রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, না।
কৃষ্ণকান্ত গম্ভীর মুখে চুপ করে থাকে। যে ধরা পড়েছে সে কি সত্যিই স্বদেশি? কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না তার। স্বদেশিদের সে মনে-প্রাণে ভালবাসে।
রঙ্গময়ি খুব আলতো একটা হাত নরম করে তার পিঠে রেখে বলে, কী অত ভাবছিস? পুলিশের কথা অত বিশ্বাস করতে নেই। যে ধরা পড়েছে তার সঙ্গে হয়তো ঘটনার কোনও সম্পর্কই পাওয়া যাবে না।
কৃষ্ণকান্ত বলল, রামকান্ত রায় বাবাকে দেখতে পারে না কেন বলো তো?
ও ওইরকম। আমাকেও দেখতে পারে না। তোকেও না।
কৃষ্ণকান্ত চমকে উঠে বলে, কী করে বুঝলে?
আমার কাছে খবর আসে।
আমরা কী করেছি যে দেখতে পারে না?
রঙ্গময়ি একটু হাসে। বলে, কত কী করেছি। তোতে আমাতে মিলে ইংরেজ রাজত্বটার ভিতটাই নাড়িয়ে দিয়েছি বোধহয়। তাই ওর অত মাথাব্যথা।
সত্যি বলছ, পিসি?
সত্যিই বলছি। আমার মনে হয় তোর এখন কলকাতায় গিয়ে কিছুদিন থাকা দরকার।
কেন পুলিশ কি আমাকে ধরবে?
না ধরলেও জ্বালাতন করবে। নজর রাখবে।
তা হলে তুমি কী করবে?
আমার আর কী করার আছে?
তোমাকেও তো জ্বালাতন করবে।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, করে করুক। আমি কোথাও যাব না।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলে, তা হলে আমিও যাব না।
রঙ্গময়ি একথাটার কোনও জবাব দেয় না। চুপচাপ বসে থাকে। তার স্নেহময় হাতখানা ধীরে ধীরে কৃষ্ণকান্তর মাথায় গভীর চুলের মধ্যে বিলি কেটে দেয়। অনেকক্ষণ বাদে সে বলে, দাদা বউদিরা সব এসেছে, তাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথাটথা বলিস তো? না কি মুখচোরার মতো পালিয়ে বেড়াস!
কৃষ্ণকান্ত একটু লাজুক হেসে বলে, ওরা সব কেমন যেন! কেবল সংসারী কথাবার্তা বলে। আর কেবল এক কথা, কত বড় হয়েছিস! কী সুন্দর হয়েছিস! আমার ওসব ভাল লাগে না।
রঙ্গময়ি হাসে। বলে, সংসারী মানুষ সংসারের কথা বলবে না তো কী বলবে? একটু মিশিস ওদের সঙ্গে, নইলে নিলে হবে। দুঃখ পাবে ওরা।
কৃষ্ণকান্ত চুপ করে থাকে।
রঙ্গময়ি খুব নিচু স্বরে বলে, তোর ঘর থেকে একটা জিনিস আমি চুরি করেছি।
কৃষ্ণকান্ত একটু চমকে উঠে বলে, কী জিনিস?
যেটা তুই তোর বাবার চেস্ট অফ ড্রয়ার্স থেকে চুরি করেছিলি।
কৃষ্ণকান্ত রঙ্গময়ির মুখের দিকে চেয়ে বলে, পিস্তল?
রঙ্গময়ি একটু বিষঃ হেসে বলে, বোকা কোথাকার! ও দিয়ে তুই কী করবি বল তো!
কেন নিলে? আমার যে ওটা দরকার।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে দৃঢ় গলায় বলে, না, ওটার তোমার কোনও দরকার নেই।
কেন নেই, পিসি?
এই বয়সে ওসব অস্ত্র কাছে রাখতে নেই। কখন পুলিশ বাড়ি সার্চ করে তারও ঠিক নেই।
কৃষ্ণকান্ত একটা শীতলতা অনুভব করে। পুলিশ আসা বিচিত্র কিছু নয়। আসতেই পারে। সে জিজ্ঞেস করে, কী করেছ ওটা নিয়ে?
ঢুকিয়ে রেখেছি। ভয় নেই।
ওটার গুলি ছিল না।
জানি। আমি খুলে দেখে নিয়েছি।
তুমি পিস্তল খুলতে পারো?
কেন পারব না?
কে তোমাকে শেখাল?
কেন? তোর বাবা!
বাবা!
তোর বাবাকে আমি কি কম জ্বালিয়েছি?
বাবা তো নিজেই বন্দুক-পিস্তল উঁত না!
কে বলল ছুঁত না! পছন্দ করত না ঠিকই। কিন্তু বন্দুক চালাতে পারত ভালই। তিন ভাই-ই পারত। চোর ডাকাতের ভয় আছে না জমিদারদের। তাই শিখে রাখতে হত।
কী করে শেখাল? তুমি বায়না ধরেছিলে?
রঙ্গময়ির চোখ চিকচিক করে উঠল সুখস্মৃতিতে। একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি অন্য একটা বুদ্ধি খাটিয়েছিলাম। তোর বাবাকে কিছু বলিনি। ধরেছিলাম সুনয়নীকে।
মা! মাকে ধরলে কেন?
ওই তো মজা। আমি বললে যদি অন্য কিছু মনে করে! তাই তোর মাকে ধরে পড়লাম। বললাম, তোমার কর্তাকে বলো আমাদের বন্দুক চালানো শেখাতে। তোর মা তো শুনে ভিরমি খায় আর কী! মেয়েমানুষ আবার কবে বন্দুক-পিস্তল চালায়! কিছুতেই রাজি হয় না।
তারপর কী হল?
আমিও ছাড়িনি। বলে বলে মাথাটা খারাপ করলাম। তারপর সুনয়নী তোর বাবাকে গিয়ে একদিন ধরল, আমাদের বন্দুক চালানো শেখাও। শুনে তোর বাবার কী রাগ!
রাগল কেন?
ওই যে পুরুতের মেয়ে বুদ্ধি দিয়ে তার বউয়ের মাথাটা বিগড়েছে সেই জন্য। আমাকে ডেকে পাঠিয়ে খুব বকাঝকা করেছিল। কিন্তু সুনয়নী তো সোজা পাত্রী নয়। দারুণ জেদি। শেষে একদিন তোর বাবা আমাদের নিয়ে পিছনের বাগানটায় চাঁদমারি শুরু করল।
মা পেরেছিল?
রঙ্গময়ি খিলখিল করে হেসে বলে, একটুও না। বন্দুকের প্রথম শব্দটা শুনেই পালিয়ে যায়।
তোমার ভয় করেনি?
না। তবে লজ্জা করছিল।
কেন? লজ্জা কীসের?
সে তুই বুঝবি না। কিন্তু প্রথম দিনেই আমি দারুণ শিখে নিই। পরে সুনয়নীও শিখেছিল একটু। কানে তুলো দিয়ে, কাঁধে কাপড় জড়িয়ে অনেক কসরৎ করে শিখতে হয়েছিল তাকে।
শিখতে গেলে কেন বলো তোর!
সে কি আর এক কথায় বলা যায়! জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই ঘটনার কথা খুব ভাবতাম। ক্ষুদিরামের ফাঁসি। এসব মনে করে করে কেন যেন একদিন বন্দুক চালানোর ইচ্ছে হয়েছিল। মনে হল, শিখে রাখি, পরে হয়তো কাজে লাগবে।
» ০৭৮. একটা হত্যাকাণ্ড এবং মৃত্যু
কত সহজভাবে একটা হত্যাকাণ্ড এবং মৃত্যু সংঘটিত হতে পারে! কত সহজ! কত সামান্য শারীরিক আয়াস! আর সামান্য একটু ইচ্ছা।
ধারা একবারও নিজেকে সরিয়ে নেয়নি। একটুও চেষ্টা করেনি ধ্রুবর হাত ছাড়িয়ে দিতে। যেন বা খেলাচ্ছলে মৃত্যু তার আকাঙিক্ষত।
কিন্তু ধ্রুব কেন মারবে ধারাকে? তার ইচ্ছাশক্তির যে তেমন জোর নেই। তার আঙুলগুলো বাঁকা হয়ে বসেছিল ধারার গলায়, কিন্তু ততদূর কঠিন হতে পারেনি। দুহাতের ভিতর সে অনুভব করল ধারার শ্বাসের কম্পন, রক্তের মৃদু সঞ্চালন, কণ্ঠমণির ওঠাপড়া। ধারার দুই চোখ তার চোখে নিবদ্ধ। গলার সামান্য চাপে চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। মুখখানা একটা অতিরিক্ত ফোলানো লাল টুকটুকে বেলুন। মুখখানা সামান্য হাঁ। জিব কাঁপছে। বার দুই খঃ খঃ শব্দ করল ধারা। ভাষাহীন এক রুদ্ধ আর্তনাদ।
