আমি ওসব কথা বুঝতে চাই না। প্লিজ! যাও।
ধ্রুব উঠল। নেমে এল রাস্তায়।
অনেক রাত হয়েছে। লবণহ্রদ এলাকায় যানবাহন নেই। সে রাস্তাও ভাল চেনে না। হাঁটাপথ কোথা দিয়ে কোথায় চলে গেছে। উদোম, বিশাল এক জায়গা। ছড়ানো ছিটোনো ঝুঁ-চকচকে নতুন সব বাড়ি।
কিছুদুর চেনা পথে গিয়ে আচমকা পথের নিশানা হারিয়ে ফেলে সে। কিন্তু চিন্তিত হয় না। আজ সে বড় অন্যমনস্ক। বড় অন্যরকম।
হাঁটতে হাঁটতে ধ্রুব বেশ কিছুদূর চলে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়ায়। লোকবসতি প্রায় শেষ। সামনে প্রান্তরের মতো কিছু অন্ধকারে ভয়াল ও বিশাল হয়ে আছে।
শহুরে ধ্রুব একবার পা বাড়িয়েও টেনে নেয়। অচেনাকে আজ তার ভয় করে। তার ভিতরে যে একজন হত্যাকারী আছে তা অনেকদিন ধরে জানে ধ্রুব। কিন্তু সেই হত্যাকারীর অস্তিত্ব সম্পর্কে এত নিঃসংশয় ছিল না সে। আজ হল।
পিছনে রাস্তার শেষ আলোটি জ্বলছে। তার ছায়া প্রলম্বিত হয়ে সামনে প্রান্তরের অন্ধকারে গিয়ে মিশে গেছে। ভৌতিক সেই ছায়ার দিকে ধ্রুব অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে। কিছু মনে হয়, একটু ভয়-ভয় করে। কেমন যেন নিজেকে অবিশ্বাস হতে থাকে, নিজের সঙ্গে সহবাস করতে অস্বস্তি হয়।
ধ্রুব ফেরে এবং ফের হাঁটতে থাকে। শরীর ক্লান্ত, ঘুম পাচ্ছে, খিদেয় জ্বলে যাচ্ছে পেট। সেই ব্যথাটা ধীরে ধীরে চাগাড় দিচ্ছে।
আচমকাই দুটো হেডলাইট তাকে ঝলসে দেয়। ধ্রুব চোখ আড়াল করে দাঁড়ায়। তারপর হাত তোলে, রোখকে!
গাড়িটা পার্ক করাই ছিল। পুলিশের একটা জিপ। দুজন লোক নেমে এগিয়ে আসে। খুব শ্লথ এবং সতর্ক ভঙ্গি।
ধ্রুব চৌধুরী না? উই মিট এগেন।
ধ্রুব দেখতে পায়, একজন ইন্সপেক্টর বা ওইজাতীয় লোক। মুখটা চেনা। সে বলল, রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি।
আপনি তো প্রায়ই বাস্তা হারান। কিন্তু এখানকার গভর্নমেন্ট হাউসিং এস্টেটের এক মহিলাকে খুন করার চেষ্টা করেছিলেন বলে থানায় একটা টেলিফোন গেছে। কী ব্যাপার বলুন তো!
টেলিফোন! বলে ধ্রুব অবাক হয়। ধারার টেলিফোন নেই। যদি করে থাকে তবে অন্য কারও ফ্ল্যাট থেকে। সেক্ষেত্রে খবরটা ধারা গোপন রাখেনি বলেই ধরে নিতে হবে।
সে বলল, কী করবেন? অ্যারেস্ট?
উপায় কী?
তা হলে চলুন।
আপনি জিপে উঠে বসুন। আমাদের লোক ভদ্রমহিলার স্টেটমেন্ট আনতে গেছে। এলে আমরা রওনা হব।
ধ্রুব আপত্তি করে না। পুলিশের জিপ একটি চমৎকার নিরাপদ আশ্রয়। সে ঠিক যথাস্থানে পৌঁছে যাবে। ঘটনাগুলো সে স্পষ্টই অনুমান করতে পারে। তাকে থানায় নিয়েই পুলিশ কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীকে ফোন করবে। কিছু সাংকেতিক বা আধা-সাংকেতিক কথা হবে তাদের। তারপর পুলিশ সামান্য একটু আদর মেশানো শাসন করে নিজেদের গাড়িতে করে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে।
ধ্রুব জিপগাড়িতে উঠে বসল। চোখ বুজে মৃদু হেসে আপনমনে বলল, ধারা, তুমি পারবে না। সহজাত কবচ কুণ্ডল নিয়ে জন্মেছি আমি! আমি অবধ্য, অপরাজেয়।
কতক্ষণ বসে মশার কামড় খেতে খেতে ঢুলেছে ধ্রুব, তা খেয়াল নেই। আচমকা একটা হাত তার কাধ ধরে কাঁকাল। ধ্রুবদা! এই ধ্রুবদা!
কে?–ধ্রুব চোখ মেলে।
আরে আমি। আমি সদানন্দ।
সদানন্দকে চেনে ধ্রুব। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর। কৃষ্ণকান্ত একে চাকরি করে দেন। সদানন্দ ধ্রুবর পাশে উঠে বসে বলে, কী করেছিলেন বলুন তো! ভদ্রমহিলা সাংঘাতিক আপসেট।
ধ্রুব জবাব দেয় না। চারদিকে চেয়ে দেখে। ধারার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বহু দূর চলে গিয়েছিল সে। আবার কী করে যে ফিরে এল।
ধ্রুব সদানন্দর মুখের দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, মেয়েটা কী স্টেটমেন্ট দিল?
সে সাংঘাতিক। অ্যাটেম্পটেড মার্ডার।
তা হলে ও বেঁচে আছে কী করে?
সেটা পয়েন্ট নয়। পয়েন্ট হল, কী হয়েছিল তা উনি জানেন না।
তা হলে?
আমিও জানতে চাই কী হয়েছিল! বলবেন?
ধ্রুব একটা হাই তুলে বলে, আমিই কি জানি! না জানলে বলবটা কী?
গলা টিপে ধরেছিলেন নাকি?
ধরেছিলাম। তবে মারার জন্য নয়। জাস্ট ফান।
মহিলা কে হন আপনার?
ধ্রুব একটু চুপ করে থেকে বলে, বন্ধু।
কতদিনের চেনা?
জেরা করছ নাকি সদানন্দ?
আরে না। কেস তো ডিসমিস হয়েই গেছে। আপনার কেস কি টেকে! তবে মার্ডার হয়ে গেলে একটু ঝঞাট ছিল। মেয়েটা কি হাফ-গেরস্ত?
তা নয়। এমনিতে শি ইজ গুড। হাই কানেকশনস। তবে একটু অ্যাডভেনচারাস টাইপের।
বুঝেছি। সুশীল, কী করছ! গাড়ি ছাড়ো।
দুজন রাস্তার ধারে পেচ্ছাপ করতে করতে গল্প করছিল। ডাক শুনে প্যান্টের চেন টানতে টানতে এসে জিপে উঠল।
তাদের একজন বলল, আসামী তো ধরা পড়েছে। এবার কী করবেন, সদানন্দদা?
সোজা কালীঘাট চলো। বাড়িতে পৌঁছে দিই আগে।
গাড়ি চলতে লাগল।
সদানন্দ ধ্রুবর দিকে ফিরে বলল, বাড়ি গিয়ে একটা ট্রাংকুলাইজার খেয়ে শুয়ে পড়ুন।
তোমরা কেসটা নেবে না, সদানন্দ?
কীসের কেস?
এই ধারা যে নালিশ করল।
সদানন্দ হেসে ওঠে, নিয়েছি তো। কেস নেব না কেন?
বাজে বোকো না। কেস নিলে আমাকে তোমার অ্যারেস্ট করা উচিত।
করেছি তো। ফর্মালিটি মেইনটেনড টু দি লাস্ট। এই তো আপনাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু লক-আপে নিচ্ছ না।
লক-আপ সকলের জন্য নয়। আপনার লক-আপ লাগবে না।
কেন লাগবে না?
যেহেতু আপনি পালাবেন না।
কে যদি ওঠে এবং আমাকে যদি খুঁজে না পাও?
সদানন্দ খুব হাসে। তারপর বলে, সাত মন ঘিও পুড়বে না দাদা, রাধাও নাচবে না।
তার মানে?
বাড়ি গিয়ে আগে ঘুমোন তো! কাল আমি বিকেলের দিকে গিয়ে দেখা করবখন। তখন কথা হবে।
