অজ্ঞান! বলিস কী?
তাই তো বলছি। আমার শালা দেখতে পেয়েছিল ভাগ্যিস। নইলে রাস্তার লোক হাসপাতালে চালান করে দিত।
তোর কোন শালা? যাদের বাড়িতে গিয়ে আমরা হুজ্জোত করেছিলাম?
হ্যাঁ। সে-ই।
সে এখনও তোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে?
ঠিক রাখতে চায় না। তবে বিপদে পড়ে রেখেছে।
তোর কপাল রে, ধ্রুব! আমার যত রিলেটিভ আছে কেউ মাইরি ভয়ে আর সম্পর্ক রাখে না।
তোকে ভয় কীসের?
ওই যে মাঝে মাঝে একটু বেহেড হয়ে যাই। জীবনটা আমার বড় ট্র্যাজিক রে ধ্রুব। এই দুঃখে হয়ে যাবে নাকি এক হাত ব্ল্যাকনাইট?
তুই টাকা পেলি কোথায় বল তো!
কেন শালা, আমি কালোয়ারের ছেলে, আমার পকেটে টাকা থাকতে নেই?
তা আছে। কিন্তু হঠাৎ এত ব্ল্যাকনাইট-ব্ল্যাকনাইট করছিস কেন? তুই তো খাস পেঁচো কালীর পেচ্ছাপ। কালীমার্কা।
মাঝে মাঝে একটু ফিনফিনে নেশা করতে ইচ্ছে হয় না?
আজ ইচ্ছেটা হয়েছে কেন?
বড় দুঃখ রে! একটু মুরগির রয়্যাল দিয়ে মুখবন্ধন করে নিলে বড় ভাল জমত ব্যাপারটা।
তোর কি এখনও খিদে পায় প্রশান্ত? আমার পায় না।
আমার পায়।
আমার মনে হয় পেটে একটা গজকচ্ছপ ঢুকে বসে আছে। গ্যাস হচ্ছে।
দিনে বারোটা করে অ্যান্টাসিড খাবি।
তোর মাথা!
মাতালদের রেডবুকে লেখা আছে রে। বারোটা অ্যান্টাসিড।
***
আপনাকে দারুণ ফ্রেশ দেখাচ্ছে।
রেমি কথাটা শুনে তরুণী নার্স মেয়েটির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কথাটা ঠিক বুঝতে পারছে না। বলল, আমি কি ভাল আছি?
ওমা! ভাল নেই? একদম ভাল হয়ে গেছেন আপনি।
রেমির মনে হচ্ছিল তার শরীরের ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। একতাল ময়দার মতো তাকে ঠেসে মেখে ছেনে তারপর দলা পাকিয়ে ফেলে গেছে কে যেন। মৃত্যুর এক আবছা অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরে এসেছে সে, কিন্তু এখনও সেই মৃত্যুর একটু শীতল স্পর্শ, মাথার ভিতরে এখনও কয়েক ফোঁটা মৃত্যুর অন্ধকার রয়ে গেছে। এখনও দুই জগতের এক মধ্যবর্তী মানসিক অবস্থায় রয়েছে রেমি। ঠিক স্বাভাবিক নয়।
নার্স মেয়েটি তা জানে। দীর্ঘকাল সংজ্ঞাহীনতার পর এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক, সে রেমির আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্যই বলল, অসুস্থতার কোনও চিহ্নই আপনার মুখে নেই।
রেমি ক্ষীণ গলায় বলল, আমার শরীর বড় দুর্বল।
ও তো একটু হবেই।
ছুঁচের বড় ব্যথা।
কমে যাবে। আর কয়েকটা দিন।
রেমি হাসল না। বড় বড় দুই চোখে অনির্দিষ্টভাবে চেয়ে রইল। তার দৃষ্টি স্থির নয়, স্বাভাবিক নয়। শ্বস ক্ষীণ, নাড়ি ক্ষীণ, শরীর সাদা, শীর্ণ, শিরা-উপশিরার নীলাভ সরীসৃপ চামড়ার নীচে দৃশ্যমান।
আপনার হাজব্যান্ড এসেছিলেন।
কখন?
আজ সকালে। না দুপুরে বোধহয়।
আমার ছেলে?
কাল সকাল থেকে এ ঘরে বেবিকে দেওয়া হবে। আপনার হাজব্যান্ড দেখে গেছেন বেবিকে।
আমি একবার দেখব। দেখাবেন?
নিশ্চয়ই।–বলে নার্স মেয়েটি আয়াকে ডেকে বেবি আনতে বলে দেয়।
আপনার হাজব্যান্ড কিন্তু খুব হ্যান্ডসাম।
রেমি হাসে না। খুশি হয় না। জবাব দেয় না।
ইনজেকশনটা দিয়ে দিই এবার।
দিন। আমার আর ব্যথা লাগে না।
নার্স ইনজেকশন দেয়। রেমি নির্বিকার চেয়ে শুয়ে থাকে। উঁচটা বের করে নিয়ে নার্স বলে, লাগল না তো!
আমার আর লাগে না। বললাম না! কত ব্যথা গেল কদিন। ইনজেকশন সে তুলনায় কিছুই নয়।
আপনি আমাদের খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।
কেন বলুন তো।
এমন কাণ্ড বাঁধালেন! হেমারেজ থামে না। এখন-তখন অবস্থা। ডাক্তাররা তো হাল ছেড়ে দিয়েছিল।
মরলেই বা কী হত?
ও বাবা! আপনার কিছু হলে আমাদের গর্দান থাকত নাকি?
কেন? গর্দানের ভয় কী?
নার্সিংহোম ভরে গিয়েছিল লোকে। ভি আই পি-দের ফোনে ফোনে আমরা অস্থির। স্বয়ং কে কে চৌধুরী মানে আপনার শ্বশুরমশাই সারারাত্রি লবিতে বসে ছিলেন।
খুব হইহই হয়েছিল?
সাংঘাতিক। নার্সিংহোমে একজন হোমিওপ্যাথ, একজন কবিরাজ এবং একজন তান্ত্রিককেও আনা হয়েছিল।
বলেন কী?
তাই তো বলছি আপনার কিছু হলে মিস্টার চৌধুরী আমাদের গর্দান নিতেন।
উনি আমাকে একটু বেশি ভালবাসেন।
ভি আই পি-দের আমরা এমনিতেই একটু বেশি যত্ন নিই। কিন্তু আপনার ব্যাপারে আমাদের নাওয়া-খাওয়া ছাড়তে হয়েছিল।
ইস। আমার ভীষণ লজ্জা করছে।
লজ্জার কিছু নেই, মিসেস চৌধুরী। আপনি যে ভাল হয়ে গেছেন সেইটেই আমাদের সান্ত্বনা।
রেমি একটু ভাবল। অজ্ঞান অবস্থায় সে সারাক্ষণ যেসব অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছে তার মধ্যে এক অচেনা পুরুষ ছিল। সেই পুরুষ কে তা সে জানে না। তবু সেই পুরুষের সঙ্গে একজনের সুন্দর একটা আদল ছিল।
রেমির রক্তহীন মুখে ক্ষীণ একটু লাল রং দেখা গেল। সে জিজ্ঞেস করল, ও ছিল না?
ও কে? কার কথা বলছেন?
আমার হাজব্যান্ড!
আপনার হাজব্যান্ড ছিলেন কি না ওই ভিড়ের মধ্যে লক্ষ করিনি। ছিলেন নিশ্চয়ই। সবাই ছিলেন।
রেমি একটু চেয়ে থাকে মেয়েটির দিকে।
মেয়েটা বলে, আপনার হাজব্যান্ড কিন্তু খুব স্মার্ট। দারুণ।
আমাদের বাড়ির কেউ কি এখন আছে বাইরে?
আছে। জগা বলে একজন।
তার কথা বলছি না। আর কেউ?
খোঁজ করব?
দেখুন না একটু। আমার বাপের বাড়ির কেউ আসতে পারে।
তারা অনেকক্ষণ আগে এসে দেখে গেছে।
আচ্ছা।
রেমি চোখ বোজে। দীর্ঘ একটা সময় চেতনাহীনতায় কাটিয়ে এখন তার প্রিয়জনদের দেখতে ইচ্ছে করছিল।
আয়া বাচ্চাটাকে নিয়ে এসে মৃদুস্বরে ডাকে, বউদি! এই যে দেখুন। রাজপুত্তুর। সোনার বাউটি দিতে হবে কিন্তু।
রেমি নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে বাচ্চাটার দিকে। তার। তার। একমাত্র তার বত্রিশ নাড়ি-ঘেঁড়া ধন। লাল, তুলতুলে, মোটাসোটা, ন্যাড়ামাথা। তবু যেন জন্মজন্মান্তরের চেনা। লক্ষ বছর এই শিশু তার গর্ভে বাস করেনি কি? বুক জুড়ে বাৎসল্যের মেঘ পুঞ্জীভূত হয়ে এল। কোথায় ছিল এই অসম্ভব অদ্ভুত অনুভূতি! একটু আগেও তো একে দেখেনি সে!
