আমার ওপর তোর এত টান হল কবে থেকে, কীভাবে–সেটাই তো রহস্য।
তা হলে সেটা রহস্যই থাক। তুমি বিশ্বাস করবে না জানতাম।–বলে একটু হাসল নোটন।
ধ্রুব একটা খাস ফেলে বলল, না, আমার কিছু সহজে বিশ্বাস হয় না।
নোটন তার একটা হাত মৃদু ধরে বলল, কিন্তু কী সুন্দর আদর করলে আজ আমাকে। মনে হচ্ছিল আমার ভিতরটা পর্যন্ত ধুয়ে যাচ্ছে। কী যে সুন্দর লাগল, কী যে ভাল।
ধ্রুব আপনমনেই একটু লজ্জা পেল। এরকম সে কদাচিৎ করে।
নোটন বলল, আজ বউদির কাছে যখন ফিরে যাবে কীরকম লাগবে তোমার নিজেকে?
কীরকম আর লাগবে? রোজ যেমন লাগে।
নিজেকে অপবিত্র মনে হবে না? বিশ্বাসঘাতক মনে ভাববে না?
মোটেই না।
ভেবো। তাতে ক্ষতি নেই। আমি আজ যত পেলাম, তোমার তত হারায়নি গো। পুরুষ মানুষ হীরের আংটি।
এত বকবক করিস কেন বল তো!
চুপ করে থাকব?
থাক না একটু।
তা হলে কাঁধে মাথা রাখতে দাও।
রাখ। তবু চুপ কর।
নোটন হাসল। কাছে সরে এসে কাঁধে মাথা রেখে নিজম হয়ে বসে রইল।
গাড়ির সময় যে কখন হল তা টেরও পায়নি তারা। হঠাৎ ফের কুয়াশায় স্নান করা স্নান হলুদ আলোয় চারপাশ যখন অন্ধকার থেকে ভেসে উঠল তখন একটু চমকে উঠল তারা।
ওঠ, নোটন। গাড়ি আসছে।
সময় হয়ে গেল?
হল।
ইস! আর একটু দেরি করা যায় না?
পাগল!
কেন? তোমার জন্য বউদি ভাববে?
দূর। তোর বউদি ভাবে না, কেউ ভাবে না।
তা হলে?
আমার আর ভাল লাগছে না। স্টেশনে কি এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যায়?
যায়, যদি ভালবাসা থাকে। তোমার তোত নেই।
এখন ওঠ।
উঠছি।
ট্রেন এল। দুজনে মোটামুটি একটা ফাঁকা কামরায় উঠে বসতে না বসতেই ছেড়ে দেয় ট্রেন।
খোলা জানলা দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস আসছিল। নোটনের চুল উড়ছে। সে খুব মন দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে ছিল।
ধ্রুব বলল, ঠান্ডা লাগাচ্ছিস কেন? জানালাটা ফেলে দিই বরং!
না থাক।
কী দেখছিস?
বাইরেটা।
বাইরে দেখার কিছু নেই।
অন্ধকার তো আছে। খুব ইচ্ছে করছে অন্ধকারে ড়ুবে যেতে।
কত পাগলামি করবি এক বিকেলে? তোর কোটা ফুরোয় না?
না। আজ একটা অন্যরকম দিন।
তাই নাকি?
আজ আমি মরব।
০৮৯. রামকান্ত রায় খুন
রামকান্ত রায় খুন হওয়ার পরেই ধরপাকড় শুরু হল। শহরময় একটা হুলস্থুল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় পুলিশ একবারও হেমকান্তর বাড়িতে হানা দিল না। অথচ সেটাই ছিল স্বাভাবিক।
হেমকান্ত দুদিন ঘুমোলেন না, খেলেন না। নিজের ঘরে চুপচাপ বসে থাকলেন বেশির ভাগ সময়। এমন থমথমে মুখ ও গম্ভীর তার চেহারা যে কেউ কাছে বিশেষ ঘেঁষতে সাহস পেল না। রঙ্গময়ি শুধু মাঝে মাঝে এসে চুপ করে বসে থাকে কাছে। তারপর চলে যায়।
তিন দিনের দিন দুপুরবেলা কনক খুব সতর্কভাবে হেমকান্তর কাছে এসে দাঁড়াল। কাচুমাচু মুখ। মৃদু স্বরে ডাকল, বাবা!
হেমকান্ত মুখ ফেরালেন, কিছু শীর্ণ দেখাচ্ছিল তাঁকে। চোখের কোল ফোলা, দৃষ্টি ভারী অনিশ্চয়, জবাব দিলেন, বলো।
আপনি এরকমভাবে অন্নজল ত্যাগ করলে যে শরীর ভেঙে পড়বে।
আমি তো ঠিক আছি। শরীর ভাল আছে।
আপনি এরকম নিজেকে গুটিয়ে রাখলে আমরা কার কাছে যাব? কে আমাদের ভরসা দেবে?
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তার একটা খবরও তো এখনও পেলাম না কনক!
যা শোনা যাচ্ছে তাতে তো খুব খারাপ কিছু মনে হচ্ছে না।
নতুন কিছু শুনেছ?
রোজই আমি আর জীমূত বেরিয়ে চারদিকে খোঁজ খবর করছি।
কিছু শুনতে পাও?
যা শুনি সেটা একদিক দিয়ে খুবই আনন্দের।
হেমকান্ত টানটান হয়ে বসে বললেন, বলল, কী শোনো তোমরা?
সকলের মুখেই এখন কৃষ্ণর নাম।
কৃষ্ণর নাম? কেন?
সবাই জেনে গেছে যে, কৃষ্ণ বিপ্লবীদের দলে চলে গেছে।
আর কিছু শোনো?
রামকান্ত রায়ের হত্যাকারী হিসেবে তার নাম অনেকে বলছে বটে, তবে সেটা গুজব।
গুজব কী করে বুঝলে?
গুজব না হলে এতদিন পুলিশ এসে আমাদের বাড়ি তছনছ করত। সবাইকে ধরে নিয়ে যেত।
সে সময় এখনও যায়নি।
আমার মনে হয় পুলিশ গুজবটা বিশ্বাস করে না।
হেমকান্ত বিরক্ত হয়ে বলেন, সেটা জানলে কী করে?
থানার অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছি।
তারা কী বলছেন?
কৃষ্ণের নামে কোনও প্রিভিয়াস ক্রিমিন্যাল রেকর্ড নেই। তা ছাড়া সে জমিদার এবং ব্রাহ্মণবংশের ছেলে। বয়স নিতান্ত কম। ফলে…
তাতে কী? ওটা কোনও অজুহাত হতে পারে না।
পুলিশ এসব ফ্যাক্টরকে গুরুত্ব দেয়। তা ছাড়া মেথড অফ মার্ডারটাও দেখতে হবে।
কী মেথড?
রামকান্ত রায়কে প্রথমে গুলি করা হয়। অবশ্য গুলিটা লাগে দুপক্ষের লড়াইয়ের সময়।
তারপর?
রামকান্ত পালাচ্ছিলেন উন্ডেড অবস্থায়। কিছু দূর গিয়ে পড়ে যান। তখন কেউ চপার দিয়ে বাকি কাজটা সারে।
খুব বীভৎস, না?
হ্যাঁ, দেখে মনে হয় খুব ক্রুয়েল কোনও লোক করেছে।
পুলিসের কি ধারণা যে, কৃষ্ণ অত জুয়েল হতে পারে না?
ঠিক তাই। পুলিশের আরও একটা ধারণা আছে।
কী সেটা?
তাদের বিশ্বাস কৃষ্ণ স্বেচ্ছায় স্বদেশিদের দলে চলে যায়নি, তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে।
সত্যিই কি তাই?
তা কী করে বলব? তবে শচীন এ ব্যাপারে হয়তো কিছু একটা বুঝিয়েছে পুলিশকে।
শচীন বুঝিয়েছে! ভারী বুদ্ধিমান ছেলে। পরিস্থিতি যাই হোক সেটাকে অনুকূল করে নিতে জানে। খুব বুদ্ধিমান।
হ্যাঁ। শচীনের ব্যাপারেও আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
হেমকান্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা অনুমান করার চেষ্টা করে বললেন, শচীনের কথা পরে বোলো, এখন আমি কৃষ্ণের কথা আরও শুনতে চাই।
