আমি কিন্তু আজ এক ফোঁটাও মদ খাইনি, সদানন্দ।
খাননি!–বলে সদানন্দ যেন খুব সতর্ক ভাবে বাতাসটা শোকে। তারপর বলে, তাতেই-বা কী প্রমাণ হয়? আপনি খুন করতে চেয়েছিলেন?
প্রাইমা ফেসি কেস তো তাই!
জিপের সামনে বসা দুজনের একজন মুখ ফিরিয়ে বলে, আপনি তো বলেছিলেন ইট ওয়াজ এ ফান।
তাও বটে।
তা হলে আবার কী? আমরা ভদ্রমহিলাকে কাল বুঝিয়ে দেব ইট ওয়াজ রিয়েলি ফান। আর কিছু নয়।
ধ্রুব একটু চুপ করে থেকে সদানন্দকে চাপা স্বরে বলে, আমাকে লক-আপে নিয়ে চলো।
সে কী?
নিয়ে চলো, সদানন্দ। ধারা যে কমপ্লেন করেছে তা অনেকটা সত্যি।
রাখুন তো দাদা। ওসব মেয়েছেলেকে আমরা চিনি। দুবার ডিভোর্স করেছে, ছেলেছোকরাকে নাচিয়ে বেড়ায়। ওসব আমরা জানি।
ডিভোর্সের খবর জানলে কী করে?
বাঃ, এতক্ষণ ধরে তদন্ত করতে হল না?
লোকজন জমেছিল?
দু-চারজন। ও নিয়ে ভাববেন না। সাক্ষী কেউ দেবে না।
কেসটা হাস-আপ করবে, সদানন্দ?
কেই নয় তার আবার হাস আপ! এটা কেস নাকি? যেসব মেয়েছেলের পিছনে চোদ্দোটা পুরুষ ঘোরে তাদের ওরকম কেস দু-চারটে হয়ই। আপনি এর সঙ্গে আর মিশবেন না।
লবণহ্রদ ছাড়িয়ে জিপ বেলেঘাটা পেরোচ্ছে। নির্জন রাস্তাঘাট।
কটা বাজল বলো তো, সদানন্দ।
সাড়ে বারোটা।
বাকি রাস্তাটা ধ্রুব চুপচাপই রইল। শুধু সদানন্দর নানা কথার জবাবে হুঁ হাঁ করে ঠেকা দিয়ে গেল।
খুব নিরাপদে এবং ঘটনাহীন ভাবেই বাড়ি পৌঁছে যায় ধ্রুব। ডাইনিং হল-এ ঢুকে ঢাকা-দেওয়া খাবার গোগ্রাসে খায় সে। তারপর ঘরে এসে সিগারেট ধরায়।
বড় ভয় করছে তার। একা ঘরে ততটা ভয় হত না। আজ তারা দুজন। সে আর সে। ধ্রুব আর ধ্রুব।
উঠে আলমারি খুলে হুইস্কি বের করে ধ্রুব। তারপর অন্তহীন জলস্রোতে ভেসে যেতে থাকে। একসময়ে বোতল এবং সে একই সঙ্গে গড়িয়ে পড়ে মেঝেয়। অচেতন অবস্থায় রাত কেটে যায়।
ধ্রুবর ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়, তীব্র মাথার যন্ত্রণা, পেটে গোলান, মুখ তিক্ত কষায় শুষ্কতায় ভরা। চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে।
কে যেন ডাকছে, ধ্রুব, ধ্রুব!
কে?
আমি।
গলার স্বরটা চিনতে পারে ধ্রুব। ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো উঠে বসে মেঝের ওপর। দরজায় কৃষ্ণকান্ত দাঁড়িয়ে।
কিছু বলছেন?
বলছিলাম তৈরি হয়ে একবার নার্সিংহোম-এ যাও।
যাচ্ছি।
বউমা আর বাচ্চা ভালই আছে। চিন্তা নেই। তোমার একবার যাওয়া কর্তব্য বলে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।
ধ্রুব উঠল। টলে পড়ে যেতে যেতে দাঁড়াল।
কৃষ্ণকান্ত চলে গেছেন। তবু ফাঁকা দরজাটার দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে থাকে সে। গত দুমাসের মধ্যে বোধহয় এই প্রথম তার সঙ্গে কথা বললেন কৃষ্ণকান্ত।
কিন্তু কেন বললেন? ব্যাপারটা কী?
০৭৯. আবার সেই কিশোরী
“আবার সেই কিশোরী। কিন্তু এখন তাহাকে আর কিশোরী বলি কী করিয়া? বয়সের এক নূতন ঋতু আসিয়া তাহাকে যেন পত্রে পুষ্পে ফলভারে অপরূপ সাজে সাজাইয়াছে।
“কিশোরী যে সুন্দরী তাহা বলা যায় না। কিন্তু সৌন্দর্যের সংজ্ঞা কী তাহাও তত খুঁজিয়া বা বুঝিয়া পাইলাম না। শাস্ত্রোক্ত সৌন্দর্য লক্ষণের সহিত যাহার বিন্দুমাত্র মিল নাই সেও এমন এক আকর্ষণে বরণীয়া হইয়া উঠে যাহার ব্যাখ্যা হয় না। ক্ষীণ কটি, উন্নত বক্ষ, গুরু নিতম্ব, পর্ক বিদাধর বা হরিণ-নয়নের যতই প্রশংসা থাকুক, এ সকল যাহার নাই সেও অন্য কারণে যে সৌন্দর্যের লহর তুলিতে পারে এই কিশোরীই তাহার প্রমাণ।
“কী দিয়া ইহার সেই রূপের বর্ণনা করিব? আমার ভাষাজ্ঞান বা বর্ণনাশক্তি তেমন নাই। শুধু বলিতে পারি এই যুবতীর মধ্যে একটি বুদ্ধির দ্যুতি আছে, যাহা সচরাচর মহিলাকুলে দেখিতে পাওয়া যায় না। দীর্ঘ শরীর, মেদবর্জিত মজবুত গঠন, কাঠামোতে কোমলতার কিছু অভাব আছে বটে, কিন্তু মুখখানা কেহ যেন নরুনে চাছিয়া কুঁদিয়া তুলিয়াছে। ইহার গায়ের রং তাম্রাভ। গৌরী নহে বলিয়া ইহার অগৌরবের কিছু নাই। যুবতীর গাত্রবর্ণ নূতন তামার পয়সার মতোই উজ্জ্বল।
“এই বয়সে মেয়েদের কটাক্ষ করিবার প্রবণতা থাকে। এই যুবতী চোখের সেই কটাক্ষ দিয়া অনায়াসে পুরুষচিত্ত জয় করিতে পারে। সচ্চিদানন্দ তো চোখ দেখিয়াই মজিয়াছে। কিন্তু আশ্চর্য এই, যুবতী তাহার এই একাগ্নী বাণ কদাচিৎ প্রয়োগ করে।
“মাঝখানে কিছুদিন বিষয়কর্মে কিছু ব্যস্ত হইয়া পড়ায় এবং সকালে ঘুরিয়া বেড়ানোর ফলে সাক্ষাৎ বিশেষ হয় নাই। একদিন শীতকালে সন্ধ্যাবেলা বসিয়া রবিবাবুর একটি কাব্য পাঠ করিতেছি এমন সময় সুনয়নী আসিয়া নিকটে এক মোড়া টানিয়া বসিল। আমি আড়চোখে তাহাকে দেখিয়া মনে মনে কিছু সন্ত্রস্ত হইলাম। স্ত্রীলোকদিগের বিশেষ করিয়া সংসারী স্ত্রীলোকদিগের স্বামীর সহিত বিশেষ কোনও প্রয়োজন কদাচিৎ দেখা দেয়। সর্বদা নৈকট্য ও বাক্যালাপ হেতু সুনয়নীর সহিত আমার নূতন করিয়া কোনও প্রয়োজন দেখা দেয় না। কিন্তু স্ত্রীলোকরা স্বামীকে অন্যমনস্ক থাকিতে দিতে চায় না। কী জানি হয়তো ভাবে, স্বামী অন্যমনস্ক বা কর্মব্যস্ত থাকিলে তাহার উপর অধিকার কমিয়া যায়।
“সুনয়নী একটা এমব্রয়ডারি হাতে নিয়া কিছুক্ষণ সেলাই মকশো করিল। তারপর দাঁত দিয়া একটি সুতা কাটিয়া বলিল, বাব্বাঃ, যা কঠিন ডিজাইন।
“আমি ইহার জবাব দিলাম না।
“সুনয়নী উসখুস করিতে লাগিল। তারপর বলিল, শুনছ?
শুনছি।
একটা কথা।
বলো। রাগ করবে না তো?
না।
একটা জিনিস শিখিয়ে দেবে?
