গাড়ি একটা ঘিঞ্জি পাড়ায় ঢোকে। তারপর এসে দাঁড়ায় একটা টিনের বাড়ির সামনে। হতদরিদ্র চেহারার বাড়ি।
গাড়োয়ানের পাশ থেকে নেমে হরি ভিতরে গিয়ে এক বুড়ো ভদ্রলোককে ডেকে আনে। প্রতুলের বাবা। শশব্যন্তে এসে ভদ্রলোক হাতজোড় করে দাঁড়ান, আজ্ঞে আপনি!
প্রতুল কোথায়?
প্রতুল! সে তো মাসেকের ওপর বাড়ি নেই। পুলিশ এসে রোজ খোঁজ করে যাচ্ছে।
হেমকান্তর শ্বাস হঠাৎ বন্ধ হয়ে আসতে থাকে।
০৮৪. প্রশান্ত ধ্রুবকে লক্ষ করছিল
প্রশান্ত ধ্রুবকে লক্ষ করছিল। খুব নিবিষ্ট চোখে এবং অখণ্ড মনোেযাগে! এতকাল করেনি। দরকারও হয়নি। আর পাঁচজন মোদো মাতাল ইয়ারবাজের মতোই একজন ছিল ধ্রুব। তফাত শুধু, ও মিনিস্টারের ছেলে। এখন আর ধ্রুবর বাবা মিনিস্টার নয় বটে, কিন্তু কিছু কমও যায় না।
সে যাই হোক, ধ্রুবকে মিনিস্টারের ছেলে বলে কোনওদিন খাতির দেখায়নি প্রশান্ত। ধ্রুবর বন্ধুরা সবাই জানে বাপের সঙ্গে ধ্রুবর বনিবনা নেই। তবু ধ্রুবকে সবাই খাতির করে। কিছু তো বলা যায় না, শত হোক মিনিস্টারের ছেলে তো৷ উপকার না করুক ফাঁসিয়ে দিতে পারে। সকলেই জানে ধ্রুবর পিছনে সর্বদা ছায়ার মতো গার্ড থাকে। পুলিশের লোক অবধি নজর রাখে। কাজেই ধ্রুবকে খাতির না করে উপায় নেই। কিন্তু প্রশান্ত কোনওকালে ধ্রুবকে তার বাপের ছেলে হিসেবে দেখেনি। আলাদা বা বিশিষ্ট কেউ বলেও মনে করেনি। কিন্তু আজকাল একটু কেমন যেন লাগছে ওকে।
মল্লিকপুরের এই বাগানবাড়িখানা শীতের দুপুরে রমরম করছে। বিস্তর পাখি ডাকছে গাছে গাছে। মাংসের গন্ধে মাত হয়ে আছে বাতাস। গাছতলায় শতরঞ্জি পেতে জনা দশেক ইয়ারদোস্ত তিনপাত্তি খেলছে, পাশে বোতল, গেলাস, গরম মাছভাঁজা আর ফুলুরি। জনা চারেক এমনি-এমনি গাজাচ্ছে বসে বসে। তাদের মধ্যে দুটো গেঁজেল আছে। দুই গেঁজেল গাঁজাভরা সিগারেট অন্যদের গছিয়ে দলে টানার চেষ্টা করছে। যেমনটা হয় আর কী। দু-জিন বেরিয়েছে ইদিক-সিদিক একটু ঘুরে আসতে।
লরি ভর্তি এই যারা এসেছে, অর্থাৎ তারা যে খুব সুবিধের লোক নয় তা প্রশান্ত-র চেয়ে ভাল আর কে জানে? এদের মধ্যে তাসের আড্ডায় কলকাতার এক সেরা খুনে এবং পয়লা নম্বরের গুন্ডা আছে। আছে অন্তত তিনজন স্মাগলার, মেজো বা সেজো গুন্ডা, মাতাল, মেয়েমানুষের কারবারি। এরা সব প্রশান্ত-র বন্ধু। ধ্রুবরও। কিন্তু ধ্রুব আজ মিশ খাচ্ছে না।
প্রশান্ত একটা বোতল নিয়ে নিরিবিলি দেখে একটা পেয়ারা গাছের ছায়ায় এসে বসেছে। তিনপাত্তির উত্তেজনা তার আজকাল সহ্য হয় না। হার্ট খারাপ। গাজাতেও তার ভাল লাগে না। খামোকা মুখের ফেকো তোলা, কাউকেই তো নতুন কিছু বলার নেই, কারও কাছ থেকেই নতুন করে কিছু শোনারও নেই। প্রশান্ত তাই গাছতলায় বসে আছে। কিন্তু শুধু শুধু বসে নেই। সে ধ্রুবকে দেখছে। ঠিক তার মতোই ধ্রুবও একটু আলগা হয়ে বসে আছে সিঁড়িতে। পিছনের সিঁড়িতে কনুই রেখে, সামনে দুপা ছড়িয়ে। তার পাশে যে ছোকরাটা বসে আছে সে জ্যোতিষী! নাম পানু। তারাপীঠে যাতায়াত আছে। এক সময়ে হাওড়ার দানুবাবুর সাকরেদ ছিল। সিনেমা করতে গিয়েছিল একসময়ে। যাত্রার দল খুলেছিল। সব ছেড়েছুড়ে এখন হোলটাইম জ্যোতিষী। এ দলে সবাই যে সকলের বন্ধু তা নয়। কেউ হয়তো তার বাইরের বন্ধুকে ধরে এনেছে। অচেনা, আধচেনা বেশ কয়েকজন আছে। পানু এই আধচেনাদের দলে।
পানু এতক্ষণ ধ্রুবর হাত দেখছিল। কী ফোরকাস্ট করল কে জানে! প্রশান্ত দেখল, একটু বাদে। ধ্রুব ভারী বিরক্ত হয়ে হাতটা টেনে নিল। তারপর উদাস হয়ে বসে আছে ওই। পানু হাতের গেলাসে চুমুক মারতে মারতে ধূর্ত চোখে চারদিক নজর করছে। ধ্রুবর হাতে গেলাস নেই, চোখের দৃষ্টি বহু দুরে।
প্রশান্ত বিড়বিড় করে বলল, মরবে শালা, এবার মরবে। মরার আগে মুরগিদের যেমন ঝিমুনি রোগ ধরে এই শালাকেও তেমনি ধরেছে।
তিনটে মেয়েছেলে এসেছে দলের সঙ্গে। তিনজনই ভাড়াটে। হাফ-গেরস্ত। বয়স কুড়ি-বাইশের মধ্যে। খুব ছলবলে, খুব স্মার্ট। কেউ দেখলে বুঝবে না যে হাফ-গেরস্ত। মনে হবে বালিগঞ্জের বড়লোক বাড়ির মেয়ে। সারাদিন সঙ্গ দেবে, ঢলাঢলি করবে, একটু-আধটু ছোঁয়াছুঁয়ি চলতে পারে, তবে তার বেশি কিছু নয়। সতী টাইপের আর কী।
সেই মেয়ে তিনজন এখনও ফিল্ডে নামেনি। সাজগোজ করছে। তারা ফিল্ডে নামলে হুল্লোড়বাজি লেগে যাবে। মেয়েমানুষ যেখানে নামে সেখানকারই হিউম্যান প্যাটার্ন পালটে যায়। কিন্তু প্রশান্ত জানে ওই তিনটি ফুটফুটে মেয়ে ধ্রুবকে একটুও টলাতে পারবে না। লরিতে ধ্রুব ওই তিনটি মেয়ের সঙ্গে ড্রাইভারের কেবিনে বসেছিল। প্রশান্ত পিছনের ফুটোটা দিয়ে কয়েকবার উঁকি মেরে দেখেছে, ধ্রুব মুখ খাট্টা করে বসা, মেয়ে তিনজন সিটিয়ে বসে ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
প্রশান্ত উঠে গিয়ে শালপাতায় গোটাকয় মাছভাঁজা নিয়ে এল রান্নার জায়গা থেকে। আবার পেয়ারা গাছের তলায় বসে ধ্রুবর দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল, ইমপোটেন্ট শালা। ব্রহ্মচারী হয়েছে ব্যাটা। মরবি, মরবি। এই বলে রাখছি এসব ভাল লক্ষণ নয়।
একটা মেয়ে ফিন্ডে নামছে খোপা বাঁধতে বাঁধতে। কালো শাড়ি, কালো ব্লাউজ, ম্যাচিং টিপ। দারুণ দেখাচ্ছে। প্রশান্ত হাঁ হয়ে দেখল। লরিতে আসতে ঘাম-টাম হয়েছিল, হাওয়ায় চুল হয়েছিল বেতোছ। এখন সব সেরেসুরে নতুন মেকআপ নিয়ে আসায় খোলটাই পালটে গেছে একেবারে। ছিপছিপে শরীরটা দেখলে বোঝা যায়, এরা বেশ তৈরি করে নিজেদের।
