তবু একটু দেখিয়ে দে।
ধ্রুব রাগল না, শুধু একটু হেসে মাথা নেড়ে বলল, না রে। তা হয় না। ওকে আলাদা করে চেনার আর দরকার নেই।
তুই কি ওর প্রতি একটু সফট, ধ্রুব?
ধ্রুব আবার হাসে, না। আমার ভিতরে সফটনেস বলে কিছু নেই।
জানি। ধারাও সেই কথা বলে।
ধ্রুব চুপ করে থাকে।
সামনে বিস্তৃত লন। দুপুরের ফলাও বোদে চারদিকে প্রকৃতির যেন এক উৎসব চলছে। লন-এ তিনটে মেয়েকে নাচাচ্ছে মাতাল ও উদ্দণ্ড পুরুষেরা। একটা আদিম দৃশ্য।
তিনজনের মধ্যে কে, তা অনেকক্ষণ চেয়েও বুঝতে পারল না প্রশান্ত। দুঃখিতভাবে সে বোতলের মুখ নিজের মুখে তুলে নিল।
ধ্রুব!
বল।
তুই আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিস।
কোথায়? এই তো তোদের সঙ্গে জুটে চলে এসেছি।
এসেছিস! সত্যি এসেছিস!
তার মানে?
সেই যে রবিঠাকুরের গানে আছে, তব মুখপানে চাহি এসেছ কি আসো নাই বুঝিব কেমনে?
ফিলজফি হচ্ছে?
পাগল! মাতালের পেটে কি ফিলজফি সয় রে! লাইনটা মনে পড়ে গেল তাই বললাম। কিন্তু আমার সত্যি মনে হচ্ছে তোর খোলটা পড়ে আছে এখানে। তুই নেই।
আমি সেই অর্থে কোথাও নেই রে প্রশান্ত।
উলটে ফিলজফি ঝাড়ছিস গুরু?
না। আমি বাস্তবিক কেমন যেন একটা নেই-নেই ভাবের মধ্যে আছি।
আর-একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রশান্ত বলে, আমারও সেই ভয় হচ্ছিল রে। কেবলই মনে হচ্ছে, ধ্রুবটা কি বাঁচবে?
প্রশান্ত ফের বোতল মুখে তোলে এবং ঝুম হয়ে বসে থাকে।
এরা কে কখন খাবে তার কোনও ঠিক নেই। লরি কখন ফিরবে তারও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ধ্রুবর আর ভাল লাগছিল না।
নিঃশব্দে উঠল ধ্রুব এবং পায়ে পায়ে লন-এর উলটোদিক দিয়ে ঘুরে বাড়ির পিছনের উঠোনটায় এসে দাঁড়াল। দুটো কয়লার উনুনে দুজন ঠাকুর প্রবল বেগে রান্না করছে।
ধ্রুবকে দেখে একজন গামছায় হাত মুছে বিগলিত মুখে এগিয়ে এসে বলে, কিছু দিই স্যার? মাংস, মাছভাঁজা, চপ?
ধ্রুব একটু ইতস্তত করে। তার খিদে পেয়েছে।
লোকটা কোথা থেকে একটা কাঠের চেয়ার টেনে এনে ঝেড়েঝুড়ে বসতে দেয় তাকে। ভাড়ে মাংস, শালপাতায় চপ আর মাছভাঁজা নিয়ে এসে দেয়। বলে, পোলাও হয়ে এল, স্যার। একটু চেখে দেখবেন।
ধ্রুব একটা চপ খেয়েই উঠে পড়ে। তার ভাল লাগে না। পেটের মধ্যে একটা অস্বস্তি হচ্ছে। প্রবল একটা আলোড়ন।
খেলেন না, স্যার?
না।
টেস্ট ভাল হয়নি, স্যার?
খুব ভাল হয়েছে। কিন্তু আমার শরীরটা আজ ভাল নয়।
ধ্রুব উঠে উঠোনটা থেকে বেরিয়ে পিছন দিকে খানিকটা এগোয়। এদিকটা পতিত জমির মতো পড়ে আছে। আগাছায় ভরা। একটা মজা পুকুর। ধ্রুব খানিকদূর এগিয়ে দাঁড়ায়। একটা বড় গাছকে কেঁপে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে একটা প্রবল লতা।
জায়গাটা খুব নির্জন। ধ্রুব ঘাসের ওপর আস্তে আস্তে বসল। তারপব শুয়ে পড়ল। পেটে গোঁতলানোর ভাবটা প্রবল হচ্ছে। বমি আসছে। সম্ভবত গ্যাস হয়েছে।
শুয়েই ধ্রুব বুঝতে পারল, একটা ভুল করেছে সে। শোওয়া উচিত হয়নি। শরীর জুড়ে একটা ঝিমঝিমুনি উঠেছে তার। চোখে কেমন ধাঁধা লাগছে। মাথাটা চক্কর দিচ্ছে। হাতখানেক উঁচু ঘাস ও আগাছার মধ্যে ড়ুবে তার মনে হল, এখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকলে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না।
দুশ্চিন্তাটা বেশিক্ষণ রইল না ধ্রুবর। আস্তে আস্তে চোখ বুজল। আঠার মতো লেগে গেল দুচোখের পাতা।
কতক্ষণ শুয়ে ছিল তা বোঝা মুশকিল। কিন্তু চোখ চেয়ে সে যাকে দেখতে পেল তাকেই দেখবে বলে একটা ক্ষীণ আশা ছিল তার।
কী হয়েছে তোমার বলো তো! শুয়ে আছ কেন এখানে?
তুই যা, নোটন।
কালো শাড়ি পরা সুন্দর মেয়েটা ফ্যাল ফ্যাল করে খানিকক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে থেকে থেকে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, কতক্ষণ ধরে তোমাকে খুঁজছি। ভেবেছিলাম পালিয়ে গেছ। রান্নার ঠাকুর বলল, এদিকে আসতে দেখেছে তোমাকে। ছুটে এসেছি। আর তুমি তাড়িয়ে দিচ্ছ?
তোকে তাড়াব না তো কাকে তাড়াব?
আমার সব দোষ, না?
তবে কার দোষ?
নোটন চোখের জলে মুখ ভাসিয়ে বলে, ঠিক আছে, আমার দোষ। কিন্তু তোমার কী হয়েছে ধ্রুবদা?
কিছু হয়নি।
রাগ করছ কেন? একটা থাপ্পড় মারো বরং।
আমার কী হয়েছে জেনে কী করবি? এত দরদ কবে থেকে হল?
দরদ বরাবরই ছিল। তুমি বুঝবে না।
না, আমি বুঝব কেন? বুঝবি তুই। কবে থেকে শুরু করেছিস এসব?
বেশিদিন নয়। আমার দাদাকে জ্যাঠামশাই তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তা জানো?
তাড়িয়ে দিয়ে থাকলে এমনি দেয়নি।
আমি কি বলেছি এমনি? দাদারই দোষ ছিল। কিন্তু সেই থেকে দাদা নিরুদ্দেশ।
তোরা বাবার কাছে গেলি না কেন?
গেলে যদি জ্যাঠামশাই রাগ করে! যা রাগ!
ধ্রুব চুপ করে নোটনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
০৮৫. ফেরার পথে ঘোড়ার গাড়ি
ফেরার পথে ঘোড়ার গাড়ি যথাসাধ্য দ্রুত বেগেই চলছিল, তবু হেমকান্তর মনে হচ্ছিল, গাড়ি যথেষ্ট দ্রুত চলছে না। বড় ধীর, বড় শ্লথ। দুবার বে-খেয়ালে তিনি হক মারলেন, জোরে! জোরে!
গাড়োয়ান সপাসপ চাবুকের শব্দ করল। এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় গাড়িটা বিপজ্জনকভাবে নাচতে থাকে।
কালীবাড়ির সামনে গাড়ি দাড় করালেন হেমকান্ত। তার ঈশ্বরবিশ্বাস খুব জোরদাব নয়, কালীবাড়িতে তিনি আসেনও না। আজ উদভ্রান্তের মতো নেমে দ্রুত পায়ে গিয়ে ঢুকলেন মন্দিরের চাতালে।
বেশ রাত হয়েছে, আরতি শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। মন্দিরের দরজা বন্ধ করার তোড়জোড় হচ্ছে। হেমকান্তকে দেখে পুরোহিত শশব্যস্ত এগিয়ে এলেন।
আজ্ঞে, আপনি! আসুন আসুন।
হেমকান্ত স্থির দৃষ্টিতে বিগ্রহের দিকে চেয়ে ছিলেন। মন্দিরের বড় বাতি নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু প্রদীপ জ্বলছে। সেই স্তিমিত আলোয় কালীর মুখ ভাল দেখা যাচ্ছে না।
