চলুন।
রাস্তাটা ধরে পুবদিকে খানিকটা এগোনোর পর ডানহাতে একটা সরু পথ পাওয়া গেল। গঙ্গা সেইদিকে দেখিয়ে বলল, এই কাছেই।
কয়েক রশি পথ। চারদিকে ঘন গাছপালা, আগাছা, বসতিহীন জমি। সেসব ডিঙিয়ে খানিকদূর এগোবার পর একটা খোছড়া ঘর নজরে পড়ল। চারদিকটায় ফাঁকা পোড়ো জমি। নির্জন।
কেউ তো এখানে নেই বলে মনে হচ্ছে।-হেমকান্ত সভয়ে বললেন।
থাকবার কথাও নয়।—এক বজ্ৰগভীর গলা পিছন থেকে বলে উঠল।
০৮৬. নোটন
ধ্রুব আধবোজা চোখে নোটনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই চেয়ে থাকে।
বলতে নেই নোটনের মুখখানা ভারী ছমছমে সুন্দর। আভিজাত্য নেই ঠিকই, কিন্তু চটক আছে, যৌন আবেদন আছে। নোটনের মুখে আভিজাত্যের ছাপ থাকার কথাও নয়। কিন্তু একটু পবিত্রতা আশা করা যেত। কারণ ওর দাদু আর দাদুর বাবা দুই পুরুষ ধরে ধ্রুবদের দেশের বাড়ির বাঁধা পুরুত ছিল। গুরুগিরি করত। নোটন মনু ঠাকুমার দাদার সাক্ষাৎ নাতনি। ওই তেজস্বিনীর রক্তের উত্তরাধিকার এর মধ্যে কিছুটা থাকার কথা ছিল।
নোটনের মুখের দিকে চেয়ে এইসবই বোধহয় খুঁজছিল ধ্রুব।
কিন্তু নোটন সেই চোখের অন্যরকম মানে করে সিটিয়ে গিয়ে বলল, ওরকম তাকিয়ে আছ কেন?
আমার চোখকে ভয় পাস?
পাই না আবার? যা রাগী তুমি!
রাগী বলে ভয় পাস, না কি নিজের মনে পাপ আছে বলে?
একথায় নোটনের চোখ ছলছল করতে লাগল। কতটা অভিনয়, কতটা সত্যিকারের অভিব্যক্তি তা ধরা মুশকিল। ধ্রুব সেটা বোঝার জন্যই নোটনের ক্রন্দনোন্মুখ মুখখানার দিকে ফের একদৃষ্টে চেয়ে থাকে।
নোটন হাঁটু জড়ো করে বসেছে, দুহাতে জড়ানো দুই হাঁটু, তার ওপর থুতনি ছিল। এখন মুখটা সরিয়ে আঁচলে চোখ মুছে বলল, আজ কেবল বকবেই বুঝি?
বকেছি নাকি? কই, বুঝতে পারিনি তো?
বকেছ। বকতে তোমরা পারো, কিন্তু আমাদের অবস্থাটা তো জানতে না!
মুকুল এখন কোথায়?
নোটন তার কচি ঠোঁট ভারী সুন্দর ভঙ্গিতে উলটে বলল, কী জানি কোথায়? আগে ভাবতাম ঠিক একদিন ফিরে আসবে, সংসারের দায়িত্ব নেবে। এখন আর ওসব ভাবি না। কোথাও আছে বোধহয়, হলে মরেটরে গেছে।
তোরা খোঁজ করিসনি। ঠিকমতো খোঁজ করলে পাত্তা পাওয়া যেত।
পেয়ে লাভ কী? শুধু মা একটু ঠান্ডা হত, আর কী হবে বলো? বেকার ছেলেরা বাড়ি বসে বসে কেবল গার্জিয়ানি করে ছোটদের ওপর। গেছে ভাল হয়েছে।
ধ্রুব স্থির দৃষ্টিতে দেখছিল নোটনকে। মায়ের পেটের দাদা সম্পর্কে এত ঔদাসীন্য খুব স্বাভাবিক নয়। তবে বোধহয় অস্বাভাবিকতাই আজকাল স্বাভাবিক। মানুষের মন আজকাল এরকমই।
ধ্রুবর শরীর এখন ততটা খারাপ লাগছিল না। শুধু গলা পর্যন্ত অম্বলের একটা জ্বালা। অম্বল আজকাল সবসময়কার সঙ্গী। এর ভয়ে সে মদ খায় না, তবু হচ্ছে। শরীরে ঝিমুনির ভাবটাও আছে। কিন্তু নোটনের সামনে বসে থেকে শরীরকে খুব একটা টের পাচ্ছিল না সে। নোটনের এই অধঃপতন তার নিজেরও ব্যক্তিগত অপমান বলে মনে হচ্ছে। তেমন কোনও কারণ নেই মনে হওয়ার। সামান্য যে কারণটা ছিল তাকে কারণ বলে না ভাবলেই হয়। বেশ কয়েক বছর আগে নোটনের সঙ্গে তার একটা বিয়ের প্রস্তাব এনেছিল নোটনের মা। কৃষ্ণকান্ত তাদের ওই স্পর্ধায় এমন চটে গিয়েছিলেন যে শুধু হাতে-মারা বাকি ছিল। কিন্তু কৃষ্ণকান্ত শেষ অবধি ভাতে ওদের ঠিকই মেরেছেন। নোটনের দাদা মুকুল কৃষ্ণকান্তর ওকালতি ব্যাবসার কেরানি ছিল। ডালহৌসির অফিসে বসত। একটু কুঁড়ে ছিল ছেলেটা, কামাই করত। এছাড়া তেমন কোনও দোষের কথা ধ্রুব জানে না। কৃষ্ণকান্ত মুকুলকে তাড়ালেন তো বটে, তার আগে যথেষ্ট অপমান করলেন। সম্ভবত মুকুলের আত্মসম্মান জ্ঞান কিছু প্রখর ছিল। সে সেই যে পালাল আর কখনও ফিরে আসেনি। নোটনদের অবস্থা খারাপই ছিল, আরও খারাপ হতে লাগল। মনু ঠাকুমা ওদের আশ্রয় দিতে পারত, দেয়নি। মনু ঠাকুমার অন্ধ এক মেহ আছে কৃষ্ণকান্তর ওপর। তার ধারণা কৃষ্ণ সাধারণ ছেলে নয়, দেবতার অংশ। কৃষ্ণ কখনও ভুল করে না, অন্যায় করে না।
কৃষ্ণকান্ত সম্পর্কে এরকম হঠকারী ধারণা আরও অনেকেরই আছে। যেমন ছিল ধ্রুবর দাদু হেমকান্তর। তার ধারণা ছিল, কৃষ্ণকান্ত ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী হবে। দেশের আরও অনেক আহাম্মকেরই সম্ভবত এরকম কোনও ধারণা ছিল। কৃষ্ণকান্ত প্রধানমন্ত্রী না হলেও ভারতবর্ষের রাজনীতিতে নিজস্ব একটা জায়গা করে নিতে পেরেছেন এইসব ধারণাকে ভাঙিয়েই।
ধ্রুবর স্থির ও অনুসন্ধানী চোখের ওপর চোখ রাখতে পারল না নোটন। মুখ নামিয়ে নিল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, আমাদের তোমরা শেষ করে দিতে চেয়েছিলে, ধ্রুবদা। দেখো, আমরা শেষ হয়ে গেছি।
ধ্রুব একটা বড় রকমের শ্বাস ছেড়ে বলল, নাটক-ফাটক করিস নাকি?
চকিতে একবার মুখের দিকে চেয়ে নোটন বলল, করি। করব না কেন?
তাই বেশ সাজানো ডায়ালগ দিচ্ছিস।
সাজানো হবে কেন? কথাটা খারাপ শোনাতে পারে, কিন্তু সত্যি কি না বলো!
আমি তোদের শেষ করতে চেয়েছি একথা কে বলল?
তোমার কথা তো বলিনি। বলেছি তোমরা।
আমরা বলতে কে কে?
ধরো জ্যাঠামশাই।
জ্যাঠামশাই থার্ড পার্সন সিংগুলার নাম্বার। তোমরা বলতে তাকে বোঝায় না।
ও বাবা, অত কথা আমি জানি না। শুধু জানি তোমরা সব একরকম।
খুব জানিস তো!
রাগ কোরো না, ধ্রুবদা। আমি তোমাদের নিন্দে করছি না।
ভয় পাচ্ছিস কেন? রাগ করলেও আমি তো কোনও ক্ষতি করব না। করার সাধ্য নেই।
