রেমি হাত বাড়ায়। একটু ছোঁয় তার ছেলেকে।
ও কি ঘুমোচ্ছ?
হ্যাঁ, বউদি। খুব ঘুমোচ্ছ।
তা হলে রেখে এসো। আর শোনো, ফরসা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে।
আয়া খুব হাসে, ফরসা কাপড় কী গো! ওর দাদু যে ডজনখানেক দামি নরম তোয়ালে দিয়ে গেছেন। বাচ্চার কি অভাব আছে নাকি কিছুর?
রেমি লজ্জা পায়। কৃষ্ণকান্ত যে একটা তুলকালাম কিছু করবেন এ তো তার জানাই ছিল।
ওর দাদু কি আজ এসেছিল?
আসেনি আবার! তিনবেলা হানা দিচ্ছেন গো! আমরা সব ভয়ে জড়োসড়ো।
রেমি মিষ্টি করে বলে, উনি খুব ভাল। ভয় পেয়ো না।
আপনাদের সবাই ভাল। বর ভাল, শ্বশুর ভাল, ছেলে ভাল। বাউটি না নিয়ে কিন্তু ছাড়ব না।
রেমি একটা শ্বাস ফেলে চোখ বুজল।
তারপর একটু অন্ধকার পেরোল রেমি! শরীর এত দুর্বল যে চোখ বুজলেই ঘুমের আঠায় জড়িয়ে যায় চোখ। বোধহয় ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে তাকে।
বিছানায় মিশে থাকা রেমি তার আঘো-ঘুমের মধ্যে আবার দৃশ্যাবলী দেখতে পাচ্ছিল। একজন লোক একা একটা বিশাল রোদে-পোড়া মাঠ পেরোচ্ছে। দুবগলে ক্ৰাচ, গায়ে শতচ্ছিন্ন পোশাক। কোথায় চলেছে?
ধ্রুব না? রেমি কেঁপে ওঠে ভয়ে।
০৮৩. সংজ্ঞা যখন ফিরল
সংজ্ঞা যখন ফিরল তখন হেমকান্তর উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে। দুর্বল শরীরে রাগ, অপমান এবং অযোগ্যের স্পর্ধা তাঁকে বড় বেশি আন্দোলিত করে ফেলেছিল। হেমকান্ত চারদিকে চাইলেন। ঘরভর্তি তাঁর আত্মজনেরা। আত্মীয়দের দেখে এতটা প্রসন্ন তিনি কোনওকালে বোধ করেননি। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার বরাবর দূরত্ব ছিল। নিজের অনেক নাতি-নাতনিকে তিনি ভাল করে চেনেনও না।
একদম শিয়রের কাছে রঙ্গময়ি বসা। হাতে পাখা।
হেমকান্ত রঙ্গময়িকে উপেক্ষা করলেন, কারণ সেই সবচেয়ে নিকট-আত্মীয়া, তাকেই উপেক্ষা করা যায়।
কনক আরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। হেমকান্তর সংজ্ঞা ফিরে আসার পর প্রশ্ন করল, এখন কেমন আছেন?
ভাল। দুর্বলতা আর আচমকা উত্তেজনায় মাথাটা কেমন করল।
করতেই পারে। দারোগাদের স্পর্ধা যে কোথায় পৌঁছেছে।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ঘরের সবাই চাপা স্বরে কথা বলছে। সকলের চোখেই একটা আতঙ্ক আর দিশেহারা ভাব এই অল্প আলোতেই লক্ষ করলেন হেমকান্ত। কনককে বললেন, দারোগার আর দোষ কী? ইংরেজরাই ওদের মাথায় তুলেছে।
জীমূতকান্তি এগিয়ে এসে হেমকান্তর কাছে দাঁড়ায়। বলে, স্বদেশিরা আপনাকে মারার চেষ্টা করল আর রামকান্ত রায়কে ছেড়ে দিল এটা দেখে আশ্চর্য হচ্ছি। স্বদেশিরা কি শত্রু-মিত্র ভুলে গেছে?
হেমকান্ত মৃদু হেসে বললেন, আমাকে মারা সোজা কিন্তু রামকান্তকে মারা তো সহজ নয়। তার। কাছে অস্ত্র থাকে, সঙ্গে সেপাই থাকে। তাছাড়া সে নিশ্চয়ই সর্বদা সতর্ক হয়েই চলে। থাক গে, রামকান্ত রায় কি চলে গেছে!
বিশাখা মৃদু স্বরে বলল, গেছে।
হেমকান্ত ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ভিড়ের মধ্যে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রটির মুখ খুঁজছিলেন। কিন্তু ঘরে কৃষ্ণকে দেখা যাচ্ছিল না। হেমকান্ত বিশাখার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে বললেন, কৃষ্ণ কোথায়?
সে বোধহয় বাড়ি নেই।
এত রাতে কোথায় গেল?
কী জানি।
হেমকান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে বসলেন। দুই ছেলের দিকে চেয়ে বললেন, তোমরা দেখো তো! দরকার হলে চাকর দারোয়ানদের চারধারে পাঠাও। আর প্রজাদেরও খবর দাও।
কনক বলে, অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন?
কারণ আছে বলেই হচ্ছি। কৃষ্ণর ওপর রামকান্ত খুশি নয়, জানোই তো৷ কী হয় না হয় তার ঠিক কী?
আচ্ছা, আমরা দেখছি।
বাড়িতেও দেখো। আগে বাড়ির ঘরগুলো কাছারির ওদিকটা সব ভাল করে দেখে নিয়ে। তাকে পেলেই আমার কাছে পাঠাবে।
খুব ফিসফিস করে রঙ্গময়ি বলে, তাকে আমি শচীনদের বাড়ি পাঠিয়েছি।
হেমকান্ত বিস্মিত হয়ে বলেন, কেন?
পুলিশ দেখে।
হেমকান্ত ছেলেদের দিকে চেয়ে বললেন, থাক আর খুঁজতে হবে না। তোমরা বরং রাজেনবাবুর বাড়িতে যাও। সে সেখানেই আছে। তাকে নিয়ে এসো। দেউড়িটা সব সময়ে বন্ধ রাখতে বলে দিয়ো।
জীমূত আর কনক বেরিয়ে গেল। কৃষ্ণকান্ত মেয়ে আর বউদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা গিয়ে যে যার ঘর ভাল করে খুঁজে দেখো। বাড়ির আনাচ কানাচ তো রাত্রে ভাল দেখতে পাবে না। তবু চাকর আর দাসীদের দিয়ে খুঁজিয়ে নিয়ে। কিছু আপত্তিকর জিনিস বা কাগজপত্র থাকলে আমার কাছে নিয়ে এসো।
চপলা বলল, কেন বাবা?
অনেক সময় পুলিশ নিজেই আপত্তিকর জিনিস আগে থেকে রেখে যায়। ওদের তো কূট-কৌশলের অভাব নেই। আমার ওপর রাগ তো আছেই। কৃষ্ণর ঘরটা ভাল করে দেখো।
হেমকান্ত এসব সিদ্ধান্ত নিলেন ঠান্ড। ভাবে, একটুও ভয় না পেয়ে না ঘাবড়ে। নিজের এই নিরুত্তাপ আচরণ এবং মোটামুটি বুদ্ধিমানের মতো চিন্তা করার শক্তি দেখে নিজেই একটু অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন হেমকান্ত। অন্যেরাও হচ্ছিল বোধহয়। কিন্তু তাদের মুখের ভাব ততটা অল্প আলোয় দেখা গেল না।
সবাই চলে গেল। রইল রঙ্গময়ি। বলল, দুর্বল শরীরে অনেক ধকল গেছে। এবার শুয়ে পড়ে।
হেমকান্ত শুনলেন না। বললেন, সারাদিন শুয়ে বসেই আছি। বিশ্রাম নিতে আর ভাল লাগছে।
তা হলে কি মুগুর ভাঁজবে নাকি?
যা দিনকাল দেখছি তাই ভাঁজতে হবে। দারোগার স্পর্ধা দেখে বড় অবাক হয়েছি আজকে।
রঙ্গময়ি মৃদু একটু হেসে বলল, একটা কথা বলব?
বলো। কী কথা?
রামকান্ত বায় যখন আসে তখন তুমি কী করছিলে?
হেমকান্ত অবাক হয়ে বলেন, কী করছিলাম মানে? বসেছিলাম।
বসে কিছু করছিলে না?
