নিলে নেবে। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
কেন? আমি কী দোষ করলাম?
কী করেছ তা জানি না। কিন্তু আমাকে নিয়ে চলো।
নিয়ে যাওয়ার কী আছে! হেঁটে বা রিকশায় স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে চাপলেই কলকাতা।
আমাকে এত ঘেন্না করো কেন, ধ্রুবদা?
ঘেন্না কেন হবে? ওয়ার্কিং গার্লদের ঘেন্না করার কী আছে? তবে তোকে বলি, যা তোর রেট বলছিস তার দশ ভাগের এক ভাগ মাইনেও চঞ্চলকে কেউ দেবে না।
নোটন একটু হাসল। বলল, তোমার প্রেস্টিজে লাগছে, না?
লেগেছে একটু। এসব করে রোজগার করছিস তারও আবার দেমাক কীসের?
দেমাক তোমাকে দেখাব না তো কাকে দেখাব? তোমার ওপরেই যে আমার সবচেয়ে বেশি রাগ।
সে তো বুঝলাম, রাগ থাকতেই পারে। কিন্তু এদের কেন বঞ্চিত করবি? পরে হয়তো ঝামেলা করবে।
করবে না।
কেন করবে না?
আমি বলব, ধ্রুব চৌধুরী আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
তাতে কী হবে? ওরা মানবে?
খুব মানবে। তোমাকে ওরা ভীষণ ভয় খায়।
তা বলে আমার বদনাম দিবি?
বদনাম একটু নাও ধ্রুবদা, আমার জন্য নাও। বিয়ে করোনি আমাকে, তোমার জন্য কম দুঃখ সইতে হয়নি, তার বদলে এটুকু বদনাম সহ্য করবে না?
কিন্তু এই নাটকটারও দরকার ছিল না।
ছিল। আজ শুধু তোমার সঙ্গে অনেকটা পথ ফিরব। আর-কোনওদিন হয়তো সুযোগ হবে না।
ধ্রুব ‘হা!’ জাতীয় একটা শব্দ করে বলল, চল তা হলে। আর দুটো মেয়ে কোথায়?
খুব খেয়ে পড়ে আছে।
বাগানের চোরাপথে গাছপালার আড়ালে ফটকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ধ্রুব হঠাৎ কী ভেবে একটু চোখ ফেরাল। দেখল, প্রশান্ত উঠোনের পাশটায় দাঁড়িয়ে সোজা তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
একজন দেখছে।–নোটন চাপা গলায় বলল, বলেই ঘোমটা তুলে মুখ আড়াল করল।
ধ্রুব বলল, ভয় নেই। ও প্রশান্ত। আমার খুব ইন্টিমেট ফ্রেন্ড।
ওকে ডেকো না তা বলে। আজ শুধু তুমি আর আমি।
এ যে আধুনিক গানের লাইন রে। ভ্যাট।
প্লিজ ধ্রুবদা, পায়ে পড়ি।
ডাকব কেন? প্রশান্ত এখন অনেক খাবে। যাবে না। তোর ভয় নেই।
দুজনে নিঃশব্দে রাস্তায় এসে পড়ল। ধ্রুব একটা রিকশার জন্য এদিক ওদিক চাইছিল। নোটন বলল, রিকশা না।
কেন রে?
একটু হাঁটব। পাশাপাশি।
ও বাবা! তুই যে বাড়াবাড়ি করছিস, নোটন।
মোটেই বাড়াবাড়ি নয়।-বলে নোটন তার হাতব্যাগ খুলে একটা অ্যান্টাসিডের স্ট্রিপ বের করে দুটো বড়ি ছিঁড়ে ধ্রুবর দিকে বাড়িয়ে বলল, আমারও ভীষণ অম্বল হয়। সঙ্গে রাখি। খাও।
খুব ড্রিংক করিস নাকি নোটন?
খুব করলে কি চলে? কাজ করে খেতে হয় না? অল্পস্বল্প খাই।
তবে অম্বল হয় কেন?
কী যে বলো না! অম্বল বুঝি শুধু ডিংক করলেই হয়? আমার ওপর দিয়ে কত অনিয়ম যাচ্ছে, খাওয়ার সময় অসময় নেই, রাতে ঘুমোনোর সময়ও হয়তো হল না। এসব থেকে হয়।
কতদূর নষ্ট হয়েছিস, নোটন?
নষ্ট! নষ্ট কীসের?
ও তাই তো! আমিও তো নষ্টামিকে খারাপ ভাবি না। সরি!
তুমি ভাবো। ভাবো বলেই বললে। বরং আমার কাছেই আর ওসব নীতির মূল্য নেই।
আমার কাছেও নেই রে। ঘোমটাটা এবার ফেলে দে।
কেন দেব?
আর তো কেউ দেখছে না।
তুমি তো দেখছ।
আমি কী দেখব?
নোটন একটু ঝিলিক দিয়ে হাসে, আজ ঘোমটাটা থাক। ঠিক এইভাবে একদিন তোমার পাশে পাশে হাঁটব বলে সেই শিশুকাল থেকে স্বপ্ন দেখেছি। আজ সত্যিই হাঁটছি তো, তাই ঘোমটাটা থাক।
তোর এখনও এইসব রোমান্টিক ইচ্ছে হয়?
হয়। কেন হবে না? ওই যে বয়ঃসন্ধিতে তোমাকে বর বলে মনে হয়েছিল, তাইতেই সর্বনাশ হয়ে গেল আমার। কখনও কোনও মেয়েকে বিয়ের আগে বলতে নেই, ওই তোর বর। ভীষণ খারাপ ওটা, জানো?
বুঝলাম।
কোনওদিনই বুঝবে না, ধ্রুবদা। মনে মনে হাসছ।
হাসছি তোর ঘোমটা দেখে লোকে কী ভাবছে?
ভাবাতেই তো চাইছি। বড়ি দুটো খাও।
হাতের বড়ি দুটো মুখে ফেলে চিবোয় ধ্রুব। বলে, শীতের কিছু গায়ে দিলি না। এখানে খুব ঠান্ডা।
আমার বেশ লাগছে।
হুইস্কি খেয়েছিস নাকি?
না। আজ খাইনি।
আমার সম্মানে নাকি?
বলতে পারো।
ধ্রুব আড়চোখে তাকাল। খুব কাছ ঘেঁষে ঘোমটা মাথায় হাঁটছে নোটন। গা থেকে সুন্দর গন্ধ আসছে। একটু বিভ্রমের মতো। একটু মায়া। পৃথিবীটা এরকম একটা মায়াই। ক্ষণস্থায়ি সম্পর্ক, ক্ষণস্থায়ি তার তাৎপর্য।
০৮৭. বজ্রনির্ঘোষের মতো কণ্ঠস্বর
বজ্রনির্ঘোষের মতো কণ্ঠস্বরটি শুনে হেমকান্ত স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ তার শরীরে সাড় রইল না, মনটা থমকে গেল। তার যে নিজস্ব জগৎ সেখানে উচ্চকিত কোনও ঘটনা ঘটে না, শব্দ হয় না। সবকিছুই সেখানে কোমল, ন, মৃদু। এরকম একটা পারিপার্শ্বিক তিনি তৈরি করে নিয়ে সেখানে নির্বাসিত করেছেন নিজেকে। পৃথিবীর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সব মায়া সেখানে শিল্পের মতো তন্তুজাল বিস্তার করে। বাইরের শব্দময়, ঘটনাবহুল পৃথিবীর সেখানে প্রবেশ নিষেধ। তাই এই কর্কশ, সুরহীন, হিংস্র কণ্ঠস্বরটি তার ভিতরে সব স্পন্দন যেন কয়েক নিমেষের জন্য স্তব্ধ করে দিল। যেন বা থেমে গেল রক্তের প্রবহমানতা, বন্ধ হয়ে গেল হৃৎপিণ্ড।
তারপর খুব ধীরে ধীরে হেমকান্ত মুখ ফেরালেন। যা দেখলেন তা আরও চমকে দেয় তাকে। জটাজুটধারী এবং সামান্যমাত্র রক্তাম্বর পরিহিত এক সাধু কটমট করে চেয়ে আছে তার দিকে। সাধুটি বয়স্ক, কেননা জটার চুল সবই প্রায় সাদা, গায়ে লোলচর্ম, দেহটি কৃশকায় এবং তোক্লিষ্ট। শুধু চোখ দুটি ভয়ংকর রকমের উজ্জ্বল।
হেমকান্ত অনুমান করলেন, লোকটির বয়স আশির কাছাকাছি। এই বয়সে কৃশ শরীরের ভিতর থেকে এরকম বাজখাই স্বর কী করে বেরোয় সেটাই রহস্য।
