আমি যাই, বাবা?
লজ্জা পেয়ো না, মা। বোসো। এমনি করে মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। মনু কোথায় বলতে পারো?
মন্দিরের দালানে বসে আছেন। হরিকাকাও আছেন। কেউ ঘুমোয়নি।
চেনাজানা সব বাড়িতে খোঁজ নেওয়া শেষ হয়েছে?
হয়েছে। দূরে যারা গেছে তারা সকলে এখনও ফেরেনি। এই অস্ত্রটা আপনি কাছে রেখেছেন কেন, বাবা?
কেন রেখেছি!–হেমকান্ত এটুকু বলে সামান্য ভাবলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, কেন যে রেখেছি তা জানি না। মনে হল একটা অস্ত্র কাছে রাখা ভাল। আজ সব উলটো-পালটা ঘটনা ঘটছে।
এতে কি গুলি ভরা আছে?
আছে। এক কাজ করো এটা ওই দেরাজে রেখে দাও। সাবধানে নাও, ট্রিগারটায় আঙুল দিয়ে।
বিশাখা উঠে রিভলভারটা দেরাজে রেখে আসে।
হেমকান্ত মেয়ের দিকে চেয়ে বলেন, তুমি এখন যাও, মা। ঘুমোতে না পারো অন্তত একটু বিশ্রাম নাও। আমি বরং শুয়ে শুয়ে একটু কৃষ্ণর কথা ভাবি।
বিশাখা হেমকান্তর গায়ে একটা ঢাকা দিল। তারপর নিঃশব্দে চলে গেল।
হেমকান্ত একা ঘরে জেগে থেকে কৃষ্ণর কথা ভাবতে লাগলেন। যত ভাবেন তত বুকটা আনন্দে বিষাদে উথাল-পাথাল করে আর চোখ বার বার ভরে যায় জলে।
চোখের ওপর দিয়ে একটি অন্তহীন রাত বড় মন্থর গতিতে কেটে গেল। হেমকান্ত ক্লান্তিতে চোখ বুজে শুয়ে থেকে বহুবার টের পেলেন তার বড় দুই ছেলে, মেয়ে এবং বউরা বার বার নিঃশব্দে ঘরে এসে তাকে দেখে গেল। বোধহয় ওদের আশঙ্কা হেমকান্ত শোকে না মরেটরে যান।
ভোরের সামান্য ফরসা ভাব দেখা দিতেই হেমকান্ত উঠে পড়লেন।
হরি!
একডাকে হরি এসে সামনে দাঁড়ায়, যে আজ্ঞে।
হরির গলার স্বরও ভারী। অর্থাৎ কৃষ্ণর জন্য সেও সম্ভবত কেঁদেছে। হেমকান্ত জিজ্ঞেস করলেন, পুলিশ কি এসেছে?
আজ্ঞে না।
আসার কথা ছিল, এল না কেন?
হরি চুপ করে থাকে।
হেমকান্ত ফের জিজ্ঞেস করলেন, কোনও খবর পাওয়া গেল ছেলেটার?
আজ্ঞে না। বলতে গিয়ে হরি সামান্য ফুঁপিয়ে ওঠে।
হেমকান্ত বিরক্ত হয়ে বলেন, কাঁদছিস কেন? তার তো এখনও কোনও খারাপ খবর আসেনি!
আজ্ঞে না।
তবে?
আপনার বড় কষ্ট হচ্ছে যে!
কষ্ট!–বলে হেমকান্ত খুব ফ্যাকাসে একটু হেসে বলেন, সারাটা জীবন পায়ের ওপর পা দিয়ে অন্যের খেটে-খাওয়া পয়সায় আরামে দিন কাটিয়েছি। এখন ভগবান একটু কষ্ট দেবেন না? ধর্ম বলে যদি কিছু থাকে তবে তার একটা বিচারও তো আছে।
হরি চুপ করে রইল।
হেমকান্ত প্রাতঃকৃত্য সারতে আজ বেশি সময় নিলেন না। তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে এসে বেরোনোর পোশাক পরতে পরতে হরিকে ডেকে বললেন, গাড়ি জুততে বল।
গাড়ি তৈরিই আছে।
আমি একটু থানায় যাচ্ছি। এদিকটা সব দেখেশুনে রাখিস।
আপনি চিন্তা করবেন না।
যদি এর মধ্যে সার্চ করতে চলে আসে তবে সব দেখাবি, যা দেখতে চায়। কিন্তু সব সময়ে সঙ্গে থাকিস।
আজ্ঞে।
হেমকান্ত সিঁড়ির মুখেই দাঁড় করানো ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বললেন, থানা। তাড়াতাড়ি চালা। গাড়ি ছুটল। সকালে ব্রহ্মপুত্রের ধার-ঘেঁষা রাস্তায় চলন্ত গাড়ি থেকে হেমকান্ত এই দুঃখের। মধ্যেও মুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রকৃতির রূপ দুটো ক্লান্ত, অনিদ্রাজনিত জ্বালাভরা চোখে দেখছিলেন আর স্নিগ্ধ হচ্ছিলেন। মানুষের কত বিপদ, কত উদ্বেগ, কত অশান্তি, কিন্তু প্রকৃতি কেমন শান্ত, নির্বিকার, বৈরাগী! ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যের মধ্যে এরকম প্রকৃতি বীক্ষণের বড় আবেগময় অভিজ্ঞতার কথা আছে। গাছপালা, নদী, আকাশ, পাহাড়, সমুদ্র, ফুল, পাতা, পাখি, প্রজাপতি, কীটপতঙ্গের যে জীবন সেই জীবনে এই দ্বন্দ্ব নেই, এই উদ্বেগ নেই।
থানার সামনে এত ভোরেও ভিড় দেখে ভারী অবাক হলেন হেমকান্ত। ভিড়ের জন্য তাঁর গাড়ি একটু দূরেই থামল।
গাড়োয়ান নেমে এসে বলল, কিছু একটা হয়েছে কর্তাবাবু।
কী হয়েছে খোঁজ নিয়ে আয়।
গাড়োয়ান গেল। হেমকান্ত দুরু দুরু বুক হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। কৃষ্ণর কোনও কিছু হয়নি তো! ভিড়টা তার জন্যই নয় তো! কৃষ্ণকান্ত পকেটে গুলিভরা রিভলভারটা নিয়ে এসেছেন। কেন তা তিনি বলতে পারবেন না। বুড়ো বয়সে ছেলের জন্য উদ্বেগে মনটা যেন কেমন হয়ে গেছে। নইলে যে জিনিসকে তিনি সর্বদা এড়িয়ে চলেছেন সেই আগ্নেয়াস্ত্র স্পর্শ করে ভরসা পাচ্ছেন কেন আজ? এক হাত বুকে চেপে রেখে অন্য হাত পকেটে ভরে তিনি রিভলভারটা ধরে রইলেন।
গাড়োয়ান খুব উত্তেজিতভাবে ছুটে এল।
কর্তা সর্বনাশ!
কী হয়েছে?
দারোগাবাবুকে গুলি করেছে আজ্ঞে।
হেমকান্ত দরজাটা খুলে নামলেন, বলিস কী?
আজ্ঞে। শচীনবাবুও আছেন ভিড়ের মধ্যে দেখলাম।
শচীন! ছুটে গিয়ে ডেকে আন তো?
গাড়োয়ান যায়। কয়েক মিনিট পরেই শচীন শশব্যস্তে এসে বলে, আপনি এসেছেন।
কী ব্যাপার বলো তো?
শচীন ইতস্তত করে বলে, সঠিক ঘটনা জানি না, আমি কাল রাত থেকেই থানায় বসে আছি। আপনাদের বাড়ি রেড হবে খবর পেয়েই চলে আসি। তারপর শুনলাম, কৃষ্ণ মিসিং। সেজন্য রামকান্ত রায়ের সঙ্গে কথা বলার দরকার ছিল।
তারপর কী হল?
উনি খুব ব্যস্ত ছিলেন। রাত বারোটা নাগাদ একজন ইনফর্মার এসে নাকি খবর দেয় যে, কেওটখালির দিকে স্বদেশিদের একটা ঘাঁটির সন্ধান পাওয়া গেছে। সেই শুনেই উনি ছোটখাটো ফোর্স নিয়ে রওনা হন। তারপর আর ফেরেননি। একটু আগে খবর এল শট ডেড।
ডেড? ঠিক জানো?
তা জানি না। তবে গুজব ছড়িয়ে গেছে। খুব স্ট্রং গুজব। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নিজে অ্যাকশনে নামছেন। প্রচুর ধরপাকড় হবে।
ডেডবডি এসেছে?
