কী জিনিস?
আমার খুব বন্দুক চালানো শিখতে ইচ্ছে করে।
“চমকিয়া উঠিলাম। এই নির্বোধ স্ত্রীলোক বলে কী? বন্দুক চালনা শিখিবে! বলিলাম, মাথা খারাপ নাকি?
কেন? শিখতে নেই?
শিখে করবে কী?
সে আমি বুঝব। বলো শেখাবে?
এ বুদ্ধি কে দিল তোমাকে?
কেউ দেয়নি। আমি শিখব।
“আমি হাসিতে লাগিলাম। স্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা না থাকিলেও সুনয়নীকে আমি চিনি। তাহার স্বভাবও আমার অজানা নয়। একে ধনীকন্যা বলিয়া আদরে লালিত পালিত হইয়াছে, জমিদারবাড়ির বধূ হইয়া আসিবার পর তাহার গায়ে আর হাওয়া লাগে নাই। বন্দুকের মতো হিংস্র জিনিস ইহার হাতে কল্পনা করিতেও কষ্ট হয়।
হাসছ যে!
হাসবার কথাই তো। তুমি শিখবে বন্দুক! তা হলে সূর্য পশ্চিমে উঠবে।
কেন? এমন কী শক্ত কাজ? মেয়েরা পারে না?
মেয়েরা পারবে না কেন? কিন্তু তুমি তেমন মেয়ে নও।
শিখিয়েই দেখো না পারি কি না!
তোমার কি শিকার করার শখ হয়েছে?
মা গো! আমি বাপু জীবজন্তু মারতে পারব না।
তা হলে শিখে কী করবে? বন্দুক জিনিসটা খুব ভাল নয়।
কেন বলো তো!
“আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিলাম, আমি দেখেছি বন্দুক হাতে নিলেই মনে একটা হিংস্রতা আসে। ছেলেবেলা থেকেই আমার এরকম হত। বড় হয়ে কিছুদিন খুব বন্দুক নিয়ে মাতামাতি করেছি। টিপও খারাপ ছিল না। কিন্তু মনটা কেমন কঠিন হয়ে যাচ্ছিল জীবজন্তু মারতে মারতে। তাই অস্ত্রটা আর ছুঁই না।
তুমি একটা অদ্ভুত মানুষ। বন্দুক হাতে নিলেই বুঝি কাউকে মারতে ইচ্ছে করবে আমার?
“আমি ইতস্তত করিতে লাগিলাম। হয়তো সুনয়নীকে বুঝাইয়া কহিতে পারিলাম না। আর বুঝিবার মতো বুদ্ধিও ইহার নাই। তাই কহিলাম, মেয়েদের অস্ত্রশিক্ষা শাস্ত্রে বারণ।
তোমাকে বলেছে! বারণ হবে তো মা দুর্গার দশ হাতে দশটা করে অস্ত্র থাকত না। মা কালীরও থাকত না।
বাঃ, বুদ্ধিটা তো বেশ খুলেছে দেখছি।
ঠাট্টা করতে হবে না। শেখাবে কি না বলো।
“রাজি হইতে হইল। কারণ সুনয়নী ছাড়িবে না। তবে এ লইয়া দুই তরফে তর্কবিতর্ক কম হয় নাই। অবশেষে সুনয়নী কবুল করিল যে, বন্দুক চালাইবার প্রস্তাব তাহার মাথায় আসে নাই। আসিয়াছে আর-একজনের মাথায়। তাহার প্ররোচনায় সুনয়নী নাচিয়া উঠিয়াছে।
“এই আর-একজন সেই যুবতী। তাহার উল্লেখ মাত্র আমার ধমনীতে রক্তস্রোত কিছু উদ্দাম হইল। বুক গুরুগুরু রবে ডাকিয়া উঠিল। কোনদিন যে এই অবিমৃষ্যকারী যুবতী আমার পাখির বাসা ভাঙিবার জন্য ঝড় তুলিবে! বন্দুক চালনা যে তাহার এক ছুতা তাহা বুঝিতে কষ্ট হইল না। এই ছুতায় সে আমার নিকট নৈকট্য অর্জন করিতে চাহিতেছে। চাই তো আমিও। কিন্তু তাহা উচিত কি?
“একদিন কাছারির পিছনের বাগানে বন্দুক শিক্ষার আয়োজন হইল। একটি টারগেট বোর্ড লাগাইয়া কিছু দূরে বন্দুক শিক্ষার্থীদের জন্য গদি পাতিয়া রীতিমতো শয্যার ব্যবস্থা হইল। কানে পুঁজিবার তুলারও অভাব রাখা হয় নাই। আগের দিন বন্দুকগুলি আমি নিজে পরিষ্কার করিয়াছি।
“প্রথমে দুইজনকেই বন্দুক বস্তুটির সহিত প্রাথমিক পরিচয় করাইয়া দিলাম। সুনয়নীর মুখ তখন শুকাইয়াছে। বলিল, খুব আওয়াজ হয় নাকি?
“আমি বলিলাম, তা একটু হয়।
শুনেছি, বন্দুকের কুঁদো নাকি গুলি ছোড়ার সময় ঘোড়ার মতো লাথি মারে?
আমি হাসিয়া কহিলাম, তা হলে বায়না ধরেছিলে কেন? বন্দুক তা হলে তুলে রেখে দিতে বলি?
না, না। শিখব যখন বলেছি ঠিকই শিখব।
“অনেক ধ্বস্তাধ্বস্তির পর সুনয়নী বন্দুক ছুড়িল বটে, কিন্তু উঃ মাগো! বলিয়া প্রায় মূৰ্ছা যাইবার উপক্রম। সেই যে সে পলাইল আর সেদিন এমুখো হইল না।
“ফলে বাগানে আমি ও সেই যুবতী রহিলাম।
“লক্ষ করিলাম বন্দুকের বিকট শব্দে সে বিশেষ ঘাবড়ায় নাই। চোখ-মুখ স্বাভাবিক। তবে ব্রীড়ার ভাবখানি আছে। আমি একটু হাসিয়া কহিলাম, তুমি কী করবে?
শিখব।
কেন শিখতে চাইছ বলো তো?
তোমাকে বলব কেন?
আমাকে বলবে না তো কাকে বলবে?
বললে তুমি বকবে?
বকার কী আছে?
তুমি তো বকতে ভালবাসে। সব সময়ে কেবল জ্যাঠামশাইয়ের মতো এমন গোমড়া মুখে থাকো যে, দেখলেই ভয় করে।
তুমি আমাকে বিশেষ ভয় পাও বলে তো মনে হয় না।
খুব পাই। তবে ভয় করলে আমার চলবে না বলে জোর করে তোমার সঙ্গে মিশি।
মিশি কথাটা শুনিয়া আমার হাসি পাইল। পাগলি বলে কী? কহিলাম, ভয় করলে চলবে না কেন?
কারণটা কী জানো না?
“আমি ভয় পাইয়া চুপ করিলাম। কারণ ইতিপূর্বে সে নিজেকে আমার স্ত্রী বলিয়া দাবি করিয়াছে। কথাটা আপাতত একটু চাপা পড়িয়াছে। কিন্তু সুযোগ দিলেই আবার দাবি তুলিবে এবং স্ত্রী-বুদ্ধিবশত সেই দাবি লইয়া কুরুক্ষেত্র করিতেও হয়তো পিছাইবে না। আমি তাড়াতাড়ি কহিলাম, আচ্ছা ঠিক আছে। বন্দুকটা হাতে নাও।
“যুবতী বন্দুক হাতে লইল। দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়াইল। এবং আশ্চর্য, প্রথম বারেই চমৎকার ফায়ার করিল।
“কিন্তু কথা তাহা নহে। কথা হইল তাহার নৈকট্য, তাহার দেহগন্ধ, তাহার ভঙ্গিমা আমাকে এমন আন্দোলিত করিতেছিল যে, নিজের মধ্যে এক বেসামাল ভাব টের পাইলাম।
“বেশ কয়েকবার গুলি ছুড়িবার পর সে হাসিয়া আমাকে বলিল, দেখলে তো! আমি তোমার বড়বউয়ের মতো নই।
“কী বলিব। বড়বউ কথাটার মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে— তাহা না বুঝিবার মতো নির্বোধ আমি নহি। কাজেই না-বুঝিবার ভান করিয়া অন্য প্রসঙ্গে গিয়া কহিলাম, তোমার হাত ভাল।
আমি কিন্তু রোজ শিখব।
