কী শুনতে চান বলুন।
পুলিশের ধারণাটা কতদূর স্থায়ি হবে? ওদের ইনফর্মার নেই?
আছে। তবে গতকাল ভূপতি নামে একজন ইনফর্মার খুন হয়েছে।
ভূপতি? চিনি নাকি তাকে?
মেছোবাজারে থাকত।
খুন হল কী করে?
মুক্তাগাছার রাস্তায় তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার কাজই নাকি ছিল ইস্কুলে কলেজে ঘুরে ঘুরে ছেলেদের কাছ থেকে খবর সংগ্রহ করা। বীরু সেনের দল সম্পর্কে সে-ই পুলিশকে খবর দিয়েছিল।
হেমকান্ত একটু শিউরে উঠলেন। তারপর বললেন, এত খুন এত রক্তপাত কি ভাল হয়েছে, বাবা?
আমরাও সেই কথাই আলোচনা করি। কী যে সব হচ্ছে!
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, দেশ স্বাধীন করার দরকার আছে মানি। তা বলে এভাবে মানুষ মেরে সেটা করতে হবে? তোমরা কী ভাবছ জানি না, কিন্তু এসব দেখে আমার বেঁচে থাকার ওপর ঘেন্না ধরে যাচ্ছে।
দেশের অন্য সব জায়গায় এত হাঙ্গামা নেই। যত আমাদের এই বাংলায়। এখানকার ছেলেরা একটু বেশি মিলিটান্ট হয়ে যাচ্ছে।
হেমকান্ত সমর্থনসূচক মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, কৃষ্ণকে নিয়ে আর কী কথা হল?
পুলিশ ধরে নিয়েছে কৃষ্ণ সদ্বংশের ছেলে এবং ভাল ছেলে। যদি দলটাকে ধরা যায় তবে কৃষ্ণকে রাজসাক্ষী করার কথাও পুলিশ ভাবছে।
হেমকান্ত খুব মন একটু হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, ও বাবা! সে তো অনেক দুরের। কথা। আগে তো জ্যান্ত অবস্থায় ধরা পড়ুক।
আপনি অত ভাববেন না।
ভাবনার ওপর কি মানুষের হাত থাকে, বলো! যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে ভাবনা না হওয়াটাই বিস্ময়কর হবে।
সবই তো জানি, বাবা। তবু আপনি স্বাভাবিক ভাবে থাকলে আমরা জোর পাই। সবাই কান্নাকাটি করছে সারা দিন। বিশেষ করে মেয়েরা। বাড়িটায় একটা শোকের ছায়া।
আমার জন্যে তোমরা খুব চিন্তিত, বুঝি। আচ্ছা দেখি।
তা হলে উঠুন। স্নান করে দুটি মুখে দিন। সাড়ে বারোটা বেজে গেছে।
তোমরা কি আমি না খেলে কেউ খাও না?
অনেকটা সেইরকমই।
তা হলে আমার তো খুব অন্যায় হয়ে গেছে।
না, না, এরকম তো জীবনে কিছু ঘটনা ঘটেই। আপনাকে আমরা খুব শক্ত মানুষ বলে জানি। আপনি ভেঙে পড়লে আমরা আর মনের জোর পাই না। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকলে এতটা অসহায় বোধ করতাম না।
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন। বুঝেছেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, শচীনের কথা কী। বলছিলে?
হ্যাঁ, শচীনের সম্পর্কে আপনি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুনলাম।
নিয়েছি, তবে তোমাদের সঙ্গে পরামর্শ না করে পাকা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তোমাদের কি অমত আছে?
কনক একটু ভাবল। তারপর বলল, ছেলেটি সব দিক দিয়েই ভাল। তবে আমাদের সমান-সমান নয়।
সমান হয়তো ছিল না। এখন হয়েছে। যদি আর্থিক অবস্থাকে মাপকাঠি হিসেবে ধরো তা হলে শচীন পাশমার্ক পাবে।
আমি বংশমর্যাদার কথা ভেবে বলছিলাম।
মর্যাদা আজকাল আর কারই বা ধরবে! রাজেনবাবু, অর্থাৎ শচীনের বাবা চমৎকার মানুষ। তোমরা আবার নতুন করে ভেবে দেখো। বউমা এবং মেয়েদের সঙ্গেও আলোচনা করো। লাখ কথা ছাড়া বিয়ে হয় না।
বলব তবে এখন তো বিয়ের তাড়াহুড়ো কিছু নেই। কৃষ্ণর খোঁজ আগে পাওয়া যাক। তারপর।
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন। বললেন, ওটা বিবেচনার কথা হল না।
তা হলে?
কৃষ্ণের জন্য আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। বিশাখার বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। তোমরা তো জানোই ওর মা না থাকায় আমার দায়িত্ব এখন অনেক বেশি। আর-একটা কথাও আছে।
কী কথা, বাবা?
আমি হয়তো এখানকার পাট চুকিয়ে ফেলব। আমার আর ভাল লাগছে না।
চুকিয়ে ফেলবেন? তা হলে কোথায় থাকবেন গিয়ে? কলকাতা?
না। ও শহরে আমার ভাল লাগে না। আমার ইচ্ছে ভাল খদ্দের পেলে এস্টেট বিক্রি করে দেব। তারপর সব টাকা পয়সার বিলিব্যবস্থা করে নিরিবিলি কোথাও গিয়ে থাকব।
এ সিদ্ধান্ত কি আপনার পাকা?
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন, না। ভাবছি।
এস্টেট কেনার লোক পাওয়া যাবে বলে ভাবছেন? এখন নগদ টাকার খুব অভাব চলছে।
খদ্দের তবু পাওয়া যাবে। হয়তো দাম পাব না।
আপনি এস্টেট বিক্রি করে দিন সেটা আমরাও চাই। কিন্তু ডিপ্রেশনটা কেটে যাওয়ার পর করলেই ভাল।
দেখা যাক। আর-একটা কথাও ভেবে রেখেছি।
কী কথা, বাবা?
আমার এখানে থাকার ইচ্ছে নেই। এস্টেটের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে আজকাল আমার আর ভাল লাগে না। তাই ভেবেছি বিশাখার বিয়ে দিতে পারলে শচীনকে এস্টেটের অভিভাবক করে রেখে যাব।
কনক উদ্বিগ্ন গলায় বলে, কোথায় যেতে চান, বাবা?
হেমকান্ত মৃদু হেসে বললেন, ভয় পেয়ো না। আমি দাদার মতো সন্ন্যাস নেব না।
কনক তবু নিশ্চিন্ত হল না। বলল, আমাদের বংশে এরকম একটা প্রবণতা তো আছে।
আছে। কিন্তু আমার ধাতু সেরকম নয়। ভয় পেয়ো না।
সন্ন্যাস নেওয়ার তো দরকারও নেই, বাবা।
হেমকান্ত হাতটা উলটে বললেন, কী জানি বাবা জীবনের গণ্ডির গভীরে কত কী আছে। সুখের সংসার ছেড়ে মানুষ যখন ঈশ্বর-সন্ধানে যায় তখন বুঝতে হবে সুখের ধারণা সকলের এক রকম নয়। কদিন আগে কেওটখালিতে এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে আচমকা দেখা। প্রথমটায় চমকে উঠে ভেবেছিলাম, দাদা বুঝি!
আপনি কেওটখালি গিয়েছিলেন কি খুনের দিন?
হেমকান্ত মাথা নাড়ালেন, গিয়েছিলাম।
কাজটা ভাল করেননি। বিপদ হতে পারত।
সে বিপদ তো কৃষ্ণের চেয়ে বেশি নয়। অতটুকু ছেলে কোথায় কোথায় হাভাতের মতো ঘুরছে কে জানে!
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কনক বলল, সন্ন্যাসীটা কে?
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, কী করে বলব? তবে খুব পার্সোনালিটি আছে। লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছিল, বেশ তো আছে। কিছু নেই, তবু বেশ আনন্দে নির্ভাবনায় বেঁচে আছে।
