ধ্রুব মুখের দিকে চেয়ে ছিল। নার্স রেমিকে ডাকল, শুনুন! এই যে মিসেস চৌধুরী! দেখুন কে এসেছে। আপনার হাজব্যান্ড।
রেমি শুধু উ, উ বলল বার দুয়েক। একবার দুটি চোখের পাতা একটু কাঁপল।
খুব কষ্ট হচ্ছে ভেবে ধ্রুব বলল, থাক থাক।
নার্স বলে, ভিতরে কনশাসনেস আছে।
কেমন আছে ও?
ভাল। এখন অনেক ভাল। শুধু ইউরিনে এখনও ব্লাড আসছে।
সেটা কি খারাপ লক্ষণ?
একটু ডেঞ্জার আছে এখনও। বিকেলে একজন ইউরোলজিস্ট এসে দেখবেন।
ধ্রুব ডাক্তারি শাস্ত্রের কিছুই জানে না। তাই শুধু মাথা নাড়ল।
ছেলেকে দেখবেন না?
ছেলে!—ধ্রুব যেন ঠিক বিশ্বাস করছে না এমনভাবে বলো।
দাঁড়ান, আয়াকে বলছি নিয়ে আসতে।
থাকগে।
থাকবে কেন? বাবা হয়েছেন, দেখুন। খুব সুন্দর বাচ্চা।
ধ্রুব আর জগা গাড়লের মতো পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আয়া একটা বাচ্চাকে নিয়ে আসে। ন্যাকড়ায় জড়ানো একটুখানি রাঙা একটা ইঁদুরছানা। হাতে নম্বরের টিকিট বাঁধা।
ধ্রুব নিস্পৃহ চোখে দেখল।
জগা বলল, চৌধুরীবাড়ির ছেলে দেখলেই চেনা যায়।
কী করে চিনলে?
রং দেখছ না? হাড়ের কাঠামোটাও দেখো। কত বড় হয়েছে দেখেছ? সাড়ে আট পাউন্ড।
ধ্রুব বিশেষ উৎসাহ বোধ করল না এই সংবাদে। সে জানে, এ বাচ্চা সে সৃষ্টি করেনি। তার ভিতর দিয়ে সৃষ্ট হয়েছে মাত্র। মানুষ একটা সূত্র ধরে জন্মায়। সে এই শিশুর জন্মের কারণ, স্রষ্টা নয় সে এর রক্ষণাবেক্ষণকারী, কিন্তু নিয়ন্তা নয়। যেমন কৃষ্ণকান্ত নন ধ্রুবর নিয়ন্তা। কিন্তু কৃষ্ণকান্ত এ তত্ত্ব কি কোনওদিন বুঝবেন?
০৮১. প্রদোষের আলো
“প্রদোষের আলো ম্লান হইয়া আসিয়াছে। আমার ঘরখানিতে কিছু ভৌতিক ছায়া ঘনাইয়া উঠিতেছে। এইসব ছায়া আমার পরিচিত। আমি একা মানুষ বলিয়া এবং একাকী থাকিতে পছন্দ করি বলিয়া নিজের পারিপার্শ্বিককে বড় বেশি অনুভব করি। এইসব ছায়াদের সহিত আমার পরিচয় বহুকালের। কখনও এমন হইয়াছে যে, আমি নির্জনতায় একাকী আমার চারিদিকের ছায়াগুলির মধ্যে একপ্রকার নীরব বাত্ময়তা লক্ষ করিয়াছি। ইহারা যেন কিছু বলিতেছে, কিছু প্রকাশ করিতে চাহিতেছে।
“কিন্তু কী বলিবে? ছায়ারাজ্যের কোন গোপন বার্তা ইহারা আমাকে শুনাইতে চাহে? এক-একদিন আমি এইসব ছায়ার সহিত কিছু ক্রিয়ায় মাতিয়া উঠি। দেরাজের উপর হইতে সেজবাতিটি সরাইয়া আলমারির মাথায় স্থাপন করি। কখনও-বা জানালার তাকের উপর রাখি। এইরূপে ছায়াগুলির রূপান্তর ঘটে, নকশা পালটাইয়া যায়। কখনওবা আমি ছায়াগুলির সহিত কথা কহিবার চেষ্টা করি। কিন্তু ছায়া অলীক, তাহার সত্তা নাই। বস্তু ও আলোর পারস্পরিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল এক প্রতিক্রিয়া মাত্র। এই সত্য জানিয়াও মাঝে মাঝে ওইসব ছায়ার ভিতর আমি পরপারের অস্পষ্ট দর্শন পাইয়া যাই।
“আজও প্রদোষের আলো ম্লানতর হইল। ঘরে এখনও আলো দিয়া যায় নাই। শিয়রে ম্লানমুখী সেই কিশোরী বসিয়া আছে। আজ সে আর কিশোরী নহে। বয়সের হিসাবে সে প্রবীণাই বোধহয়। ত্রিশ ছুঁইয়া তাহার সতেজ শরীরটা যেন তপোক্লিষ্টা উমার মতো। এই বয়সে গৃহবধূরা পুত্রকন্যার জননী এবং ঘোর সংসারী। এই যুবতী অনুঢ়া বলিয়াই বোধহয় সংসারের নানাবিধ গ্লানি ইহাকে স্পর্শ করে নাই। আমার বিশ্বাস, বিবাহ হইলেও ইহার অন্তর অমলিন থাকিত।
“আজ প্রদোষের এই ক্ষীণ আলোয় ইহার মুখের প্রতি চাহিয়া মনে হইল, আমার হৃদয় কতকাল যাবৎ চাতকের মতো তৃষ্ণার্ত ও উর্ধ্বমুখ হইয়া আছে। সুনয়নী আমাকে সন্তান দিয়াছে, সংসার দিয়াছে। আমার দাম্পত্য জীবন বিন্দুমাত্র অসুখের ছিল না। তবু তাহাই সবটুকু নহে। কী যেন অসম্পূর্ণ ছিল। আজ আমার প্রিয় ছায়াগুলির মধ্যে সেও এক অস্পষ্ট রহস্য মাখিয়া আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। রক্তমাংসের অতীত এক শাশ্বত মানবী। পুরুষকে পরিপূর্ণ করিবার অমৃত ভাণ্ডটি তাহার হাতে।
“যে নির্লজ্জ প্রস্তাব তাহার নিকট করিলাম, স্বাভাবিক নিয়মে আমার ন্যায় সংকুচিত রসনার মানুষের পক্ষে তাহা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ঘরের ছায়াগুলি সত্তাহীন অলীক ওই ছায়াগুলি কী এক পরিমণ্ডল রচনা করিয়া দিল। আমার মনে হইল যাহা চাই তাহা আজ এই মুহূর্তে মুখ ফুটিয়া চাহিয়া না লইলে চিরকাল, এমনকী পরজন্মেও আক্ষেপে মাথা কুটিয়া মরিতে হইবে। তৃষ্ণা মিটিবে না।
“সে লজ্জায় অবোবদন হইল। কিন্তু জানি, এই প্রস্তাব তাহার কর্ণে বংশীধ্বনির মতো শুনাইল। সে আর সেই কিশোরী নহে। চঞ্চলমতী, দুঃসাহসী, লজ্জাহীনা সেই কিশোরী প্রতিনিয়ত যেন উপচাইয়া পড়িত। আজ এই যুবতী কিন্তু নিজেকে দুই কূলের মধ্যে বাঁধিয়াছে। তাহার উচ্ছাস নাই, গভীরতা আছে। দুঃসাহস প্রকাশ পাইতেছে প্রগাঢ় দায়িত্বজ্ঞানে। নির্লজ্জতা ঢাকিয়াছে। অন্তঃশীলা স্নেহের স্রোত। ইহাকে আমি কোনওদিনই কামনা করি নাই, তবে চাহিয়াছি। আজ আমি যে বয়স ও যে মানসিকতায় উত্তীর্ণ হইয়াছি তাহাতে দেহগত কামনা আমাকে পীড়া দেয় না। কোনওকালেই দিত না। তাই এই যুবতী যখন কিশোরী ও প্রগ ছিল তখনও আমি ইহাকে কামনা করি নাই।
“সে বলিল, আমরা কি পারব?
কী পারার কথা বলছ?
সব ছেড়ে চলে যেতে হবে, তা জানো?
কেন? সব ছেড়ে যাব কেন?
তোমার ছেলে-মেয়েরা বড় হয়েছে। তারা সব সন্তানের মা বাবা।
সেসব জানি।
আমার বাড়ি থেকেও কথা উঠবে।
কেন উঠবে?
দশ বছর আগে হলে উঠত না। এখন উঠবে।
