কার সঙ্গে?
ধ্রুব অর্থাৎ নিজের সঙ্গেই।
কী যে সব অদ্ভুত কথা বলো না!
কাল রাতে আমার ভিতর থেকে যে অদ্ভুত লোকটা বেরিয়ে এসেছিল তার সঙ্গে আগে আর কখনও দেখা হয়নি। তাকে দেখার পর থেকেই আমার একটা প্রবলেম শুরু হয়েছে। ওই যে কী একটা সিনেমা আছে না ক্র্যামার ভারসাস ক্র্যামার! এ অনেকটা তাই। ধ্রুব ভারসাস ধ্রুব একটা খিচান চলছে।
আমি একটা কথা বলব, ধ্রুব?
বলো না।
লোকটা তোমার অচেনা হলেও আমার অচেনা নয়। তাকে আমি বহুবার বহু অকেশনে দেখেছি।
বটে! তা হলে সাবধান করোনি কেন?
তুমি স্যাডিস্ট, সাবধান করে কী হবে? আর ওই স্যাডিজমই তোমার অ্যাট্রাকশন। তুমি তো বর্বর নও, একটু নিষ্ঠুর মাত্র।
খুব পোয়েটিক্যাল ডায়ালগ দিচ্ছ যে!
আজ যেন কেমন একটা লাগছে গো। এসো না, খুব মজা করব দুজনে।
মজা আজ জমবে না, ধারা। দুজনে মজা হয়, কিন্তু তিনজনে মজা হয় না। তৃতীয় লোকটা বাগড়া দেবে।
তিনজন আবার কে?
তুমি, আমি আর ধ্রুব!
ফের সেই হেঁয়ালি!
হেঁয়ালি নয়। তুমি বুঝবে না।
তা হলে সারাদিন বই পড়ে কাটাতে হবে আজ?
বই পড়ো, গান শোনো, রাধে, খাও। যা খুশি করো। সময় কেটে যাবে ঠিক।
ধ্রুব ফোন নামিয়ে রাখল।
জগা খুব কাছ থেকে আচমকা জিজ্ঞেস করল, কে বলো তো মেয়েটা!
ধ্রুব একটু চমকে গিয়েছিল। জগাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল, তোমার সে খবরে কী দরকার?
জগার মুখে হাসি বা অমায়িক ভাব নেই। একটা হিংস্রতাই আছে ববং। বলল, দরকার একটু আছে। আজ যখন তুমি ঘরে ঘুমোচ্ছিলে তখন খুব সকালে কর্তাবাবুর কাছে পুলিশ ফোন করেছিল।
ধ্রুব একটু অবাক হয়। পুলিশের তো ফোন করার কথা নয়। সদানন্দ বলেছিল সেটা ডিসমিস হয়ে গেছে। সে জিজ্ঞেস করে, কী বলল পুলিশ?
তুমি সল্ট লেক-এ একটা মেয়ের ফ্ল্যাটে কাল নাকি হুজ্জোতি করেছ! সত্যি নাকি?
করে থাকলে কী?
খুব গুণধর ছেলে হয়েছ তা হলে! আঁ! আর যে দোষই থাক এ দোষটা তোমার ছিল না কখনও। এখন এটাও অভ্যাস করলে?
ধ্রুবর রাগ হল না। জগার ওপর রাগ করে লাভও নেই। এক সময়ে এবং এখনও জগা কৃষ্ণকান্তর ডান হাত ছিল বা আছে। যত লাঠিবাজি বা গা-জোয়াবির ব্যাপার আছে তাতে জগাই নেতৃত্ব দেয়। শরীরে অসীম ক্ষমতা, মনে অগাধ সাহস, প্রভুভক্তি তুলনাহীন। শুধু তাই নয়, প্রভুর
পরিবারভুক্ত সকলকেই সে আত্মীয়সমান জ্ঞান করে। সেই বোধ থেকেই সে কৃষ্ণকান্তর ছেলেমেয়েকে প্রয়োজনে শাসন বা ভৎসনা করতে পিছপা হয়নি। ধ্রুব জানে, জগার ওপর কর্তৃত্ব ফলিয়ে লাভ নেই, সে তাকে পরোয়া করে না। ধ্রুব তাই জগার চোখের দিকে গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, করলাম না হয়।
ওসব না হয় টা হয় ছাড়ো। সত্যি কথাটা কী?
ওটাই সত্যি কথা। মেয়েটির ফ্ল্যাটে আমি যাই।
কর্তাবাবু আজ চোখের জল ফেলেছেন তা জানো? শত দুঃখ পেলেও আমরা তার চোখে জল দেখিনি কখনও।
কাঁদলেন নাকি?
কাঁদবারই কথা। ফোন যখন ধরেন তখন আমি সামনে ছিলাম। ফোনটা নামিয়ে রেখে অনেকক্ষণ দুহাতে মুখ ঢেকে বসে ছিলেন। তখন আমি জল গড়াতে দেখেছি।
ব্যাপারটা এমন কিছু নয় যে কাঁদতে হবে।
তুমি সদ্য বাবা হয়েছ। এখনই ঠিক বুঝবে না। তবে পরে বুঝবে বাপ হলে কেমন লাগে বুকের ভিতরটা।
ধ্রুব চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না।
জগাও একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছিল কাল ওখানে?
তেমন কিছু নয়।
মেয়েটাকে তুমি মারধর করেছিলে? না হলে পুলিশ জানল কী করে?
একটু ঝগড়া হয়েছিল।
ঝগড়া নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু। যদি বলো তা হলে গিয়ে সাফ করে দিয়ে আসতে পারি।
ধ্রুব একটু চমকে উঠে বলে, না না। ওসব কে বলেছে?
জগা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর চাপা গলাতেই বলে, যদি মেয়েমানুষের কাছে যেতেই হয় তো যাবে। পুরুষমানুষের একজনকে নিয়ে চলে না। কিন্তু সেটা একটু বুদ্ধি খাটিয়ে যেতে হয়। তুমি হুজ্জতি করে বেড়াও কেন? মাল খেয়ে সারা শহরে জানান দিয়ে বেড়াচ্ছ, মেয়েমানুষ নিয়ে হইচই ফেলে দিচ্ছ। তুমি ওরকম কেন?
তবে কীরকম হতে হবে?
যে রকম হলে লাঠিও ভাঙে না আবার সাপও মরে! তোমার তো অত বুদ্ধি, আর এই সামান্য ব্যাপারটা বোঝো না?
ধ্রুব একটা হতাশার শ্বাস ছাড়ল।
জগা বলল, মেয়েটা কে?
মেয়েটাকে ভুলে যাও, জগাদা।
ভুলব কেন? একটু কড়কে দেব।
কড়কানোর দরকার নেই।
আছে। জাতসাপের লেজ দিয়ে কান চুলকানো যে ভাল নয় সেটা তাকে বুঝিয়ে দেব।
ও কিছু করেনি।
আর কিছু না করুক পুলিশের কাছে তোমার নামে নালিশ করেছে। লোক জানাজানি হয়েছে। সেটা কি কম? তুমি তো জানোই কর্তাবাবু পলিটিক্যাল লিডার। তার ছেলেকে নিয়ে বদনাম রটলে ভোটের ক্ষতি হয় না? ইমেজ নষ্ট হয়ে যায় না?
এসব কথা জগা শিখেছে দীর্ঘকাল কৃষ্ণকান্তর সঙ্গ করে করে। ধ্রুব জানে, জগার মাথায় একমাত্র কৃষ্ণকান্তর ইমেজ রক্ষা ছাড়া অন্য চিন্তা নেই। কৃষ্ণকান্তর ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে সে এক-আধটা লাশও নামিয়ে দিয়েছে। ধ্রুব জগার দিকে আবার অসহায়ভাবে খানিকটা চেয়ে থেকে বলে, ওকে আমিই সাবধান করে দেব।
দিলে ভাল। মেয়েছেলের গণ্ডগোলে আমি নাক গলাতে চাই না। তবে বেশি বেগড়বাঁই দেখলে আমাকে বোলো। এখন চলল, নার্সিংহোম-এ যাবে তো!
ধ্রুব আবার বড় একটা শ্বাস ফেলে বলে, হুঁ।
রেমির জ্ঞান ছিল না। অপারেশনের পর এখনও অ্যানাস্থেশিয়ার ঘোর কাটেনি। তাছাড়া অপরিসীম দুর্বলতা তো আছেই। নাকে নল, হাতে উঁচ নিয়ে বিছানার সঙ্গে মিশে আছে সে।
