নোটন মাথা নিচু করে বসে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, দাদার দোষ থাকতেই পারে। কিন্তু আমরা তো কোনও অন্যায় করিনি। মনু ঠাকুমা পর্যন্ত আমাদের দূর দূর করে খোল।
ধ্রুব একটু হাসল। নোটন বোধহয় জানে না ওদের ওপর কৃষ্ণকান্তের এত রাগের প্রকৃত কারণটা কী। তাই সে বলল, তোর দাদার দোষটাই বড় নয় রে, নোটন। আরও একটা ব্যাপার আছে।
নোটন একটু চমকে উঠে ধ্রুবর দিকে চেয়ে বলল, কী বলল তো!
তুই কি জানিস না?
নোটন কী ভেবে হঠাৎ ফের মাথা নিচু করে বলে, সে তো জানি। তোমার সঙ্গে আমার বিয়ের প্রস্তাব তো?
তবে জানিস।
সেটা মার খুব ভুল হয়ে গিয়েছিল।
ভুল! ভুল কীসের?
মা তোমাকে দেখে একেবারে মুগ্ধ। তারপর মা-মরা ছেলে বলে বোধহয় মায়াও ছিল খুব। আমাকে অনেক অল্প বয়েস থেকে মা শিখিয়েছিল, ওই ধ্রুবই তোর বর।
বটে! তুইও তাই ভাবতি?
ভাবব না! শিবরাত্তিরে শিবের মাথায় জল ঢালতে পর্যন্ত তোমাকে ভাবতে হয়। এক সময়ে সেটাই তো বিশ্বাস করতাম।
ধ্রুব হাসতে গিয়েও একটু লাল হল লজ্জায়।
নোটন একটু বিষণ্ণ গলায় বলে, মা তো বোকা, তাই ওই কাণ্ড করেছিল। মনু ঠাকুমা মাকে বহুবার বলেছে, ও কাজ করতে যেয়ো না, কৃষ্ণ খেয়ে ফেলবে। তবু মা কেমন বেহেড হয়ে গেল। কিন্তু সেইজন্যই কি জ্যাঠামশাইয়ের এত রাগ!
ধ্রুব একটা শ্বাস ফেলে বলে, সামন্ত রক্ত তো, চট করে গরম হয়। শোন নোটন, তোরা ফুর্তি কর। আমি চুপি-চুপি কেটে পড়ি।
নোটন একটু কাছে সরে এসে বলে, তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে শরীর ভাল নেই। কী হয়েছে বলল তো!
অম্বল। আজকাল হচ্ছে খুব।
এখনও কি ড্রিংক করো?
করি। ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আমার বাবা বলত তোমাদের বংশে নাকি মদের চলন নেই। কেউ কখনও খায়নি। তাই বাবার ধারণা ছিল, তুমি বোধহয় মদ খেয়ে মরেই যাবে। সহ্য হবে না।
ধ্রুব একথাটায় হাসল না। তবে মাথা নেড়ে বলল, মদ খেতে হলে হেরিটেজ দরকার হয় না। তবে একথাটা ঠিক যে আমার নেশাও নেই। জোর করে খাই। না খেলে কিছু ফিল করি না।
জোর করে খাও কেন?
তোকে কেন বলব?
কেন বলবে না?
সব কথা তোর জানার দরকার নেই।
নোটন আচমকা লঘু গলায় বলে, ভুলে যাচ্ছ কেন আমি তোমার বউ হলেও হতে পারতাম।
এই প্রগভতা ধ্রুব নীরবে সহ্য করল। তবে একটু বাদে তেতো গলায় ছোট্ট করে বলল, ভাগ্য ভাল যে হোসনি।
কেন? ভাগ্য ভাল কেন বলছ?
বড্ড দুনম্বরি হয়ে গেছিস রে, নোটন।
বিয়ে হলে হতাম?
যারা হয় তাদের মধ্যে বীজাণু থাকে।
নোটন হঠাৎ খামচে ধরল ধ্রুবর হাত। প্রবল শ্বাসের সঙ্গে তীব্র স্বরে বলে, কক্ষনও নয়! কিছুতেই নয়। বরং বিয়ে করেনি বলেই আজ আমি এরকম। এখনও তোমার ওপর রাগে অভিমানে আমি অনেক সময় একা ঘরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি।
ভুল করিস।
করি তো। কিন্তু কী করব? মা কেন ভুল শিখিয়েছিল?
সে তোর মা জানে আর তুই জানিস। শোন এখন সিন ক্রিয়েট করে লাভ নেই। তোর একটা ছোটভাই আছে না?
আছে। চঞ্চল।
তার বয়স বোধহয় পনেরো-যোলো হল!
বেশি। আঠারো।
আমার কাছে চঞ্চলকে আসতে বলিস।
চাকরি দেবে?
দিতে পারি।
কত টাকা মাইনের চাকরি?
হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?
নোটন একটু হাসে, আমাকে এসব করতে দেবে না তো? কিন্তু এসব করে আমি যা রোজগার করি, চঞ্চল তার অর্ধেক টাকাও মাইনে না পেলে তো হবে না।
ধ্রুব ফের স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলে, স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং খুব বেড়েছে তা হলে! আঁ!
একটু বেড়েছে। আর শোনো, আমার ভাল করতে চেয়ো না।
তোর ভাল করতে কে চাইছে! ভালই তো আছিস। আমার আবার বেশি সতীপনা ভালও লাগে। চঞ্চলকে চাকরি দিতে চাইছি তোর জন্য নয়। অন্য কারণে।
কী কারণ সেটা তো বলবে।
একটা প্রায়শ্চিত্ত করতে।
কীসের প্রায়শ্চিত্ত?
আমার বাবা বিনা দোষে তোর দাদাকে তাড়িয়েছিল। আমি বাবার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।
নোটন খানিকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর হঠাৎ মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ধ্রুব খুব ধীরে ধীরে উঠল। কিছু না বলে আস্তে আস্তে পিছনের ফটকের দিকে এগোতে লাগল। বেলা পড়ে এসেছে। সামনের দিক থেকে মাতাল গলার কিছু স্তিমিত কোলাহল আসছে। এখন কেউই আর স্বাভাবিক নেই।
কয়েক পা এগোতেই নোটন ডাকল, কোথায় যাচ্ছ?
চলে যাচ্ছি।
একটু দাঁড়াও। আমার দরকার আছে।
আমার সঙ্গে তোর আর দরকার কীসের?
আছে। শোনো, আমি তোমার সঙ্গে যাব।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, পাগল? ওরা তোকে পয়সা দিয়ে এনেছে। ছাড়বে কেন?
নোটন উঠে এসে ধ্রুবর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, সবাই ডেড-ভ্রাংক। কেউ টের পাবে না।
ড্রাংকদের আমি চিনি রে, নোটন। ঠিক টের পাবে।
তাছাড়া টাকা আমি সবটা আগাম নিয়ে নিয়েছি।
কত দিয়েছে?
হাজার।
বাঃ, তোর রেট তো ভাল।
নোটন মাথা নামায়।
ধ্রুব বলে, দিনে হাজার হলে তোর মাসের রোজগার ত্রিশ হাজার।
মোটেই নয়। এরা বেশি দিয়েছে। তাছাড়া সব দিন এসব হয় নাকি?
এরা তোকে বেশি দিল কেন?
জেদাজেদি করে।
সেটা কীরকম?
আমি ফিলমে ছোটখাটো রোল করি, জানো?
শুনেছিলাম। তোর ছবি আমি দেখিনি। একটাও।
দেখবে কী? রিলিজই হয়েছে মাত্র দুটো। একটা সুপার ফ্লপ।
তারপর বল রেট বেশি পেলি কেন?
আজ আমার শুটিং ডেট ছিল। ডিরেক্টর ছাড়বেন না, এরাও ছাড়বে না। টানাটানিতে হাজার টাকা পেয়ে গেলাম।
বাঃ, ব্যাবসার মাথা তো পরিষ্কার।
ঠাট্টা করছ?
না। শুধু ভাবছি এত টাকা পেয়েও যদি পালিয়ে যাস তবে পরে এরা বদলা নেবে কি না।
