একটু এলিয়ে পড়ছিল ধারার শরীর। হাঁটুর কাছ থেকে ভাঙছিল। ধ্রুব এই পর্যন্ত দেখল। তারপর প্রশ্ন করল নিজেকে, কেন? ওকে মেরে কী হবে তোমার?
নিজেই জবাব দিল, কিছুই কি নয়? দেখা যাক, আমার ভিতরে কোনও বিস্ফোরণ ঘটে কি না।
কীসের বিস্ফোরণ? তোমার বারুদ ভিজে গেছে কবে! শত স্ফুলিঙ্গও আর বিস্ফোরণ ঘটাবে না।
দেখা যাক। কিছু করা তো হবে। একটা অন্যরকম কিছু, যা রোজকার কৃতকর্মের মতো নয়। যা অন্যরকম।
ফাঁসির দড়ি আছে। আছে যাবজ্জীবন গরাদের ভিতরে থাকার কষ্ট। কিংবা ছদ্মবেশে পালিয়ে বেড়ানো। ভয় নেই?
ভয়ই তো দরকার। আমার জীবন যে বড় নিরাপদ, বড় ঘটনাহীন। আমার প্রায় সব পথই নির্বিঘ্ন করে রেখেছে আমার জন্মদাতা। তার সব ক্ষমতা প্রয়োগ করে আমাকে দীপশিখার মতো আড়াল করতে চেষ্টা করছে। আমি সেই সিকিউরিটি ভেঙে দেব। দিই?
শুধু নিজের কথা ভেবে ওকে মারবে? তোমার জীবনে ওর ভূমিকা কতটুকু? এ তো তোমার দর্শন নয়।
নয়? আমার দর্শন বলতে আছেই বা কী? আমার ভিতরে এক চিরঘুমন্ত আমি। কিছুতেই তাকে জাগাতে পারছি না যে! কতবার চেষ্টা করেছি। হেরে যাচ্ছি। কী যে করতে চাই কিছুই জানি না। অস্থিরতা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। মনে হয় খুব মহৎ কিছু হওয়ার কথা ছিল আমার। এই দ্বন্দ্বে আমি বারবাব মাতাল বা লম্পট হওয়ার চেষ্টা করেছি। হতে পারিনি তো তাও।
ধারাকে খুন করে কি কিছু হতে পারবে?
ওকে খুন করার পিছনে আমার কোনও মোটিভ নেই। অকারণ এই হত্যা সংঘটিত হলে আমার একসময় না একসময় অনুতাপ আসবে। আসবেই। তীব্র সেই অনুতাপের দহনে যদি দপ করে জ্বলে উঠতে পারি কখনও!
কোনওদিন ওইভাবে হিসেব করে তো জাগেনি মানুষ। ঘৃণা থেকে যা জাগে তা তীব্রতর ঘৃণাই। হননেচ্ছা থেকে আরও তীব্রতর হননেচ্ছা জন্ম নেয়। মৃত্যু কত সহজ দেখছ না? পদ্মপাতায় জলের মতো টলমল করে এই দেহের ভিতরে প্রাণবিন্দু। একটুতেই খসে যায়। মেরো না। মেরো না। পারো তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত করো। মা ম্রিয়স্থ। মা জহি। শক্যতে চেৎ মৃত্যুমবলোপয়ঃ।
বড় ক্লান্তি লাগল ধ্ৰুবর। একটি মৃত্যুর পর আছে দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া। অত প্রতিক্রিয়া সে সামলাতে পারবে না। সামলাবে তার বাবা কৃষ্ণকান্ত। সেটাও ভারী অপমানকর হবে। লোপাট করা হবে প্রমাণ এবং সাক্ষীসাবুদ। দাঁড় করানো হবে মিথ্যা সাক্ষী। রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হবে। প্রচ্ছন্ন হুমকিতে কেঁপে যাবে বিচারকের রায় লেখা হাত। ধারার হত্যাকারী কিছুতেই ধরা পড়বে না। তার ধরা পড়তে নেই।
ধ্রুব খুব ধীরে হাত দুটো সরিয়ে নেয়।
ধারার জ্ঞান ছিল না বললেই হয়। একটা মৃদু গোঙানির শব্দ করে এবং প্রকাণ্ড শ্বাস ফেলে সে পড়ে গেল মেঝেয়। ফাঁকা ঘরে পতনের শব্দটা হল ভীষণ।
ধ্রুব হার্স্ট-এইড জানে না। কিন্তু একটুও না ঘাবড়ে সে হাঁটু গেড়ে বসে নিচু হয়ে ধারার মুখে মুখ দিয়ে প্রাণপণে বাতাস টেনে আবার তা সঞ্চারিত করতে থাকল ভিতরে। অনেকক্ষণ ধরে। প্রচণ্ড পরিশ্রমে তার ঘাম হতে লাগল। এক ফাঁকে উঠে গিয়ে সে পাখাটা চালিয়ে দিয়ে এল ফুলম্পিডে। বাথরুম থেকে জল এনে মুখে ঝাপটা দিল কয়েকবার।
আধঘণ্টা বাদে বিভ্রান্ত, কম্পমান, দুর্বল ধারা উঠে বসতে পারল। প্রচণ্ড কাশছে, কাঁদছে। তার। মুখের লালা আর চোখের জল এক হয়ে যাচ্ছে। একটিও কথা নেই মুখে। শুধু হিকার মতো শব্দ উঠে আসছে বুক থেকে। তা কান্নাও হতে পারে বা অবরুদ্ধ খাস।
ধ্রুব পালাল না। বসে রইল মুখোমুখি। পাথরের মতো চুপ।
আরও অনেকক্ষণ বাদে, যখন সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলল ধ্রুব, ধারা ভাঙা গলায় বলল, কী চেয়েছিলে তুমি? মারতে?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু পারলাম না।
কিন্তু কেন? তুমি কি পাগল?
ধ্রুব মাথা নাড়ল, বোধহয়। আমাকে বিশ্বাস করা তোমার ঠিক হবে না, ধারা।
ধারার চোখে আতঙ্ক, ঘৃণা, বিদ্বেষ। ধ্রুবর দিকে একদৃষ্টে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, আমার কোনও সিকিউরিটি নেই, পুরুষ সঙ্গী নেই, তাই?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, না।
থাকলে সাহস করতে?
করতাম। কিন্তু ও কথা কেন? আমি তো পারিনি দেখছই!
পারোনি! কে বলল পারোনি। জাস্ট নাউ ইউ হ্যাভ কিলড সামথিং ইন মি। আমি আর সেই আগের মানুষটা নেই। জানো সেটা?
ধ্রুবর ভিতরে প্রতিক্রিয়াটা শুরু হল এখন, এই মুহূর্তে। নিজের ভিতরে একটা কাঁপুনি টের পাচ্ছিল সে। ভারী অবশ লাগছে শরীর। শরীরের ভিতরে একটা যন্ত্রণার মতোও কিছু টের পাচ্ছে সে। মাথাটা ঘোলাটে। সে একজন মানুষকে অল্পের জন্য খুন করতে করতে বেঁচে গেছে।
ধ্রুব একটু হাসবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলে, তুমি আমাকে অফারটা দিয়েছিলে।
ধারা নিজের মুখটা দুহাতে চেপে ধরে যেন অবিশ্বাস ভরে মাথাটা নাড়ে। বলে, আমি যে বিশ্বাস করতে পারছি না। উঃ। তোমাকে ঠাট্টা কবে কী বলেছি আর তুমি সত্যিই তা করবে?
চেষ্টা করে দেখলাম পারা যায় কি না।
তুমি যাও। প্লিজ! তুমি চলে যাও।
আর আসব না তো?
না। আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছি না। আর-একটু হলেই তুমি আমাকে মেরে ফেলতে! উঃ।
ধ্রুব তার শুকনো ঠোঁট জিব দিয়ে ভেজানোর চেষ্টা করল। পারল না। তার জিবও খড়ের মতো শুকনো। মৃদু স্বরে সে বলল, মেরে ফেলতাম ঠিকই। কিন্তু তবু তোমাকে বাঁচাল কে বলল তো!
কে বাঁচাল? কী বলতে চাও?
তোমাকে যে মারতে চেয়েছিল সেও ধ্রুব, যে বাঁচাল সেও ধ্রুব।
