“লিখিলাম! ভাই সচ্চিদানন্দ, বহুকাল তোমাকে পত্র দিই না। তোমার শেষ পত্র পাইয়াছি বোধহয় মাস ছয়েক আগে। তাহাতে ক্ষতিবৃদ্ধি ঘটে নাই। তোমার আমার মধ্যে নিয়মিত পত্র বিনিময়ের পৌনঃপুনিক ক্লান্তি নাই। যখন প্রয়োজন ও আগ্রহ দেখা দেয় তখন লিখিলেই চলে। ইহা একরূপ ভাল। ইহাতে কথা জমিয়া উঠিবার অবকাশ পায়। পত্র লিখিবার আনন্দ ব্যাহত হয় না। তাহা ছাড়া পত্র তো বাহক মাত্র। যাহা সে বহন করিয়া লইয়া যায় তাহা হৃদয়। সেই হৃদয়ই যদি স্পন্দিত না হয় তাহা হইলে পত্র লিখিয়া কী হইবে? তোমার আমার সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হউক, পরস্পরের কুশলবার্তা না পাইলে অস্থির হইব এমন নহে।
“আজ তোমাকে কী লিখিব তাই ভাবিতেছি। লিখিবার যে কত কিছু আছে। কত কথা অভ্যন্তরে জমিয়া পুঞ্জীভূত হইয়াছে। কিন্তু ঘটনাবলীর বিবরণ দিয়া তোমার শিরঃপীড়ার কারণ হইব নাকি?
“বরং তোমাকে একটি সংবাদ দিই। সেই কিশোরী রঙ্গময়িকে তুমি তো ভুলিতে পারো নাই। তাহাকে লইয়া অনেক বিদ্রুপ বাণ আমার প্রতি নিক্ষেপ করিয়াছ। এমনকী বিবাহ করিবার পরামর্শ দিতেও তোমার বাধে নাই। বরাবরই তুমি ঠোঁটকাটা এবং অবিনয়ি। যদিও নিজেকে তুমি উচিতবক্তা বলিয়া মনে করো।
“রঙ্গময়ি আজ আর কিশোরী নাই। তুমি এখানকার বাসস্থান গুটাইয়াছ। বহুকাল এ শহরে পদার্পণ করো নাই। রঙ্গময়িকেও সুতরাং তুমি এখনকার রূপে চাক্ষুষ করো নাই। কিন্তু আমার চক্ষুর সম্মুখেই সে বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছে। বড় ইচ্ছা করে আমার চক্ষু দুইটি আজ তোমাকে দিই, আমার দুই চক্ষু দিয়া তুমি রঙ্গময়িকে অবলোকন করো।
“রূপের কথা কী ছাই বকিতেছি! রঙ্গময়িকে রূপের জন্য কে শিরোপা দিবে? ধারালো মুখশ্রী ও তীক্ষ চক্ষু দুইটি ছাড়া তাহার চটকদার কিছু নাই। কিন্তু আমার চক্ষু দিয়া যদি দেখিতে তবে তাহার মধ্যে আর-এক অপরূপাকে তুমি দেখিতে পাইতে। একদা তুমি তাহার রূপে মজিয়াছিলে। কিন্তু হৃদয়ের কন্দরে তাহার যে এক দিব্য প্রস্রবণ আছে তাহাতে অবগাহন করিতে পারো নাই।
“তোমাকে কী বলিব তাহাই ভাবিয়া পাইতেছি না। এ বয়ঃসন্ধির প্রণয়-প্রলাপ নহে। ইহা এক আবিষ্কারের কাহিনি। কিন্তু এমনই ব্যক্তিগত সেই আবিষ্কার যে, খুব ঘনিষ্ঠ বয়স্যকেও বুঝি বুঝাইয়া বলা যায় না।
“এই আবিষ্কার ঘটিল এক আকস্মিকতার মাধ্যমে। এক আততায়ি আমাকে হত্যা করিবার জন্য আক্রমণ করে। বলাবাহুল্য যে, সে সফল হয় নাই। তবে আমাকে সে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাইয়া দিয়াছিল বটে। আজও আমি একপ্রকার শয্যাশায়ি।
“এই ঘটনাটির কথা বিশদ লিখিব না। তাহার প্রয়োজনও নাই। মানুষের জীবনে দৈব-দুর্বিপাক তো ঘটিয়াই থাকে। কিন্তু এই ঘটনার অন্যতম এক গভীর তাৎপর্য আছে। যেমন দুর্যোগের অশনিপাতে মানুষ আচমকা বহুদূর পর্যন্ত দেখিতে পায়, এই ঘটনার সময় মৃত্যু-অশনির ক্ষণিক স্পর্শে আমি সেইরূপে এক দূরদৃষ্টি লাভ করি।
“ভায়া হে, মৃত্যুচিন্তার কথা তোমাকে বহুবার লিখিয়াছি। হয়তো বিরক্ত হইয়াছ। আজও লিখি, মৃত্যুর কথা আমি কখনও ভুলি না। সর্বদা বাঁচিয়া থাকিয়া মৃত্যুর ধ্যান ইহজন্মে আমাকে ছাড়িবে না।
“কিন্তু প্রকৃত মৃত্যুর মুখোমুখি হইয়া আমার জীবনে মোড় ফিরিল। আজ আর আমি সেই দুর্বলহৃদয়, মৃত্যুচিন্তায় বিহুল হেমকান্ত নই। মৃত্যু যেন আমাকে ঘাড়ে ধরিয়া একটা ঝাঁকুনি দিয়া বলিয়া গেল, মরিতে হয় তো মর না! মৃত্যু এইরূপ।
“আমি দেখিলাম এবং চিনিলাম। মনে হইল, ইহা তো খুব বেশি কিছু নয়। খুব অঘটন কিছু তো নয়। আততায়ির অস্ত্র, সন্ন্যাস রোগ, যক্ষ্মা উপলক্ষ্য যাহাই হউক, ঘটনা সামান্যই।
“বাল্যকাল হইতেই আমি গাছপালা ও পশুপক্ষীর সন্নিকটে থাকিতে ভালবাসি। ইহাদের মধ্যে ক্ষুদ্র প্রাণের প্রকাশ ও সেই প্রাণের নানা ক্ষুদ্র ক্রীড়া প্রত্যক্ষ করিয়াছি। জীবজগতের সহিত তবু একাত্মতা আমার কোনওদিন ঘটে নাই। কোনওদিন মনে হয় নাই, একটি মানুষ বা একটি গাছের জন্ম বা মৃত্যু কোনও ঘটনাই নহে। বিশ্ব জুড়িয়া প্রাণের যে অবিরল প্রকাশ ঘটিতেছে আমরা তাহারই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। একটি নিবিয়া গেলেও প্রাণ তো অবিনাশী ক্রিয়া করিয়াই চলে। যে কেবল ব্যক্তিগত মৃত্যুর কথা ভাবিয়া বিষণ্ণ হয় সে জ্ঞানবান নহে।
“একটু ভুল বকিতেছি কি ভাই সচ্চিদানন্দ? হইতে পারে। আজ আমার মনটাই প্রগলভ। বাক্য বা ভাষা তো তদনুরূপই হইবে। ক্ষমা করিয়ো। তোমার এই চিরনাবালক বয়স্যটির অনেক অত্যাচার সহ্য করিয়াছ। এবারটাও করো।
“যাহা বলিতেছিলাম। খানু পাগলের তাড়া খাইয়া বাল্যকালে আমার যে দুর্দশা হইয়াছিল তাহা তোমার মনে আছে। এবার আততায়ি আসিয়া তদপেক্ষা অনেক বড় ঝাঁকুনি দিয়া গিয়াছে। সেই আন্দোলন আমার রক্তে এখনও দোলাচল সৃষ্টি করে।
“এই ঘটনার ফলে আমার অভ্যন্তরে যেন ঘুম ভাঙিল। নিদ্রোখিতের মতো চারিদিকে চাহিয়া দেখিতেছি। বাস্তব জগৎ স্বপ্নের মতো নহে। সেই দৃষ্টিতেই রঙ্গময়ির দিকে চোখ ফিরাইলাম। এই যুবতী বাল্যকাল হইতে আমাকে প্রার্থনা করিয়া শিবের মাথায় জল ঢালিয়াছে, কলঙ্কের গুরুভার বহন করিয়াছে, বিবাহহীন কৌমার্যকে অবলম্বন করিয়া বড় অনাদরে বাঁচিয়া আছে। ইহাকে আদর করিবার কেহ নাই। কিন্তু সকলেই ইহার নিকট কেবল আদর যত্ন ও সেবা প্রত্যাশা করে।
“এইসব দেখিলাম। মনে হইল, কেন ইহাকে আর কষ্ট দিব? সংসার ইহাকে কিছু দেয় নাই। সংসার দেয় নাই বলিয়া আমিও চিরকাল স্তোকবাক্যে ইহাকে তুষ্ট রাখিব? আর কিছু তাহার প্রত্যাশা বা দাবি নাই?
