ভালবাসা নিয়ে জোর জবরদস্তি দাবি তর্ক কিছু চলে না, ভালবাসার বিচারও বোধহয় এক জীবনে শেষ হয় না। হেমকান্ত তাই তর্ক করলেন না। খুব সংশয়পূর্ণ এবং বিষণ্ণ চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন রঙ্গময়ির দিকে। তার আজ মনে হচ্ছিল, কৃষ্ণর সবই ভাল, কিন্তু ওর মনটা বড় নিষ্ঠুর প্রকৃতির। মায়া দয়া কিছু কম।
হেমকান্ত নিজের ঘরে এসে চুপচাপ বসে রইলেন। মাথার মধ্যে চিন্তার একটা ঘূর্ণিঝড়। সাধুর কথা কি তিনি বিশ্বাস করবেন? এ কি সম্ভব?
বাড়িটা আজ খুবই নিস্তব্ধ। কিন্তু হেমকান্ত আজ তাঁর পুত্রকন্যা পুত্রবধূ এবং নাতিনাতনিদের কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছিলেন না। সম্ভবত তাদের কানেও গুজবটা পৌঁছে গেছে। হেমকান্ত অস্থির হলেন না। খুব সামান্য বিপদ ঘটলেও কিছুদিন আগে পর্যন্ত তিনি বড় অস্থির হয়ে উঠতেন, অসহায় বোধ করতেন। আজ তা হচ্ছিল না। একটা বিষাদ অনুভব করছিলেন তিনি। খুব গভীর বিষাদ।
দুপুরে বিশাখা খুব ভয়ে ভয়ে তার কাছে এসে বলল, সকাল থেকে কিছু মুখে দেননি। এবার দুটো খাবেন চলুন।
খাওয়ার কথায় হেমকান্ত খুব বিস্মিতভাবে চেয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। তারপর বললেন, তোমরা খেয়েছ?
বিশাখা মাথা নাড়ল, নাড়তে গিয়ে তার চোখ থেকে অবাধ্য জল খসে পড়ল গাল বেয়ে। ফোঁপানির শব্দ হল। ঠোঁট দাঁতে কামড়ে কান্না সামলানোর চেষ্টা করল সে।
হেমকান্ত মেয়ের মুখ লক্ষ করে শান্ত কণ্ঠে বললেন, কাঁদছ কেন? কান্নার কিছু নেই। সে বেঁচে আছে খবর পেয়েছি।
বিশাখা চোখ বড় বড় করে বাবার দিকে চেয়ে বলল, বেঁচে আছে? কার কাছে খবর পেলেন?
তোমরা কি ধরে নিয়েছিলে যে সে মারা গেছে?
আমরা কী ভাবব তা বুঝতেই পারছি না। কত লোক এসে কত কী বলে যাচ্ছে।
কী বলছে?
একজন বলে গেল, গুলি লেগেছে। হাসপাতালে। হাসপাতালে খবর নিয়ে জানা গেল, বাজে কথা। আবার একজন এসে বলল, নদীতে লাশ পাওয়া গেছে। কেউ বলছে, স্বদেশিদের দলের সঙ্গে চলে গেছে।
হেমকান্ত চাপা একটা সতর্কতাসূচক শব্দ করে বললেন, যে যা বলুক শুনে যাও। নিজেরা কারও কাছে কিছু কবুল কোরো না। তবে সে যে বেঁচে আছে এটা বোধহয় বিশ্বাস করা যায়।
কোথায় আছে?
সেটা বলা যাবে না। তাছাড়া তার এখন এ বাড়িতে পা না দেওয়াই ভাল।
কিন্তু বাবা, তার যে ভাল জামাকাপড় সঙ্গে নেই। কী খাচ্ছে, কোথায় শুচ্ছে, তা কি জানেন?
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, কিছুই জানি না। জানার উপায়ও নেই। এমনকী সে যে বেঁচে আছে এটাও খুব সূক্ষ্ম সূত্রে খবর পেয়েছি। সুতরাং কারও কাছে কিছু বোলো না। বললে তার বিপদ, আমাদেরও বিপদ।
বাড়ির সবাই যে দুশ্চিন্তায় কণ্ঠায় প্রাণ নিয়ে বসে আছে।
থাকুক। বাড়ির লোককেও বলা ঠিক হবে না। সকলের মনের জোর তো সমান নয়।
কিন্তু কেউ খেতে চাইছে না, শুতে চাইছে না, কাঁদছে।
এক কাজ করে তা হলে। সবাইকে জানিয়ে দাও যে, একজন এসে জানিয়ে গেছে কৃষ্ণ অন্যত্র চলে গেছে। কিন্তু কথাটা যেন বাইরের লোক জানতে না পারে। কেউ জিজ্ঞেস করলে সবাই বলবে, জানি না।
বিশাখা এই হেঁয়ালিতে খুশি হল না। কিন্তু মেনে নিল। মাথা নেড়ে বলল, আপনাকে কিছু খেতে দিই।
বেঁচে থাকতে হলে খেতে তো হবেই। কিন্তু আজ আর অন্নব্যঞ্জন গলা দিয়ে নামবে না। আমাকে বরং একটু সরবত দিতে বলো। আর তোমরা যা পারো একটু খাও।
বিশাখা ধীর পায়ে চলে গেল। হেমকান্ত আবার চোখ বুজলেন এবং প্রিয় পুত্রটির কথা চিন্তা করতে লাগলেন।
০৮৮. ধ্রুব আর নোটন
ধ্রুব আর নোটন যখন স্টেশনে এসে পৌঁছাল তখন চারদিক বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। বাগানবাড়ি থেকে স্টেশন মাইলখানেক। তারা হেঁটেছেও ধীরে। দুজনেই একটু ক্লান্ত।
ছুটির দিন বলেই বোধহয় স্টেশন ফাঁকা, শব্দহীন। শীতার্ত কুয়াশায় চারদিক আচ্ছন্ন। স্টেশনটাকে ভারী ভুতুড়ে আর অলীক বলে মনে হয়। আজকাল কলকাতা আর তার কাছাকাছি সব অঞ্চলে জনসংখ্যা এত বেড়েছে যে এরকম নির্জনতা প্রায় অপ্রাকৃত বলে মনে হয়। সব জায়গাতেই গায়ে গায়ে লোক, সবরকম যানবাহনেই ঠাসাঠাসি, গুঁতোগুঁতি।
নোটন জিজ্ঞেস করল, বসবে না? প্ল্যাটফর্মে বেঞ্চগুলো একদম ফাঁকা।
খোলা জায়গায় বসবি? আজ বেশ ঠান্ডা।
হোক। প্ল্যাটফর্মটা নির্জন। দুজনে কথা বলা যাবে।
তোর আর কত কথা আছে রে নোটন?
অনেক অনেক। এক জন্ম ধরে বললেও ফুরোবে না।
তা নাই ফুরোক। কিন্তু সেসব কথা আমার কানে না ঢাললেই নয়?
তুমি ছাড়া আমার কে আছে আর বলো!
নাটকে এই ডায়ালগ তোকে প্রায়ই দিতে হয় বোধহয়?
তোমার সঙ্গে নাটক? আর যেখানেই করি এই একটা জায়গায় নোটন কেবল নোটন।
তাই বুঝি! অতিভক্তি কীসের লক্ষণ জানিস?
অতিভক্তি হবে কেন? ভক্তি করতে তো দিচ্ছই না।
আর ভক্তিতে কাজ নেই।
শোনো, চলো ওখানে গিয়ে নির্জনে বসি। একটু ঠান্ডা লাগে লাগুক। তোমাকে আবার কবে এইভাবে পাব ভগবান জানেন। হয়তো আর দেখাই হবে না।
ধ্রুব হেসে বলল, রোমান্টিক আবর্জনা ঢালবি তো কানে? ঢালিস। তার আগে একটা প্র্যাকটিক্যাল কাজ সেরে নিই। টিকিটটা কেটে ট্রেনের সময়টা জেনে আসি। তুই এগো।
জনহীন কাউন্টারে গিয়ে ধ্রুব দুটো কলকাতার টিকিট কাটল। ট্রেনের টাইম যা জানল তাতে সময় হয়ে গেছে। ট্রেন এল বলে।
ধ্রুব খোলা প্ল্যাটফর্মে এসে প্রথমে নোটনকে দেখতেই পেল না। তারপর দেখল, কাছেরটা ছেড়ে বেশ দূরে অন্ধকারমতো এলাকায় একটা বেঞ্চে বসে আছে নোটন। তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল।
