শেখে লোকে একদিনেই। তারপর প্র্যাকটিস করে। কাল থেকে বন্দুক এনে নিজে নিজে চালিয়ে।
তার মানে তুমি থাকবে না, না?
আমাকে তোমার আর কীসে দরকার?
বন্দুকেরই বা দরকার কী ছিল?
ছিল না!–অবাক হইয়া বলি, তা হলে শিখলে কেন?
“যুবতী মিটি মিটি হাসিয়া সম্পূর্ণ বেহায়ার মতো বলিল, কদিন যাবৎ খুব বড় হয়েছে তোমার, দেখাই দিতে চাইছ না। তাই অনেক ভেবে ভেবে এই বুদ্ধিটা বের করলাম। ভাবলাম বন্দুক চালানো শিখবার ছল করে লোকটাকে কাছে পাওয়া যাবে। নইলে তো পুরুতের মেয়েকে পাত্তা দেবে না।
“যাহা হউক সুনয়নীর চেয়ে এই যুবতী যে অনেক সাহসী তাহা প্রমাণ হইল। শুধু তাহাই নহে। অনেক নারীর চেয়েই এই যুবতী বহুগুণে সাহসী ও উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারিণী।
“আমার মনে হয়, মেয়েদের মধ্যে এইসব গুণই পুরুষ খোঁজে। রূপমুগ্ধতা বেশিদিন স্থায়ি হয়। পুরুষ মানুষ নারীর উপর নির্ভর করিতে চায়, কিন্তু নির্ভরযোগ্যা নারী বড়ই দুর্লভ। এই যুবতীর মধ্যে আমি এই দুর্লভ জিনিসটির সন্ধান ক্রমে ক্রমে পাইতেছি।
“কোথায় গিয়া আমরা ঠেকিব তাহা জানি না। কিন্তু আমার জীবনের সহিত এই যুবতীর নিগূঢ় সংযোগ আমি অনুভব করিতেছি। একটি চোরাস্রোত আসিয়া আমার জীবনে গোপনে যোগ হইতেছে।
“তুচ্ছ বন্দুকের ভিতর দিয়া আজ সত্যের আর-একটি দিক উদঘাটিত হইতেছে।”
ডায়েরির পাতায় এই বিবরণ হেমকান্ত লিখেছিলেন বেশ কিছুদিন আগে। এই বিবরণ রঙ্গময়ি লুকিয়ে পড়েছে সুনয়নী মারা যাওয়ার পর। পড়ে কেঁদেছে।
আজ হেমকান্ত আর তার মধ্যে সুনয়নী নেই। কিন্তু দুস্তর বাধাও কিছু কম নয়। আছে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে, আছে সংসারের অলিখিত নিয়ম, আছে লোকলজ্জা।
রঙ্গময়ি সন্ধেবেলার দিকে হেমকান্তর ঘরে এল।
কেমন আছ এ বেলা?
হেমকান্ত মুখে উদ্বেগ মেখে বসে ছিলেন। বললেন, রামকান্ত দারোগা এসেছিল জানো?
আমি সব জানি। তোমাকে অত ভাবতে হবে না।
হবে না! লোকটা কী বলে গেল জানো?
জানি। যে তোমাকে ছোরা মেরেছিল সে ধরা পড়েছে।
তাকে নাকি আমি চিনি।
চেনা অস্বাভাবিক নয়। সেও তো এই শহরের লোক।
কিন্তু দারোগা বলছে ইচ্ছে করেই নাকি আমি তাকে চিনতে চাইছি না।
দারোগার সব কথায় বিশ্বাস করতে নেই।
হেমকান্ত চোখ বুজে বললেন, মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছে।
যাওয়ারই কথা। কী ঠিক করলে?
কীসের কী ঠিক করব?
আমি তোমাকে বলেছি না এ জায়গা তোমাকে ছাড়তে হবে।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, এখনই কি?
খুব দেরিও করা চলবে না। পুলিশ, স্বদেশি সবাই পিছনে লাগবে।
কেন যে আমারই এত অশান্তি?
ঘাবড়াচ্ছ কেন? অশান্তি কোনওকালে পোহাওনি বলেই ওরকম মনে হচ্ছে।
আমার চিন্তা কৃষ্ণকে নিয়ে, তোমাকে নিয়ে। দারোগা আর কী বলে গেছে জানো না তো!
জানি না। তবে আন্দাজ করতে পারি। ঠাকুরদালানে তো আর বসে বসে শুধু মাছিই তাড়াই না। পুলিশের স্পাই কেন আসে তাও জানি।
সবই যদি জানো তা হলে কিছু করছ না কেন?
করতেই তো চাইছি। তুমি অন্য কোথাও গেলে সব থিতিয়ে পড়বে।
একেই বলে স্ত্রী বুদ্ধি। দারোগা কৃষ্ণর ওপর নজর রাখছে, তোমাকে সন্দেহ করছে। আমি অন্যত্র গেলে সে সমস্যা মিটবে কী করে?
রঙ্গময়ি চারদিকে চেয়ে কেউ নেই দেখে হেমকান্তর কপালে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, স্ত্রী বুদ্ধি তো কখনও নাওনি৷ নিলে ঠকতে না।
হেমকান্ত উৎসুক ও উদ্বিগ্ন দুই চোখে রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। যেন তাঁর শূন্য হৃদয় একটা আশ্রয় খুঁজছে।
একটু হেসে বললেন, তোমার বুদ্ধি নিই না বুঝি! তা হলে চলছি কী করে?
তা হলে বলল, চলে যাবে এখান থেকে।
যাব। তবে একা নয়।
তার মানে?
যদি যাই তা হলে তোমাকে রেখে যাব না।
রঙ্গময়ি লজ্জায় রাঙা হয়ে বলে, আমাকে কোথায় নেবে?
আমি যেখানে তুমিও সেখানে।
রঙ্গময়ি কিছুক্ষণ অপলক চোখে হেমকান্তর দিকে চেয়ে থেকে বলে, তার মানে জানো?
মানে আবার কী?
আমার মা-বাবা ভাই-বোন সংসার রয়েছে। তোমার সঙ্গে ওভাবে চলে গেলে এরা কেউ আর আমাকে আত্মীয় বলে স্বীকার করবে?
ওরা তোমার কে মনু? আমি ছাড়া তোমার আর কে আছে?
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হেমকান্তর কপালখানা স্নেহভরে ছুঁয়ে থেকে বলল, ভগবান জানেন তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। কিন্তু এতদিন বুঝি তুমিই সেটা জানতে না।
জানতাম। তবে লোলজ্জা ছিল, বাধা ছিল।
০৮০. সে আর সে
সে আর সে। ধ্রুব আর ধ্রুব। না, ধ্রুব একা নয়। কখনওই আর সে সম্পূর্ণ একা নয়। একজন ধ্রুবকে সে চেনে। মোটামুটি স্বাভাবিক আচরণশীল, একটু ভাবুক, খানিকটা প্রথাবিরোধী, সামান্য উদাসীন। কিন্তু এই ধ্রুবর মধ্যে ব্যাখ্যার অতীত কিছু নেই। কিন্তু গত রাতে ধারার ফ্ল্যাটে যে ধ্রুব আচমকা বেরিয়ে এসেছিল তার ভিতর থেকে সে সম্পূর্ণ আলাদা। সে অচেনা। আগন্তুক।
কৃষ্ণকান্ত অপসৃত হওয়ার পর ফাঁকা দরজাটার দিকে বেকুবের মতো তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ধ্রুবর এইসব মনে হল। একটু গা-শিরশির করছিল তার।
আজ ধ্রুব অনেকক্ষণ ঠান্ডা জলে স্নান করল। হ্যাংওভার কাটানোর সবচেয়ে সহজ উপায় ঠেসে খাওয়া। যতখানি সম্ভব আজ পেট পুরে খেয়ে নিল ধ্রুব। অনেকটা স্বাভাবিক বোধ করতে লাগল সে।
নার্সিংহোম-এ যাবে বলে তৈরি হয়ে বসে ছিল সে। এমন সময় চাকর এসে খবর দিল, আপনার টেলিফোন।
ফোন ধরতেই ধারার গলা পাওয়া গেল, ধ্রুব?
একটু কুণ্ঠার সঙ্গে ধ্রুব বলে, হ্যাঁ।
