শচীন শুকনো মুখে মাথা নেড়ে বলে, না।
কৃষ্ণর কোনও হদিশ করতে পেরেছ?
না। আর সেইটেই চিন্তার বিষয়।
হেমকান্তর বুকটা কেঁপে উঠল আবার। বললেন, চিন্তার কারণ তো বটেই। একটু কোনও খবরও পাওয়া যায় না?
শচীন খুব সোজাসুজি হেমকান্তর দিকে চেয়ে থেকে বলল, একটা খবর আমার কাছে আছে।
হেমকান্ত কাঁপা গলায় বললেন, খারাপ খবর?
একদিক দিয়ে দেখতে গেলে খারাপই।
এসো গাড়িতে গিয়ে বসি। প্রকাশ্যে রাস্তায় এসব কথা না হওয়াই ভাল।
গাড়িতে দুজনে মুখোমুখি বসার পর হেমকান্ত জানালা দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর খানিকক্ষণ দম নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে বললেন, এবার বলো।
শচীন মৃদুস্বরে বলল, কৃষ্ণ বোধহয় স্বদেশিদের খপ্পরে পড়েছে।
খপ্পরে বলতে কী বোঝাতে চাইছ? গুম করেছে?
না। আমি বলতে চাইছি, স্বদেশিদের সঙ্গে কোনও সূত্রে ওর যোগাযোগ হয়েছে। ওকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
স্বদেশি বলতে কোন দল? কার দল?
বীরু সেনের দল।
হেমকান্ত চুপ করে গেলেন। বীরু সেন কে তা তিনি জানেন না। তবে জানতে চাইলেনও না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কৃষ্ণকে দিয়ে ওদের কী কাজ হবে বলো তো! ও তো নেহাত বাচ্চা ছেলে।
বাচ্চাদের দিয়েই কাজ হয়। বিশেষ করে কৃষ্ণর মতো ব্রাইট ছেলে পেলে তো কথাই নেই।
কিন্তু যদি খুনখারাপি কয়?
শচীন মুখটা নামিয়ে নিল। কিছু বলল না।
হেমকান্তব হঠাৎ মনে হল, শচীন কিছু গোপন করতে চাইছে। তিনি একটু ঝুঁকে বললেন, কোথায় রেখেছে ওকে জানো?
শচীন মুখ তুলল। চোখের দৃষ্টি করুণ। বলল, যতদূর জানি কেওটখালিতে।
যেখানে রামকান্ত রায়কে মারা হয়েছে?
তাই তো গুজব।
হেমকান্ত শচীনের হাতটা চেপে ধরে বললেন, যাবে? চলো একবার গিয়ে ছেলেটাকে দেখে আসি।
শচীন স্তিমিত গলায় বলল, কী করে যাবেন? পুলিশ গোটা এলাকা ঘিরে ফেলেছে।কাউকে ওই অঞ্চলে ঢুকতে দেবে না।
ঠিক দেবে। আমরা ঠিক পথ করে নেব।
পুত্রের জন্য উদ্বেগে পাগল বাপের পাগলামি শচীনের অজানা নয়। সে ম্লান একটু হেসে বলল, আমি সে চেষ্টা আগেই করেছি। ওই অঞ্চলে যাওয়ার কোনও উপায় নেই।
পুলিশ কি অ্যাকশন নিচ্ছে ওখানে?
নেওয়ারই তো কথা।
যদি কৃষ্ণর কিছু হয়?
শচীন জানে, কৃষ্ণ একা নয়, বীরু সেনের গোটা দলটাকেই পুলিশ হয় ধরবে, নয়তো পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেবে। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট নিজে সেখানে হাজির আছে। তবে শচীন সেকথা বলল না, বরং বলল, না তেমন ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্বদেশিরা কি অত বোকা? নিশ্চয়ই পালিয়ে গেছে।
কিছু খবর পেয়েছ?
এটুকু জানি যে, এখনও কেউ ধরা পড়েনি বা মরেওনি।
হেমকান্তর হাত পা বুক সবই কাঁপছে। তিনি অস্থির বোধ করতে লাগলেন। বললেন, ঠিক আছে। তুমি এখন কী করবে?
আমি থানায় আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। খবর যা আসার তা থানাতেই আসবে।
খবর পেলে আমাকে জানাবে সঙ্গে সঙ্গে।
নিশ্চয়ই। আপনি চিন্তা করবেন না।
শচীন নেমে গেল। হেমকান্ত গাড়ি ছুটিয়ে ফিরতে লাগলেন।
কিন্তু ফিরলেন না। নদীর ধারে গাড়ি দাড় করিয়ে নামলেন। গাড়োয়ানকে বললেন, গঙ্গা মাঝি ঘরে আছে কি না দেখ তো! থাকলে ডাক।
গঙ্গা মাঝি তলব পেয়ে ছুটে আসে।
কর্তা ডাকছেন?
নৌকোটা আছে?
আছে। যাবেন?
যাব। চল।
নিঃশব্দে হেমকান্ত নৌকোয় গিয়ে ওঠেন। মাঝারি নৌকো। গঙ্গা মাঝি বৈঠা ধরতেই হেমকান্ত হাত বাড়িয়ে বলেন, আমাকেও একটা দে।
দুই সবল হাতের বৈঠার তাড়নায় নৌকো কেওটখালির দিকে ছুটতে থাকে। রোদে ঝকঝক করছে নদী। চমৎকার শান্ত শ্রী ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
হেমকান্ত ডাকলেন, গঙ্গা।
আজ্ঞে, কর্তা।
কাল রাতে এই রাস্তা দিয়ে পুলিশ গেছে দেখেছিস?
আজ্ঞে হ্যাঁ, কর্তা।
কতজন?
মেলা পুলিশ।
গুলিগোলার শব্দ শুনেছিস?
আজ্ঞে না।
পুলিশ কেওটখালিতে কেন গেছে জানিস?
গঙ্গা মাথা নাড়ল, না কর্তা।
কৃষ্ণকে কাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না, জানিস?
গঙ্গা দুঃখিত মুখে বলে, সব ওই স্বদেশিদের কাজ! আমি তো সারা রাত ছোটকর্তাকে খুঁজতে নৌকো বেয়ে এখানে সেখানে গেছি।
সারা রাত! তবে তো তোর নৌকো বাইতে কষ্ট হচ্ছে এখন!
না কর্তা, কষ্ট কী? গতরের কাজে কষ্ট নাই।
অনেকক্ষণ নৌগে চলল। শহর শেষ হল। নির্জন নদীর ধার। নিরবচ্ছিন্ন গাছপালায় শ্যামলিমা।
এই কেওটখালি। ওই শ্মশান।–-গঙ্গা অস্ফুট স্বরে বলে।
দুইজনে নৌকো ভেড়ায়। পাড়ে কাদা, কাঁটাগাছ, আগাছার জঙ্গল। নিস্তব্ধতা।
গঙ্গা একটা খুঁটো পুঁতে নৌকো বাঁধে। হেমকান্ত নেমে চারদিকে চেয়ে দেখেন। একটু ইতস্তত করে খাড়াই বেয়ে উঠতে থাকেন ওপরে। গঙ্গা নৌকোর খোল থেকে একটা লম্বা লাঠি টেনে নিয়ে হেমকান্তর পিছু পিছু উঠতে থাকে।
শ্মশানের ঘাটে মস্ত বটগাছের তলায় দাঁড়িয়ে হেমকান্ত চারদিকে তাকিয়ে কিছু খোঁজেন। এসব দিকে তার বড় একটা আসা হয় না। সামনে একটা সুড়কির লাল রাস্তা। তার ওপাশে গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে কিছু টিনের চাল দেখা যাচ্ছে।
গঙ্গা নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে, এদিকটায় নয়।
তবে কোনদিকে?
আরও দক্ষিণে।
তুই জায়গাটা চিনিস?
চিনি। বীরুবাবুরা আমার নৌকোয় অনেকবার এসেছেন।
তা হলে তুই চিনিস। ওরা লোক কেমন?
ভদ্রলোক।
দলে কয়জন আছে?
বেশি না। দশ বারোজন হবে।
প্রতুল ওদের দলে আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। উনিই চিনিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে।
কৃষ্ণকে কি তুই এখানে এনেছিস কাল?
আজ্ঞে না। ছোটকর্তা আসতে চাইলেও আনতাম না।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়িয়ে বললেন, চল।
