না তো।
কোথায় বসেছিলে?
এই ডেসকে।
সেখানে বসে কী করছিলে মনে করে দেখো।
হেমকান্ত একটু ভেবে বললেন, মনে পড়েছে। একটা চিঠি লিখছিলাম।
কাকে?
হেমকান্ত রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে বললেন, অত খোঁজ নিচ্ছ কেন?
কারণ আছে বলেই নিচ্ছি।
সচ্চিদানন্দকে।
তাতে এমন কোনও কথা লেখোনি তো যে অনন্য দেখলে ক্ষতি হতে পারে।
না।–বলেই হেমকান্ত থমকালেন। সংজ্ঞাহীনতার ফলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বোধহয়।
কী হল?
হ্যাঁ মনু, তাতে আমি অনেক আবোলতাবোল লিখেছি বটে।
লিখেছ! এই রে।
কেন? কী হয়েছে? কেউ দেখে ফেলেছে নাকি?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, তোমাকে যখন অজ্ঞান অবস্থায় বাতাস দিচ্ছিলাম তখন দেখলাম, বিশাখা ডেসকে দাঁড়িয়ে চিঠিটা পড়ছে।
বলো কী?
খুব বেশি পড়েনি। আমি ওকে ডাক দিয়ে জল আনতে পাঠাই। কারণ ওর ভাবসাব দেখে আমার মনে হল, এই বিপদের মধ্যেও যখন অত মন দিয়ে একটা লেখা কাগজ পড়ছে তখন ওই কাগজে তেমন কিছুই লেখা আছে।
তারপর কী হয়েছে? কাগজখানা কই?
আছে। আমি সরিয়ে রেখেছি। তোমার তোশকের তলায়।
ওতে তোনার কথা আছে, মনু।
কেন সচ্চিদানন্দকে ওসব লেখো?
দোষের কিছু হয়েছে?
আগেই তো বলেছি উনি লোক ভাল নন।
তোমার সন্দেহ অমূলক। সচ্চিদানন্দ আমার বাল্যবন্ধু! আমি ওকে চিনি।
তোমার মতো সদাশিব কখনও কাউকে খারাপ দেখে না।
দেখে বই কী! এই যে রামকান্ত দারোগা। এ লোকটা খারাপ।
ভুল। রামকান্ত খারাপ হবে কেন? বরং রামকান্ত কর্তব্যপরায়ণ মানুষ, মাঝে-মধ্যে বাড়াবাড়ি করে ফেলে।
তুমি সব সময়ে আমার উলটোদিকে দাঁড়াও কেন বলো তো?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, সে সাহস আমার নেই।
তবে রামকান্তকে সাপোর্ট করছ কেন?
করছি না। সাপোর্ট করব কেন? তবে সে যে সার্চ করতে এসেছিল তার কারণ আছে।
কী কারণ?
কৃষ্ণ তোমার একটা রিভলবার সরিয়ে নিয়েছিল।
হেমকান্ত চমকে উঠলেন, রিভলবার?
হ্যাঁ, বোধহয় সেটা সে এক-আধদিন স্কুলেও নিয়ে গিয়ে থাকবে। ওর যা বয়স নতুন খেলনা পেলে সকলকেই দেখানোর ইচ্ছে হয়।
সর্বনাশ!
ভয় পেয়ো না। ওটায় গুলি ছিল না। আমার মনে হয় কেউ ওর কাছে রিভলবার দেখে পুলিশকে জানিয়েছে।
সেটা আমাকে এতদিন বলোনি কেন?
বলার কী আছে। তোমারও তো শরীর ভাল ছিল না। তা ছাড়া আমিও তো ওর মায়ের মতোই। ওর ভাল-মন্দ নিয়ে ভাবি।
রিভলবারটা চেয়ে নাওনি ওর কাছ থেকে?
চাইনি, তবে চুপি চুপি সরিয়ে নিয়েছি। ওটা এখন আমার কাছে আছে।
পুলিশ জানে বলছ?
জানে বলেই তো মনে হয়। না হলে সার্চ করতে চাইবে কেন? একটা কথা বলি?
বলো।
কৃষ্ণকে রিভলবার নিয়ে কিছু বলতে যেয়ো না। যা বলার আমিই বলব।
কিন্তু এ তো অতি বিপজ্জনক ঘটনা!
ছেলেমানুষ, ও কি আর অত বোঝে?
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আজ রাতে আমার আর ঘুম হবে না। কৃষ্ণ রিভলবার নিয়ে কী করতে চায় বলো তো?
তোমাকে ছোরা মারার পর থেকেই বোধহয় ওর একটা শোধ নেওয়ার ঝোক এসেছে। ভীষণ ভালবাসে তোমাকে।
শোধ নেওয়ার জন্য রিভলবার! ও তো জানেও না কে আমাকে ছোরা মেরেছে।
তার ওপরেই যে শোধ নিতে হবে তার কোনও মানে নেই। ও শোধ নিতে চায় দলটার ওপর।
পুলিশের ওপরেও খুব রাগ।
ওকে সামলাও, মনু। ওকে নিয়ে আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা।
সে তোমাকে বলতে হবে না। কৃষ্ণ যে আমারও ছেলে সেটা ভুলে যাও কেন? তবে বড় হচ্ছে, কত আর সামাল দিতে পারব আমরা?
তা হলে বলো ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি কাশী চলে যাই।
সে একরকম ভাল প্রস্তাব। যেতে তো আমারও ইচ্ছে। কিন্তু সংসারকে ফাঁকি দিয়ে কি যেতে পারবে? কত দায়িত্ব তোমার।
হেমকান্ত কয়েক পলক চোখ বন্ধ করে কৃষ্ণকান্তর মুখটা দেখতে পেলেন কল্পনায়। ছেলেটি তারই ঔরসজাত, অথচ যেন অন্য এক পরিমণ্ডল থেকে আসা। বড় অচেনা, বড় অন্যরকম।
রঙ্গময়ি বলল, কত আর ভাববে? এসব তোমাকে না বললেই হয়তো হত। কিন্তু ঘটনা যেদিকে গড়াচ্ছে তা দেখে মনে হল, সবকিছু তোমার জানা না থাকলে হয়তো বিপদে পড়বে। জানলে আগে থেকে বিলিব্যবস্থা করা যায়।
ঠিক কাজই করেছ, মনু। আরও আগে বললে ভাল করতে। কাল সকালে রামকান্ত সার্চ করতে আসবে। রিভলবারটা সাবধানে রেখেছ তো?
সাবধান হওয়ার দরকার নেই। তোমার কাছে রাখলেই চলত। তোমার লাইসেন্স আছে, পুলিশের কিছু বলার থাকত না। কিন্তু আমি একটা ভুল করেছি।
সর্বনাশ। আবার কী করলে?
একটা স্বদেশি ছেলেকে দিয়েছি।
মনু! ছিঃ।
রঙ্গময়ি লজ্জা পেল না। স্থির চোখে হেমকান্তর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, আমি তোমার মতো লেখাপড়া জানি না। আমার অত বুদ্ধিও নেই। আমি ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে যা বুঝেছি করেছি। রাগ কোরো না।
হেমকান্ত চুপ করে একটু ভাবলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, পুলিশ এসে রিভলবারটারই খোঁজ করবে। ট্রেস করা না গেলে আমাকে ফেলবে জবাবদিহিতে। তুমি ঠিকই বলেছ মনু, রিভলবারটা যে বাড়িতে নেই তা পুলিশ জানে।
তোমার পায়ে পড়ি, এর জন্য শাস্তি যা আমাকে দিয়ো। কৃষ্ণকে কিছু বোলো না।
হেমকান্ত করুণ মুখে মাথা নেড়ে বললেন, বলার কিছু নেইও। কী বলব? ছেলে বড় হচ্ছে, নিজস্ব মতামত নিজস্ব চরিত্র তৈরি হচ্ছে। আমি কী করতে পারি বলো?
হেমকান্তর করুণ মুখখানার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে রঙ্গময়ি মাথা নাড়ল। বলল, আমিও সেই কথা বলি। তুমি ভেবো না।
রঙ্গময়ি চলে যাওয়ার পর হেমকান্ত তার খাস চাকরটিকে ডেকে বললেন, হরি, মনুর কাছে কেউ আসে-টাসে নাকি রে? ছোকরামতো কেউ। দেখেছিস কখনও?
