তারপর?
তার হাতে একটা খেটে বন্দুক ছিল, কিন্তু মনে হয় তাতে গুড়ুল ছিল না। লোকটা ছুটতেও পারে তেমন। ইয়া লাশ, খেয়ে দেয়ে শরীরে খুব ননী লাগিয়েছে। হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হাফাচ্ছিল। এসে সটান পড়ল আমার ধুনির সামনে, বাবা গো, বাঁচাও।
আপনার কাছে?
তবে আর বলছি কী? আমি বুঝতে পারছিলাম, ব্যাটার আয়ু বেশিক্ষণ নয়। লোকটা পড়তেই পাটখেত থেকে বড় একটা দা হাতে একটা ভারী সুন্দর চেহারার ছেলে বেরিয়ে এল। পরনে ধুতি, গায়ে একটা বালাপোশের কোট। খুব ফরসা, লম্বা আর মজবুত তার চেহারা।
হেমকান্ত ড়ুকরে উঠলেন, কৃষ্ণ!
তা আর বলতে।
তারপর কী হল?
নিজের চোখে দেখেছি বললাম না। আমার চার হাতের মধ্যে ঘটনা। সেই ছোড়া এসে এক কোপে ঘাড়টা অর্ধেক নামিয়ে দিয়ে এক দৌড়ে চলে গেল।
হেমকান্ত শিউরে চোখ বুজলেন। দৃশ্যটা তিনি মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিল। খুন এ বংশের রক্তে নেই। যতদূর তিনি জানেন, তাঁর পূর্বপুরুষেরা কেউই খুন করেননি বা কাউকে লাগিয়ে অন্য কাউকে খুন করাননি। লেঠেল বা পোষা গুন্ডা থাকা সত্ত্বেও। তা হলে কৃষ্ণ এ কাজ করল কী করে? তার ছেলে হয়ে তিনি যে পিপড়ে মারতেও মায়া বোধ করেন!
সাধু হেমকান্তর মুখের ভাব লক্ষ করছিল। কথা বলল না। কিন্তু মৃদু-মৃদু হাসতে লাগল।
হেমকান্ত চোখ খুলে সাধুর মুখের সেই হাসি দেখে কোঁচকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, তারপর?
আর কী? অন্ধকারে তেমন কিছু দেখারও ছিল না। টর্চের আলো পড়ছিল খুব এধার ওধার। শেষ অবধি কয়েকটা পুলিশ কাঁকাতে কাঁকাতে পাটখেত থেকে বেরিয়ে এসে আমার ওপর হামলে পড়ল। দারোগাকে কে খুন করেছে, তা তাদের বলতে হবে।
আপনি বললেন?
পাগল নাকি? বললে স্বদেশিরা এসে কেটে রেখে যাবে না আমাকে? তাই আমি সাফ বলে দিয়েছি ভয়ে ভিরমি খেয়ে পড়ে ছিলাম, কিছু দেখিনি।
তারা বিশ্বাস করল?
সে তারাই জানে। তবে সাধু দেখে আর ঘটায়নি।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তারা হিন্দু বলে সাধু দেখে ছেড়ে দিয়েছে। ধর্মান্ধ ভিতু জাত তো। কিন্তু এরপর সাহেব আসবে। তারা ছেড়ে কথা কইবে না। দরকার বোধ করলে বেঁধে থানায় নিয়ে বেত মারবে। তখন কী করবেন?
সাধু বড় বড় চোখে চেয়ে বলল, তাই করে নাকি ম্লেচ্ছগুলো?
করে। ওদের অত ধর্মভয় নেই।
তা হলে তো ঝুলিয়েছিস আমাকে।
আপনি বরং এক কাজ করুন। কিছু টাকা দিচ্ছি, এখান থেকে সরে পড়ুন। কাউকে কিছু বলবেন না।
সাধু তৎক্ষণাৎ হাতটি পেতে বলে, দে তা হলে।
যাবেন?
যাব বলেই তো বেরিয়ে পড়েছি। আমি কি বোকা? দে, তাড়াতাড়ি দে।
হেমকান্ত পকেটে হাত দিয়ে বললেন, পাচটা টাকা দিলে হবে তো?
তুই খুব কৃপণ। দে, তাই দে। কৃপণের বড় টাকার কষ্ট রে।
হেমকান্ত টাকাটা দিয়ে বললেন, স্বদেশিরা কোনদিকে গেছে জানেন?
সেটা জেনে কী হবে? তারা কি কোথাও বসে থাকবে? যে যেদিকে পারে পালিয়েছে। বাড়ি যা।
কোনও হদিশ দিতে পারেন না?
ছেলের জন্য ভাবছিস তো! পাগল। ছেলে যে তোর নয় এটা বুঝবার চেষ্টা কর গে। যখন ছোট ছিল তখন পেলেছিস, পুষেছিস, এখন দুনিয়ার হাতে ছেড়ে চলে যা।
ছেলেটা যে বড় ছোট।
আমি কত বছর বয়সে সন্ন্যাস নিই জানিস?
কত বছর?–বলে হেমকান্ত বিস্মিত চোখে তাকালেন।
শুনলে হাসবি। মায়ের বুকে দাগা দিয়ে বাবাকে কাঁদিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। তাও এ জন্মে বুঝি সিদ্ধি হল না। ফের আসতে হবে।
দার্শনিক কথাবার্তা হেমকান্তর এখন সহ্য হচ্ছিল না। সাধুদের তিনি দুচোখে দেখতেও পারেন না। বিরস মুখে বললেন, না জানলে বলবেন না। কিন্তু পুলিশের হাতেও পড়বেন না যেন।
সাক্ষী রাখতে চাস না তো! আমিও কি সাক্ষী থাকতে চাই রে? কী যে সব হুড়যুষ্টু বাবা, মানেই খুঁজে পাই না।
এই বলে সাধু উঠল। বলল, তোদের তো নৌকো আছে।
আছে।
তবে আমাকে শম্ভুগঞ্জে পৌঁছে দে। ওখান থেকে হাঁটা দেব।
কোনদিকে যাবেন?
ওরে তোর ভয় নেই। আমি গারো পাহাড় পেরিয়ে হিমালয়ের দিকে চলে যাব। সাহেব আমাকে খুঁজে পাবে না।
না পাওয়াই দরকার। আপনি যদি সাক্ষী দেন তবে আমার ছেলের ফাঁসি হবে।
জানি। আমি কারও নিমিত্ত হতে চাই না, এবার ওঠ। বেলা হল।
হেমকান্ত উঠলেন।
সাধুকে শম্ভুগঞ্জে এক আঘাটায় নামিয়ে দিয়ে ভারাক্রান্ত মনে ফিরে এলেন বাড়িতে। যখন এলেন তখন সারা শহর থমথম করছে। রাস্তায় লোজন নেই। বাচ্চারা পর্যন্ত চলাফেরা করছে না।
রঙ্গময়ি অপেক্ষায় ছিল। হেমকান্ত বাড়িতে পা দিতে না দিতেই ছুটে এল।
কোথায় গিয়েছিলে?
হেমকান্তর ভিতরটা দুশ্চিন্তায় কেমন বোবা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে থেকে মাথা নেড়ে বললেন, পাওয়া গেল না।
তুমি ওকে খুঁজতে গিয়েছিলে?—রঙ্গময়ি রীতিমতো ধমক দেয়।
কেন? তাতে দোষ হয়েছে?
খুঁজতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনবে যে!
তার মানে?
স্বদেশিরা যদি কৃষ্ণকে নিয়ে গিয়ে থাকে তবে ওরাই ওকে দেখবে। কিন্তু তোমাকে কেউ দেখবে না।
তার মানে?
তোমাকে রক্ষা করার কেউ তো নেই।
আমার কী হবে?
কী হয়েছিল মনে নেই?
হেমকান্ত একটু চুপ করে থেকে বললেন, এর চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি এই মনের ভার আর বইতে পারব বলে মনে হয় না।
পারতে হবে। কৃষ্ণর জোরই তো তুমি। কত ভালবাসে তোমাকে।
এই কি ভালবাসার লক্ষণ?
নয় কেন?
একবার বলেও গেল না কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে।
ঠিক কাজই করেছে। এ তুমি বুঝবে না। তবে একথা জেনো, ও তোমাকে যত ভালবাসে তত আর কাউকে নয়।
