হেমকান্তর বিস্ময়বোধ স্তিমিত হলে তিনি বললেন, কারও থাকার কথা নয় কেন? কোথায় গেছে সব?
লোকটা আবার একটা পিলে-চমকানো হুংকার দিল, পেন্নাম করেছিস? সাধু সন্ত দেখলে পেন্নাম করতে হয় জানিস না?
হেমকান্ত দ্বিধায় পড়লেন। সাধুসঙ্গ বড় একটা করেননি জীবনে। প্রণামের পাটও বহুকাল চুকে গেছে। অভ্যাসই নেই। একটু ইতস্তত করে প্রণামের জন্য এগিয়ে যেতেই সাধু ফের হুংকার দিল, ছুঁতে নেই। দূর থেকে গড় কর।
হেমকান্ত মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নোয়ালেন। উঠে বললেন, আমি আমার ছেলের খোঁজে এসেছি। শুনেছি সে বীরুবাবুর দলের সঙ্গে ছিল।
সাধু দাঁত কিড়মিড় করছিল। রাগে না কোনও শারীরিক কারণে তা কে বলবে! তবে এবার একটু গলার পর্দা নামল। বলল, তারা এখানে থাকবে কেন? বোকা নাকি? পুলিশ আসবে খবর পেয়ে কালই সব সরে পড়েছে।
শুনলাম গুলিগোলা চলেছে।
ওই উত্তরে আরও মাইল দুই দূরে একটা পাটখেত আছে। সেখানে খুব লড়াই হয়েছে। দুটো মরেছে। এ পক্ষের একটা, ও পক্ষের দুটো।
দারোগাবাবু ছাড়া আর কে?
তা জানি না। তোর ছেলে কত বড়?
বেশি বড় নয়।
বাচ্চা নাকি?
ঠিক তাও নয়।
খোঁজ নে। নাম কী বল তো।
কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী।
তোর নাম কী?
হেমকান্ত চৌধুরী।
অ! তোরা সেই জমিদার বুঝি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তা তোর বংশের ছেলে স্বদেশি করছে কী রে! আঁ। এ যে দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ! দে, কিছু প্রণামী দে।
হেমকান্ত বিরক্ত হলেন। মাগুনে লোককে দুচোখে দেখতে পারেন না। তাই চুপ করে রইলেন।
সাধু একটা গা-জ্বালানো হাসি হেসে বলল, তুই কৃপণ নাকি?
হেমকান্ত গম্ভীর মুখে বললেন, প্রণামী কীসের? আমি প্রণামী-টনামী দিই না।
হাড়-কেপ্পন কোথাকার! কৃপণের বড় কষ্ট তা জানিস! টাকার ওপর বসে থেকেও ভোগ করতে পারে না। জ্যান্ত যম। তুই কৃপণ কেন?
কৃপণ কে বলল?
তবে প্রণামী দিচ্ছিস না কেন? দে, দে, দিয়ে ফেল। যত দিবি তত বাঁচবি।
সাধু বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিল। হেমকান্ত বিরক্ত বোধ করলেন। লোকটার হাবভাব সন্দেহজনক এবং ব্যবহার অপমানকর। তাঁকে তুই করে বলে এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। অন্য সময় হলে তিনি লোকটাকে উপেক্ষা করে স্থানত্যাগ করতেন। কিন্তু এখন ছেলের জন্য চিন্তায় তার বুক শুকিয়ে আছে। এ লোকটা কিছু খবর দিতে পারে বলেই মনে হয়। এ পক্ষের দুজন মরেছে, তাদের মধ্যে কৃষ্ণ নেই তো?
হেমকান্ত পকেট থেকে একটা টাকা বের করে লোকটার হাতে দিয়ে বললেন, স্বদেশিদের মধ্যে যে দুজন মারা গেছে তাদের নাম কী?
সাধু টাকাটা কাঁধের একটা গেরুয়া ঝোলায় রেখে বলল, তোর ছেলে মরেনি। ভয় নেই। তবে মরবে।
তার মানে?
দারোগাটাকে ওই মেরেছে কিনা।
ও মেরেছে?–হেমকান্ত হাঁ করে রইলেন।
মেরেছে বলতে মেরেছে! একেবারে সাক্ষাৎ নিজের হাতে।
বাজে কথা।
আমি নিজের চোখে দেখেছি, বুঝলি ব্যাটা!
হেমকান্ত তবু চেয়ে রইলেন। চোখে অবিশ্বাস। কিছুক্ষণ কথাই এল না মুখে। তারপর বললেন, আমার ছেলে এ কাজ করতে পারে না।
সাধু চারপাশটা একটু দেখে নিল। তারপর মৃদু একটু হেসে বলল, সংসারী মানুষের অনেক দোষ রে শালা। একটা দোষ কী জানিস? বড় মায়ায় জড়িয়ে পড়ে। ওই মায়ার চোখ দিয়ে দেখে বলে ছেলেপুলে সম্পর্কে সত্যি কথাটা মানতে চায় না। ভাবে, লোকে বানিয়ে বলছে।
আপনি দেখেছেন?
বলছি না, নিজের চোখে দেখেছি।
কী দেখেছেন?
সে তোকে বলব নে? একটা টাকা দিয়ে কি মাথা কিনেছিস নাকি?
হেমকান্ত ভারী অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, টাকা দিয়ে মাথা কিনব কেন?
তোদের চিনি না ভেবেছিস? টাকাটা দিলি, কিন্তু ঘেন্না করে দিলি, দিয়েই নানারকম খোঁজ খবর করতে লাগলি। ভাবছিস টাকা যখন দিয়েছি তখন এই জন্তুটা সব গড়গড় করে বলে দেবে!
হেমকান্ত আসলে তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু লোকটা তা বুঝল কী করে? হেমকান্ত লজ্জিত হয়ে বললেন, তা ভাবছি না। আমি আমার ছেলের জন্য বড় দুশ্চিন্তায় আছি।
তোর ছেলে। তোর ছেলে হবে কেন? ছেলে কি তোর নিজের হাতে গড়া? ছেলে ভগবানের, তুই নিমিত্তমাত্র। বাড়ি যা, গিয়ে কথাটা বসে বসে ভাব। শান্তি পাবি।
ঘটনাটা বলবেন না?
খটমটে এবং খিটখিটে সাধুটা হঠাৎ ফোকলা একটা হাসি হাসল। বলল, খুব জানতে ইচ্ছে করছে?
জানা দরকার। ছেলেটার কী হল, না জানলে স্বস্তি বোধ করছি না।
তা হলে আর-একটা টাকা দে। দেখিস অবহেলায় দিস না।
হেমকান্ত বিনাবাক্যে আর-একটা টাকা বের করে সাধুর বাড়ানো হাতে দিলেন।
সাধু সেটা ঝোলায় পুরে বলল, আমি কিন্তু স্বদেশিদের দলের নই। দেখিস বাবা, পুলিশ লেলিয়ে দিস না। ওরা বড় মারে শুনেছি।
না, আপনি বলুন। আমি বড় অশান্তিতে আছি।
বলছি। আয়, ওই সর্ষেখেতের মধ্যে গিয়ে বসি। এ জায়গায় লোকজন এসে পড়বে।
হেমকান্ত রাজি হলেন। সাধু তাদের সর্ষেখেতের মধ্যে নিয়ে এল। এবড়ো খেবড়ো জমির ওপর গাট হয়ে বসে সাধু বলল, আমি ওই পাটখেতের ধারে একটা বটগাছের তলায় থাকি। স্বদেশিরা ছিল দশ বারো জন। সকলের মুখ চিনি। কাল মাঝরাতে ঘুমিয়ে ছিলাম, এমন সময় গুলিগোলার আওয়াজ শুনে উঠে পড়ি। ধুনিটা উসকে দিয়ে মজা দেখি, পাটখেতের মধ্যে কুরুক্ষেত্তর হচ্ছে। অন্ধকারে ভাল দেখা না গেলেও দৌড়ঝাপ হুড়োহুড়ি খুব বোঝা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ এরকম চলার পর একটা দশাসই লোক, তার গায়ে পুলিশের পোশাক, দৌড়ে পালিয়ে আসছিল। তার ডান হাত দিয়ে খুব রক্ত গড়াতে দেখেছি।
