হরি জন্মাবধি এই বাড়িতে আছে। অসম্ভব বিশ্বাসী। গলা কেটে ফেললেও কেউ তার মুখ থেকে কথা বের করতে পারে না। কম কথার মানুষ, বুদ্ধিমান এবং সজাগ লোক। মাথা চুলকে একটু বিনয়ের ভাব দেখিয়ে বলে, বাইরে থেকে তেমন কাউকে যাতায়াত করতে দেখি না। তবে…
তবে কী?
প্রতুল দাদাবাবু কৃষ্ণদাদাকে পড়িয়ে চলে যাওয়ার সময় ওঁর সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করতেন।
প্রতুল! ছেলেটা তো এমনিতে নিরীহ। স্বদেশি করে নাকি?
হরি ফের মাথা চুলকে বলে, সে কী করে বলব? তবে কৃষ্ণদাদাকে একটু-আধটু স্বদেশি শেখাত।
হেমকান্ত বাড়ির খোঁজখবর বড় একটা রাখেন না। প্রতুলকে দেখেননি বহুদিন। তাই জিজ্ঞেস করলেন, কৃষ্ণকে কি এখনও ও পড়ায়?
না। দাদাবাবু আজকাল নিজেই পড়ে।
প্রতুল আসে মাঝে মাঝে?
মাঝে মাঝে আসতে দেখি। তবে চুপি চুপি। আঁধার হলে।
কী করে বেড়ায় একটু খোঁজ নে তো?
হরি মাথা চুলকে বলে, খোঁজ পুলিসেও নিচ্ছে। ধরতে পারছে না।
হেমকান্ত বিমূঢ়ের মতো চেয়ে থেকে বলেন, তুই তো অনেক খবর জানিস দেখছি। বলিস না কেন আমাকে?
বলার কী! শরীর তো এমনিতেই খারাপ। এসব শুনে আরও বিগড়োবেন।
প্রতুল তা হলে ফেরার?
মনে তো হয়।
রিভলবারটা কবে কৃষ্ণ নিয়ে গেছে জানিস?
কবে বলতে পারব না। তবে নিয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে।
তুই জানতে পেরেছিলি?
একদিন ঘটা সাফ করতে গিয়ে তোশকের তলায় দেখতে পাই।
তখনও আমাকে বলিসনি?
ও অস্ত্রটার গুলি বাড়িতে নেই। শুধু ওটা দিয়ে আর কী হবে?
গুলি তো কিনতে পাওয়া যায়।
হরি মাথা চুলকে বলে, আমি কথাটা মনুদিদিকে বলে দিয়েছিলাম। মনুদিদি গিয়ে সরিয়ে আনে।
খুব বুদ্ধিমান। বলে হেমকান্ত গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন জানালার বাইরের অন্ধকারে। তারপর বলেন, ওরা এল কি না দেখ। কৃষ্ণর জন্য চিন্তা হচ্ছে।
এই যে যাই।
বলে হরি বেরিয়ে গেল।
হেমকান্ত তোশকের তলা থেকে সচ্চিদানন্দকে লেখা চিঠিখানা বের করলেন। ভারী লজ্জা করছিল চিঠিখানার দিকে চেয়ে। শাস্ত্রে তাই বলে শতং বদ মা লিখ। লেখা জিনিস দলিলের মতো। শত গুজবেও যা করতে পারে না, এক টুকরো চিরকুট তা অনায়াসে করতে পারে। হেমকান্তর। একটা ডায়েরিও আছে। এক কিশোরীকে নিয়ে নানা প্রণয়োপাখ্যান। এগুলো কি পুড়িয়ে ফেলা উচিত?
বিশাখা যদি চিঠিটা পড়ে থাকে তবে যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে। আর কিছু করার নেই। বিশাখা ভাল স্বভাবের মেয়ে হলেও নিলেমন্দ করা এবং কূটকচালি তাদের প্রিয় স্বভাব। কোনও সময়ে তার মুখ দিয়ে কথাগুলো প্রকাশ পেতে পারে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ হেসে উঠলেন হেমকান্ত। তাঁকে আর রঙ্গময়িকে নিয়ে প্রচার তো বহুকাল ধরে হচ্ছে। অতএব ভয়ের আর কী?
বাইরে সাড়াশব্দ পাওয়া গেল। হেমকান্ত চিঠিটা লুকোলেন।
ঘরে এসে ঢুকল কনক আর জীমূত। তাদের মুখ-চোখের চেহারা ভাল নয়। কেমন উদভ্রান্ত।
কৃষ্ণ কোথায়?
কনক বলল, সে ও-বাড়িতে নেই।
নেই মানে? মনু যে তাকে পাঠিয়েছে।
গিয়েছিল। কিন্তু তারপর কোথায় চলে গেছে।
হেমকান্ত উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, তার মানে? এত রাতে সে যাবে কোথায়?
তা কেউ বলতে পারছে না। সন্ধেবেলায় গিয়ে ও-বাড়িতে শচীনের খোঁজ করে। শচীন ছিল না। কিছুক্ষণ বসে ছিল বাইরের ঘরে। ওদের এক ঝি বলল, একটা ছেলে নাকি সাইকেলে হঠাৎ কোথা থেকে এসে ওকে ডেকে নিয়ে যায়। সেই সাইকেলেই উঠে গেছে।
হেমকান্ত দুর্বল শরীরে অবসন্ন বোধ করে বিছানায় বসে পড়লেন। বললেন, তা হলে?
আমরা চার দিকে তোক পাঠিয়েছি। খোঁজ পাওয়া যাবেই।
সাইকেলওলা ছেলেটা কে?
ওদের ঝি তা বলতে পারল না।
হেমকান্ত উঠে পড়লেন। বললেন, গাড়ি জুড়তে বলো। আমি বেরোব।
কনক জীমূত দুজনেই হাঁ-হাঁ করে ওঠে, এই শরীরে কোথায় যাবেন?
শরীরে যথেষ্ট জোর পাচ্ছি। চিন্তা কোরো না।
মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। একটু আগেই তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।
বাধা দিয়ো না। গাড়ি জুড়তে বলো।
খবর পেয়ে মেয়েরা বউরাও এল।
কোথায় যাবেন বাবা? আজ অন্ধকার রাত।
আমি বিশেষ একজনের কাছে যাব। সে বোধহয় বলতে পারবে।
জীমূত বলে, তার নাম বলুন। আমরা খোঁজ নিচ্ছি।
সে অ্যাবসকন্ডার, তার নাম বলা উচিত হবে না। আমাকে যেতে দাও। কৃষ্ণর কিছু হলে আমি মরেও শান্তি পাব না।
তা হলে আমরা কেউ আপনার সঙ্গে যাই।
হেমকান্ত একটু ভেবে বললেন, কনক বরং চলল। আর শোনো, বন্দুকের ঘরটা কাউকে খুলতে পাঠাও। আমি সঙ্গে একটা অস্ত্র রাখতে চাই।
সকলেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করল না।
হেমকান্ত বন্দুকের ঘরে ঢুকে চেস্ট অফ ড্রয়ারস খুললেন। নীচের দেরাজে একদম কোণের দিকে হাত বাড়িয়ে একটা পিস্তল বের করে গুলি ভরলেন। তার হাত কাঁপছিল। বুকে কষ্ট হচ্ছিল। তিনি অস্ত্র পছন্দ করেন না। কিন্তু কৃষ্ণ, তাঁর প্রিয় পুত্র কৃষ্ণের জন্য তিনি দরকার হলে হাজারটা লোককে মারতে পারেন।
ঘোড়ার গাড়িতে বসে কনক জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবেন বাবা?
প্রতুলের বাড়ি। কাছেই।
প্রতুল কে? কৃষ্ণর সেই প্রাইভেট টিউটর?
হ্যাঁ। ছেলেটা শুনেছি স্বদেশি করে।
কৃষ্ণর সঙ্গে তার কীসের সম্পর্ক?
হেমকান্ত একটু চুপ করে থেকে সতর্ক গলায় বলেন, আমার ধারণা কৃষ্ণ স্বদেশিদের সঙ্গে মেলামেশা করছে। এবার হয়তো অ্যাকশনে নামতে চাইছে।
সর্বনাশ!
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তোমরা কেউ থাকে না এখানে। আমিও সবদিকে নজর রাখতে পারি না। কী যে হবে!
