হেমকান্ত বিগ্রহের দিকে নিবিষ্ট চোখে চেয়ে পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার এই বিগ্রহ কতটা জাগ্রত?
এরকম প্রশ্ন বড় একটা কেউ করে না। পুরোহিত শম্ভুচন্দ্র শর্মা একটু অবাক হয়ে বললেন, আজ্ঞে, মা বড় জাগ্রত।
কিছু কামনা করলে পাওয়া যায়?
মায়ের অদেয় কিছু নেই।
আমার বিশ্বাস-টিশ্বাস কিছু নেই কিন্তু। নাস্তিকও বলতে পারেন। তবু আজ আমার বড় বিপদ। চাইলে পাব?
ভক্তি করে একটু চেয়ে দেখুন না, চৌধুরীমশাই।
চাইব? বলছেন!
পুরোহিত একটু হাসলেন।
হেমকান্তকে চেষ্টা করতে হল না। আপনা থেকেই বুকটা থরথর করে কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চোখ বুজতেই চোখের কোল ভরে গেল জলে। মনটা দীন হয়ে গেল, মাথা নুয়ে এল আবেগে। নিজেকে মনে হল, কত তুচ্ছ, কত নশ্বর, কী অসহায়।
একেই কি ভক্তি বলে? কে জানে! তবে দীন নম্র হৃদয়ে ভিখিরির মতো নিজের প্রিয় পুত্রের মঙ্গল প্রার্থনা করলেন তিনি। অস্ফুট স্বরে ডাকলেন, মা, মাগো!
পকেট থেকে কয়েকটা কাঁচা টাকা বের করে পুরোহিতকে দিয়ে হেমকান্ত বললেন, প্রণামী।
একটা মানসিক করে যান, চৌধুরীমশাই।
মানসিক!–বলে হেমকান্ত ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা, করা যাবে। আজ থাক। প্রথম দিনেই এতটা সইবে না।
পুরোহিত মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক আছে।
হেমকান্ত গাড়িতে এসে উঠলেন। কোঁচা দিয়ে চোখের কোল ভাল করে মুছে নিয়ে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে বসে রইলেন।
বাড়িতে এসে শুনলেন, এখনও কোনও খবর নেই। হেমকান্ত রাত্রে আর জলগ্রহণ করলেন না। বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে রইলেন। রিভলভারটা বালিশের পাশে রাখলেন। জানেন এটা কোনও কাজে লাগবে না।
বাড়িতে বাচ্চারা ছাড়া কেউই শুতে গেল না। কনক আর জীমূত বার বার বেরিয়ে গিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আনছিল। অর্থাৎ খবর নেই। মেয়েরা হেমকান্তর পাশের ঘরে বসে নিচু স্বরে কথাবার্তা বলছিল।
সময় কত দীর্ঘ ও মন্থরগামী! হেমকান্ত অনুভব করছিলেন। রাত যেন কাটতেই চায় না। ছেলেটা কোথায় গেল? কেন গেল? একবারও বলে গেল না কেন?
এমনও হতে পারে, স্বদেশিরা হেমকান্তর ওপর আক্রোশবশত কৃষ্ণকান্তকে মেরে ফেলেছে। এমনও হতে পারে, কৃষ্ণকে ধরে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। খুব সম্ভব ছেলেটা বিপদের মধ্যে আছে। কীরকম বিপদ, কতটা সাংঘাতিক বিপদ তা হেমকান্ত কিছুতেই আন্দাজ করতে পারছেন না। বার-বাড়িতে এক দুই করে কর্মচারী এবং প্রজারা জড়ো হয়েছে, টের পাচ্ছেন হেমকান্ত। অনেক লোকের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে।
হেমকান্ত উঠে জানালায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
হরি!
হরি জেগে ছিল। হেমকান্তর ডাক শুনে দৌড়ে এল, আজ্ঞে।
ওরা কোনও খবর এনেছে?
না। খবর কিছু পাওয়া যায়নি।
পুলিশ বাড়ি সার্চ করবে বলে কথা ছিল। তাদের খবর কী?
এখনও পুলিশ আসেনি।
আসবে। শেষ রাত্রে। তৈরি থাকিস।
তৈরি আছি। তবে–
তবে কী?
আপনার বিছানার ওটা কি সরিয়ে নেব?
না। রিভলভার আমার কাছেই থাকবে।
যে আজ্ঞে।
হেমকান্ত দুর্বল বোধ করছিলেন। একটু তেষ্টা পাচ্ছে কিন্তু কেন যেন জলের গেলাস ঠোঁটে ছোঁয়াতেও প্রবৃত্তি হল না। তেষ্টা নিয়েই হেমকান্ত শুনে. পড়লেন। চোখ বুজতেই কৃষ্ণর নরুণকাটা মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে ভেসে উঠল সামনে। হেমকান্ত আত্মবিস্মৃতির মতো দুখানা হাত সামনের দিকে প্রসারিত করে দিয়ে বললেন, এসো কৃষ্ণ, কোলে এসো।
মিহি স্বরে কে যেন ডাকল, বাবা!
কে?–বলে একটু চমকে চাইলেন হেমকান্ত।
বিশাখা মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, কাকে ডাকছিলেন? কৃষ্ণকে?
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। লজ্জাও পেলেন। স্তিমিত গলায় বললেন, তার কি কোনও খবর এল?
না, তবে চিন্তার কিছু নেই।
তার মানে? সারা সন্ধে রাত অবধি ছেলেটার খবর নেই, চিন্তা হবে না? বলো কী?
বিশাখা শিয়রে বসল। হেমকান্তর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদু স্বরে বলল, কৃষ্ণ ধারেকাছেই কোথাও আছে। আমার মনে হয় পুলিশ বাড়ি সার্চ করবে বলে ভয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে।
বিশাখা খুব কেঁদেছে নিশ্চয়ই। তার গলার স্বর ভারী। শ্বাসে এখনও কম্পন। হেমকান্ত বললেন, সে তত ভীরু ছেলে নয়। যাওয়ার সময় তোমাকে কিছু বলেনি তো!
আমাকে!–বিশাখা মাথা নেড়ে বলল, তেমন কিছু বলেনি। বিকেলবেলায় একবার ওপরে এসেছিল। লালটুকে একটু আদর করল। তারপর চলে গেল।
লালটু!
মেজদার ছেলে।
বুঝেছি। কিছু বলেনি তা হলে?
না। আমার ধারণা চেনাজানা কারও বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে আছে।
থাকলে ভাল। কিন্তু ভয়টা আমার যাচ্ছে না।
মশারিটা টাঙিয়ে দিই, একটু ঘুমোন।
না। মশারি টাঙালে দমবন্ধ লাগবে আজ। তোমরা বরং গিয়ে ঘুমোও।
আমাদের কাবও আজ ঘুম হবে না, বাবা।
আমারও হওয়ার কথা নয়। কটা বাজল?
রাত তিনটে।
ওঃ। তা হলে তো ভোর হয়েই এল। বাইরে ওরা এখনও আছে?
আছে। বারবাড়িতে সবাই বসে আছে।
ওদের কিছু খাওয়াও তো হয়নি!
হয়েছে। চিঁড়ে গুড় কলা দেওয়া হয়েছে সবাইকে।
শচীন সব খবর জানে?
বিশাখা হঠাৎ কথা বলতে পারল না। লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলল। হেমকান্ত প্রথমটায় মেয়ের এই প্রতিক্রিয়ার কারণটা বুঝলেন না। পরে বুঝলেন। বললেন, বড় যোগ্য ছেলে। বিপদে নির্ভর করা যায়। সে কি খবরটা পেয়েছে জানো?
পেয়েছেন।–খুব কুণ্ঠার সঙ্গে বলে বিশাখা, থানায় গিয়ে বসে আছেন।
হেমকান্ত মেয়ের ব্রীড়াবনত মুখের দিকে চেয়ে ক্ষণেকের জন্য একটা সুখের অনুভূতি বোধ করলেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে। এ বাড়িতে আসতে সে বোধহয় এখন লজ্জা বোধ করছে। বিবেচক ছেলে। আমি জানি কৃষ্ণর জন্য তার উদ্বেগ কম নয়।
