সুতরাং–”
কর্তাবাবু!
হেমকান্ত চমকে উঠে চিঠিখানা ঢাকা দিলেন।
চাকরটা মৃদু স্বরে বলল, দারোগাবাবু এসেছেন।
দারোগাবাবু!–বিস্মিত হেমকান্ত আপনমনে কথাটি উচ্চারণ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর বললেন, নিয়ে আয়।
একটু বাদে যখন রামকান্ত রায় ঘরে ঢুকলেন তখন সেজবাতির আলোয় তাকে আরও প্রকাণ্ড দেখাচ্ছিল।
হেমকান্ত বললেন, বলুন কী খবর!
আপনি কেমন আছেন?
একটু ভাল।–বলে হেমকান্ত নড়েচড়ে বসলেন।
রামকান্ত রায় শালগাছের মতো সিধে দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, আমি একটা অপ্রিয় কাজ করতে এসেছি।
হেমকান্ত অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বললেন, কী কাজ?
আপনার বাড়ি সার্চ করার আদেশ আছে।
আমার বাড়ি সার্চ করবেন?–হেমকান্ত হাঁ করে রইলেন।
সরকারি কাজ।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু সার্চ করবেন কেন?
সব কারণ তো আপনাকে বলা সম্ভব নয়। তবে আমার কাছে ওয়ারেন্ট আছে। দেখবেন?
হেমকান্ত ওয়ারেন্ট দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। কিন্তু তার চোখে হঠাৎ একটা তীব্র রাগের দীপ্তি দেখা দিল। তিনি বললেন, সার্চ করবেন। কিন্তু আমার বাড়িতে এত রাত্রে আমি পুলিশ ঢুকতে দিতে পারি না। বাড়িতে মেয়েরা রয়েছেন। আপনি কাল সকালে আসবেন।
রামকান্ত রায় হেমকান্তের গলার দৃঢ়তা লক্ষ করে একটু দ্বিধায় পড়লেন। বললেন, আমি বাড়ির সব জায়গা সার্চ করব না। শুধু বিশেষ কয়েকটা স্পট।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, আপনার একজন সেপাইও আজ রাত্রে আমার দেউড়ি যেন না পেরোয়, তার ফলাফল ভাল হবে না।
রামকান্ত রায় একটু হেসে বললেন, আপনি রাগ করছেন কেন? আমাদের তো সত্যিকারের জরুরি প্রয়োজনও এটা হতে পারে। আজ রাত্রে যদি সার্চ করি তবে বাড়ির লোকদের একটুও বিরক্ত করব না। কিন্তু যদি সেই অনুমতি না দেন কাল সকালে এসে গোটা বাড়ি লন্ডভন্ড করে যাব। সেটাই কি ভাল হবে?
হেমকান্ত বহুদিন পর সত্যিকারের রাগলেন। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ। কপালে একটা শিরা রাজটিকার মতো ফুলে আছে। মুখ রক্তিমাভ। বললেন, আমি জানি রাত্রে বাড়ি সার্চ করার নিয়ম নেই। আপনি ইচ্ছে করলে বাড়ি ঘিরে রাখতে পারেন। তবু কেন জবরদস্তি করছেন?
রামকান্ত রায় একটা শ্বাস ফেলে বললেন, সরকারি নিয়ম আপনি আমার চেয়ে ভাল জানেন না, হেমকান্তবাবু।
যদি নিয়ম থেকেও থাকে তবু বলছি, আপনি ওকাজ করবেন না। এখন আসুন।
দুজনে দুজনের দিকে কিছুক্ষণ বিষদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।
তারপর রামকান্ত রায় বললেন, আচ্ছা। দেখা যাবে।
সামান্য উত্তেজনায় হেমকান্তর দুর্বল শরীর কাঁপছিল। দরজায় তার দুই ছেলেমেয়ে এবং ছেলের বউরা উৎকণ্ঠিত মুখে নিঃশব্দে ভিড় করে এসে দাঁড়িয়েছে কখন।
কনক বলল, কী হয়েছে বাবা?
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, কিছু হয়নি। দারোয়ানদের বল দেউড়ি পেরিয়ে যেন কেউ ঢুকতে না পারে।
রামকান্ত রায় একটু হাসলেন। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন।
হেমকান্ত সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মেঝেয়।
০৮২. ধ্রুব, বাপ হয়েছিস শুনলাম
ধ্রুব, বাপ হয়েছিস শুনলাম। সেলিব্রেট করবি না!
ধুস শালা, বাপ সবাই হয়, সেটা কোনও ইভেন্ট নাকি! দেখিস না, ফুটপাথে অবধি বিয়োচ্ছে। ভিখিরিরা!
তবু এই প্রথম বাপ হলি, ফান্ডাই আলাদা।
সরকার বেশি বাপ হতে বারণ করেছে না! এই বাঁধাবাঁধির যুগে বাপ হয়ে তো আমার লজ্জাই লাগছে।
তুই মাইরি বেশ বলিস। তবে বেশি বাপ আর তুই হলি কোথায়! সেই কবে মান্ধাতার আমলে একটা বিয়ে কেলিয়েছিলি, তারপর বাপ হতে হতে তো বুড়ো মেরে গেলি, বাবা!
বাপ আরও একবার হতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সেবারটা টসকে গেল।
যেটা টসকে গেছে সেটা তো হিসেবের মধ্যে নয়। এটা হিসেবের মধ্যে। আজ একটা ব্ল্যাকনাইট দুজনে মিলে উড়িয়ে দিই আয়। দাম আমি দেব।
কেন? তুই দিবি কেন? বাপ তো হলাম আমি, তুই তো নয়।
আরে ওই হল। তুই বাপ হলে আমিও বাপ। তুই আর আমি কি আলাদা! এক পাঁইট ব্ল্যাকনাইট পেঁদিয়ে ঝুম হয়ে বসে থাকি আয়। মুরগিব রয়্যাল খুমে নিবি একটা?
না, আমার কেমন ইচ্ছে হচ্ছে না।
তুই কি শেষে ফিলজফার হয়ে যাবি, ধ্রুব? না কি সাধু-টাধু?
বকিস না অত।
মাইরি বলছি, তোর লক্ষণ আমার ভাল ঠেকে না কোনওদিন। শালা মিনিস্টারের ঘরে রুপোর চামচে মুখে করে জন্মেছিস, তোর শালা কত আপ খেয়ে বসে থাকার কথা। কেন যে শালা ডাউন ব্যাটারির লোকদের সঙ্গে মিশে মিশে বখে গেলি। তা বখবি তো ভাল করে বখ। তা না আবার মাইরি কী যে সব উলটোপালটা বলিস মঙ্গলগ্রহের ভাষায় কিছু বোঝা যায় না। ব্ল্যাকনাইট আবার ইচ্ছে করছে না কী রে?
তুই শালা আগের জন্মে শুড়ির নাতি ছিলি। দুনিয়ায় যাই ঘটুক সেই অকেশন ধরে তোর খানিকটা গেলা চাই। মামার গোয়ালে গাই বিয়োলেও ব্ল্যাকনাইট, ধ্রুব চৌধুরীর ছেলে হল বলেও ব্ল্যাকনাইট–
তুই মাইরি বেশ বলিস। আসল কী জানিস, একটা অকেশনে খেলে আর খুঁতখুঁতুনিটা থাকে না। আমার তো আবার ডাক্তারের বারণ। মাল খেতে গেলেই কেমন বুকটা খচ করে ওঠে। একটা অকেশন পেলে আর সেটা হয় না। তখন মনে হয়, নেশার জন্য তো নয়, এই একটা আনন্দের ব্যাপার ঘটল তাই একটু ফুর্তি করা আর কী।
তুমি হচ্ছ মালের গেঁড়ে। সবই বোঝে তবু নিজের সঙ্গে লুকোছাপাও করা চাই।
বাপু এই সাঁঝবেলাটায় আর এড়ুকেট করিস না আমাকে। এই সময়টায় আমি ভারী মাতৃহারা ছেলের মতো হয়ে যাই। ভিতরটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আমার জীবনটা যে কীরকম ট্র্যাজিক তা তো জানিস।
