সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মেয়েটা ধ্রুবর কাছে একটু থামল। কী একটু বলো। ধ্রুব শালা তাকালও না, শুধু হাত নেড়ে খুব অবহেলার সঙ্গে কী একটা জবাব দিল। মুখ চুন হয়ে গেল মেয়েটার।
তবে পুষিয়ে গেল। তিনপাত্তির আড্ডা থেকে একটা হাল্লা উঠল জোর, এসে গেছে! এসে গেছে! কমলি এসে গেছে!
দুদ্দাড় উঠে ছুটে গেল কয়েকজন। একটা টেপরেকর্ডার চালু হল। ঝিনচাক হিন্দি গান ঝলসাতে লাগল বাতাসে।
পর পর আরও দুটো মেয়ে ফিল্ডে নামছে। একজনের কমলা, অন্যজনের সবুজ শাড়ি। এ দুটিও দারুণ। আবার একটা হাল্লাচিল্লা উঠল।
এরকমই হওয়ার কথা। এরকম হওয়াই নিয়ম।
প্রশান্ত একটা মাছের কাঁটা দুটো মোটা আঙুল দিয়ে কষের দাঁতের ফাঁক থেকে টেনে বের করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে ফের আপনমনে বলল, শালা সতী!
তিনজন মেয়েছেলেকে কত আর ভাগাভাগি করা যায়? এক-একজনকে নিয়ে তিন-চারজন করে হামলে পড়ল। তিনপাত্তির আড্ডায় টিমটিম করছে মাত্র জনা চারেক। আর সব নাচানাচির জন্য তৈরি হয়েছে।
প্রশান্ত চোখ বুজে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর বোতল হাতে নিয়ে উঠল। শালাকে একটু নাড়া দেওয়া দরকার।
ধ্রুব! আই বে ধ্রুব!
ধ্রুব প্রথমটায় সাড়া দিল না।
আই রে শালা ধ্রুব! শুনছিস?
ধ্রুব চোখ ফেরাল।
কী ভাবছিস বসে বসে গাড়লের মতো?
কিছু ভাবছি না।
পিকনিক ভাল লাগছে না?
লাগছে। লাগবে না কেন?
ফুর্তি করতে এসেছিস তা অমন শোকাঁপা মুখ করে বসে আছিস কেন?
ওসব আমার ভাল লাগছে না আজ।
মাল টানছিস না?
না। পেটে ব্যথা হয়।
মাছভাজা খাবি?
ইচ্ছে করছে না।
প্রশান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধ্রুবর পাশে বসে বলে, তুই কি সুইসাইড করবি, ধ্রুব?
ধ্রুব অবাক হয়ে বলল, সুইসাইড! কেন? সুইসাইডের কী হল?
আমার ছোট ভাই তোর মতো বয়সে সুইসাইড করেছিল। বেশিদিনের কথা নয়। মরার আগে তাকে ঠিক এরকম দেখতাম।
এরকম মানে?
ঠিক তোর মতো। কোনও কিছুতে গা নেই, কথা বললে উলটো-পালটা জবাব দেয়, সব সময়ে অন্যমনস্ক, উদাস-উদাস ভাব। তারপর একদিন মাঝরাতে গোঙানি শুনে তার দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গেল ব্লেড দিয়ে শিরা কেটে পড়ে আছে। রক্তের সমুদ্র একেবারে।
বোকারা সুইসাইড করে।
তুই কি খুব চালাক?
ধ্রুব হেসে ফেলে। বলে, হঠাৎ আমাকে দেখে কেন যে সুইসাইডের কথা তোর মনে হল! পাগল আছিস মাইরি।
প্রশান্ত একটা চাপা হুংকার দিয়ে বলে, পাগল আছি তো আছি, তোর বাপের কী? এখন সত্যি করে বল তো তোর হয়েছেটা কী?
কিছু হয়নি। তুই আজকাল বড্ড আমার পিছনে লেগেছিস।
লাগাচ্ছিস বলে লাগছি।
কেন? একজন মানুষের কি একটু একা বসে থাকতে ইচ্ছে হয় না?
হবে না কেন? আমিও তো এতক্ষণ একা বসে ছিলাম। বসে বসে চুক চুক করে মাল খাচ্ছিলাম, মাছভাঁজা খাচ্ছিলাম। তুই কিছু করছিস না। শুধু বসে হাঁ করে চেয়ে আছিস। কেন?
তোকে নিয়ে আর পারি না, প্রশান্ত।
শুধু তাই নয়। তিনটে ডবকা মেয়েছেলে গা ঘেঁষে বসা, তবু একটু ছোঁক ছোঁক করলি না, একবার ভাল করে চেয়ে দেখলি না। মেয়েমানুষের এই অপমান কি ধর্মে সইবে রে!
ধ্রুব খুব হাসল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, এই মেয়েগুলো বড্ড সাব-স্টান্ডার্ড।
তা হোক না। সাব-স্ট্যান্ডার্ড ছাড়া ভাড়া খাটবে কেন? তোর এত শুচিবায়ু কবে থেকে হল বল তো?
হবে কেন? বরাবরই ছিল। কোনওদিন আমাকে দেখেছিস মেয়েছেলের পিছনে ঘেঁকছোঁক করে বেড়াচ্ছি?
দেখিনি, কিন্তু দেখতে চাই। তুই নরম্যাল নোস কেন?
আমার তো মনে হয় বিশজন লোকের পক্ষে তিনজন ভাড়াটে মেয়েমানুষের পিছনে লাগাই অ্যাবনরম্যাল এবং ইনহিউম্যান।
প্রশান্ত রাগের চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে হঠাৎ ঠান্ডা মেরে গেল। তারপর বলল, তুই কি নারীদরদি নাকি রে?
কী জানি কী। তবে ওই তিনজনের মধ্যে একজনকে আমি চিনি।
চিনিস? কী সুত্রে চিনিস?
সে তোকে বলা যাবে না। কিন্তু মেয়েটা এ দলে থাকায় আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু কিছু করারও নেই।
তোর রিলেটিভ হয়?
ওরকমই।
কোন মেয়েটা?
তা তোর জেনে কাজ নেই।
প্রশান্ত আবার বড় বড় চোখ করে ধ্রুবর দিকে চেয়ে থেকে বলে, তুই তো রাজার ছেলে। রাজার বংশের মেয়ে কখনও হাফ-গেরস্ত হয়? তুই গুল ঝাড়ছিস।
বংশের মেয়ে কে বলল?
এই যে বললি রিলেটিভ।
না। তবে রিলেটিভের মতোই।
সত্যি বলছিস?
সত্যি। মিথ্যে বলব কেন?
মেয়েটা তোকে চিনতে পেরেছে?
পেরেছে। খুব অস্বস্তি বোধ করছে।
একটু দেখিয়ে দে ধ্রুব মেয়েটাকে।
কেন? কী করবি?
কলকাতার গাড়িতে তুলে দিয়ে আসব।
সাধে কি আর পাগল বলে তোকে?
এতে পাগলামির কী আছে?
মেয়েটাকে পাঠিয়ে দিলে তোরা ওকে পুরো টাকা দিবি?
দেব।
তাতেও লাভ নেই। এটাই ওর ব্যাবসা। এরকম ওকে করতেই হবে। খামোক একটা সিন তৈরি করে লাভ কী?
ওই মেয়েটার জন্যই কি এমন খাট্টা মুখ করে বসে আছিস?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, না। আমি ব্যাপারটা স্পাের্টিংলি নিয়েছি। আমার কোনও সংস্কার নেই, দেহের শুচিতা আমি মানি না। তবে মেয়েরা যখন শরীরটাকে ভাড়া খাটায় তখন খারাপ লাগে। আমি সহ্য করতে পারি না।
প্রশান্ত আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোর জন্য দুশ্চিন্তায় আমার নেশা ছুটে যাচ্ছে রে ধ্রুব।
কেন? দুশ্চিন্তার কী?
তুই কি শেষে সামাজিক জ্যাঠামশাই হয়ে দাঁড়াবি?
ধ্রুব হাসল না। চুপ করে রইল।
প্রশান্ত তার আর-একটু কাছ ঘেঁষে বসে নরম গলায় বলল, কোন মেয়েটা তা বলবি না?
বলে লাভ কী?
একটু দেখি।
দেখে কী হবে? বাকি দুজনের সঙ্গে ওর তফাত নেই। একই রকম।
