ধ্রুব কাছে গিয়ে পাশে বসে বলল, ট্রেনের সময় কিন্তু হয়ে গেছে।
একটা ট্রেন ছেড়ে দাও না।
বলিস কী? এরপর হয়তো ঘণ্টাখানেক বাদে আর-একটা আসবে।
হোক গে। পায়ে পড়ি।
তোর অত কথা কীসের রে নোটন? অনেক তো বলেছিস।
কোথায় আর বললাম? শুধু নিজের সংসারের দুঃখের গল্প শোনালাম। ও কি কথা?
আর কী বলার আছে?
আছে। বলব। তার আগে তুমি বলো।
আমার কথাই আসে না।
বউদির কথা বলো। ছেলের কথা বলো।
খুব হাসল ধ্রুব। তারপর বলল, হিংসে?
মোটেই না।
তবে জেনে কী হবে? বউদি খুব ভাল মেয়ে এই পর্যন্ত বলা যায়। তবে আমার সঙ্গে বনে না।
কেন বনে না?
আমার সঙ্গে কারওরই বনার কথা নয়, জানিস তো আমার স্বভাব।
খুব জানি। তোমাকে জানতে আবার আলাদা বিদ্যে লাগে নাকি?
কী জানিস?
তুমি নিজেকে যা প্রমাণ করতে চাও তা তুমি মোটেই নও।
কী প্রমাণ করতে চাই?
প্রমাণ করতে চাও যে তুমি খুব খারাপ, চরিত্রহীন, মাতাল।
তা নই?
মোটেই না।
কিন্তু লক্ষণগুলি তো মেলে।
একটুও মেলে না। মেয়েরা আর কিছু না বুঝুক ছেলেদের চোখ বোঝে।
আমার চোখে কী আছে রে নোটন?
খুব মায়া আছে। নইলে আমাকে তুমি ঘেন্না করতে পারতে। মায়াটুকু বাধা দিচ্ছে।
বেশ বললি তো! কোন নাটক থেকে দিলি এটা?
নোটন হেসে ফেলে বলল, এটা মিলে গেছে কিন্তু। নাটকেরই ডায়লগ। তা বলে কথাটা মিথ্যে নয়।
চালিয়ে যা।
নোটন মাথা নেড়ে বলে, ভীষণ ইয়ার্কি করে যাচ্ছ তখন থেকে। বলো না!–বলে নোটন খুব ধীরে ধ্রুবর বাহু স্পর্শ করল। একটু কাছে সরে এল।
ধ্রুব মৃদু হেসে বলল, গুড প্রগ্রেস। এরপর কাঁধে মাথা রাখার নিয়ম না?
রাখলে তুমি বকবে?
বকার কিছু নেই। রাখতে পারিস। তবে আমার কাধ ভীষণ ঠান্ডা।
কাঁধ ঠান্ডা মানে?
মানে তোর বুঝে কাজ নেই। এবার ঘোমটা ফেলে স্বাভাবিক হ।
ঘোমটা কেন ফেলব? লোকে তোমাকে আর আমাকে বর-বউ ভাববে ভয়ে? ভাবুক। আমি তাই চাই।
বেশ তো৷ কিন্তু ভাববার মতো কয়েকটা লোকও তো চাই। এখানে যখন কাউকেই দেখা যাচ্ছে না তখন কাকে আর ঘোমটা দেখাবি?
কেন? তুমি তো আছ! তুমি দেখো। দেখে ভাবো।
কী ভাবব?
আমাদের বর-বউ বলে ভাবো।
বাড়াবাড়ি করছিস, নোটন।
বাড়াবাড়িকে কি নাটকের পেশাদার মেয়েরা ভয় খায়? না তুমিই ভয় খাও?
ধ্রুব হাল ছেড়ে হেলান দিয়ে বসল। বলল, যা খুশি কর। তবে জেনে রাখ আমি এ গাড়িটা ধরব।
না, ধরবে না।
ধরবই।
ধরলেও কলকাতায় পৌঁছোতে পারবে না, ধ্রুবদা।
কেন পারব না?
কারণ আমি তা হলে গাড়িটার তলায় পড়ব। রান ওভারের কেস হলে ট্রেন সহজে নড়বে না।
সব মেয়েই পুরুষদের একটা ভয় খুব দেখায়। মরার ভয়।
আর কোন অস্ত্র আমাদের দিয়েছ বলো!
কেন? জিব! ওটা কি কম?
নোটন খুব কাছে সরে এল। ধ্রুব সরল না, নির্বিকার বসে রইল। নোটন কানের কাছে মুখ এনে বলল, এবার কাঁধে মাথাটা রাখছি। প্লিজ, সরে যেয়ো না।
ধ্রুব সরল না। নোটন কাঁধে মাথা রাখল। একটা হাত ধ্রুবর একখানা করতল তুলে নিল।
ধ্রুবদা! নাটক করলাম বলে ভাবছ!
কী জানি কী! তোর তো আমার ওপর এত টান থাকার কথা নয় রে নোটন?
কেন থাকবে না?
তোর সবরকম অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। তারপরও কি আর হৃদয় থাকে?
নোটন মাথাটা কাঁধে একটু ঘষে বলল, থাকে না তো জানোই। আমারও হয়তো নেই। কিন্তু আজ সারাক্ষণ তোমাকে কাছে পেয়ে কেমন যে হয়ে গেছি, ভারী অস্থির লাগছে।
কীরকম অস্থিরতা রে নোটন? শরীর।
না গো ওরম বোলো না। শরীর দিয়ে কি তোমাকে বোঝা যায়?
তবে কী?
নাটক করি, সিনেমা করি, আরও অনেক খারাপ কাজ করি, অস্বীকার করছি না। জীবনে একজন কেউ নেই আমার। সেই একজন কেউ হতেও পারবে না কোনওদিন।
সেই একজন কে?
জানি না। কিন্তু তুমি হতে পারতে।
আমার হওয়ার কথা ছিল না তো।
সেও জানি। সব ভুল। এই যে বসে আছি কাঁধে মাথা রেখে, ঘোমটা দিয়ে, এও ভুল। কাল থেকেই হয়তো আর এমন অস্থির লাগবে না। তবু আজ যে লাগছে তাতে বুঝতে পারছি এখনও একটু নোটন আছি। সেই আগের নোটন। তাই না?
আগের নোটনটাকেও তো আমি ভাল চিনতাম না রে।
তুমি চিনতে না। আমি তোমাকে চিনতাম। স্বামী বলে, ইহকাল পরকালের দেবতা বলে।
ধ্রুব শব্দ করে হেসে উঠল।
নোটন বলল, চুপ। জানি ওসব বাজে কথা। কিন্তু আজ হেসো না।
চালিয়ে যা।
শোনো। একটা জিনিস দেবে?
আবার কী? কাধ পর্যন্ত পৌঁছে গেছিস। আবার কী?
একটা চুমু দেবে? একটা। পায়ে পড়ি। কাউকে কখনও বলব না। একবার।
ধ্রুব একটা ঝাঁকি দিয়ে সোজা হয়ে বসে।
কী হল ধ্রুবদা! রাগ করলে?
না। গাড়ি আসছে।
গাড়ি!—নোটন যেন কথাটা বুঝতেই পারেনি এমনভাবে স্বপ্লেখিতের মতো চারদিকে তাকাল। বলল, গাড়ি দিয়ে কী হবে? আমরা তো এখন যাব না।
তা হলে তুই বসে থাক। আমি চলি।
নোটনের পক্ষে স্বাভাবিক হত ধ্রুবর হাত চেপে ধরা এবং জোরাজুরি করা। নোটন তার কিছুই। করল না। চুপচাপ বসে চেয়ে রইল সামনের দিকে। একটু নড়ল না, বাধা দিল না।
ধ্রুব উঠে কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছিল। হলুদ একটা আলো নিঃশব্দে এগিয়ে আসছিল। প্ল্যাটফর্মে সেই আলোয় কয়েকজন লোককে দেখা গেল। দাঁড়িয়ে আছে। নাটকটা কি তারা দেখেছে?
গাড়ি এল। খুব ফাঁকা। এত ফাঁকা ট্রেন বড় একটা দেখা যায় না। ধ্রুব একটা কামরার হ্যান্ডেল ধরে মুখ ফিরিয়ে চাইল। একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে নোটন বসে আছে। যেন মৃতদেহ।
তার হাত থেকে হাতলটা বিনীতভাবে ছাড়িয়ে নিয়ে ট্রেনটা চলে গেল। ধ্রুব ধীর পায়ে ফিরে এসে নোটনের পাশে বসে বলল, উইল পাওয়ার আছে নাকি তোর।
