চেয়েছিল?
শচীন উঁচু স্বরে হেসে ফেলেই সতর্ক হল। বলল, ভয় নেই।
নেই তো!
না। তোমার গ্রাসে ভাগ বসায় সাধ্য কার?
যা ভয়ে-ভয়ে ছিলাম!
এখন ভয় কেটেছে তো?
সবটা কি কাটে?
আর ভয় কীসের?
পুরুষমানুষকে কি বিশ্বাস আছে?
শচীন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে, কী ইদানীং ইঙ্গিত করছ বলো তো!
ইঙ্গিত আবার কী?
তা হলে বিশ্বাসের কথাটা উঠল কেন?
বিশাখাও গম্ভীর হয়ে গেল। চোখ পাকিয়ে বলল, আমার কপাল ভাল নয়। তাই ভয় পাই।
শচীন চুপ করে রইল।
০৯০. মরবি কেন
মরবি! মরবি কেন?
এমন সুন্দর দিন তো আর জীবনেও আসবে না।
সুন্দর দিন বলেই বুঝি মরতে হয়?
তুমি তো মেয়েমানুষের মন জানো না।
মেয়েরা বুঝি খুব মরতে ভালবাসে?
খুব। একটু সুন্দর ভাবে মরতে পারলে আর কী চাই?
তুই বোধহয় খুব বোকা।
মেয়েমাত্রই বোকা।
ধ্রুব শীতে গুটিয়ে যাচ্ছিল। বলল, এবার জানালাটা বন্ধ করতে দে। শীত লাগছে।
তুমি আমার কাছ ঘেঁষে বসো, তা হলে গরম লাগবে।
তুই বড্ড বাজে বকিস।
নোটন স্বপ্নাতুর চোখে ধ্রুবর দিকে চেয়ে থেকে বলল, খুব খারাপ লাগছে আমাকে তোমার, না?
খারাপ লাগছে না। তবে বড্ড বকিস।
প্রগলভতা! তা আজ একটু প্রগলভ না হয় হলাম।
এটাও নাটক থেকে দিলি নাকি?
হতে পারে। আজকাল নাটকের ডায়ালগের সঙ্গে মনের কথা গুলিয়ে ফেলি গো।
খুব মুশকিল তো তা হলে তোর!
আমার না।–নোটন মাথা নেড়ে বলে, মুশকিল তোমার। তুমি অনবরত আমাকে সন্দেহ করে যাচ্ছ। ভাবছ যা বলছি সব বানিয়ে বলছি। একটাও মনের কথা বলছি না। তাই বড্ড মুশকিল হচ্ছে তোমার।
ধ্রুব অপ্রস্তুতভাবে একটু হাসল। বলল, হবে।
নোটন জানালাটা বন্ধ করে দিল। চুল ঠিক করল। তারপর খুব কাছ ঘেঁষে গায়ে গা লাগিয়ে বসে বলল, আমাকে ঘেন্না করবে না, খবরদার।
ধমকাচ্ছিস কেন? ঘেন্না করলে কি চুমু খেতাম?
নিজের ইচ্ছেয় খাওনি। আমি জোর করে আদায় করেছি।
তা হোক। ঘেন্না যে করি না তা তো বুঝতে পেরেছিস?
নোটন মাথা নেড়ে বলে, না, এখনও বুঝতে পারিনি। তবে বুঝতে চাই।
সন্দেহবাতিকটা তো তোরই যোলো আনা দেখছি।
ধ্রুবর কাঁধে মাথাটা রেখে নোটন চোখ বুজে বলল, আজকের পর আর তো আমাকে কোনওদিন পাবে না। আজ ঘেন্না কোরো না।
কী যা-তা বলছিস!
একটু জড়িয়ে ধরো!
