ধ্রুব অবশ্য ভিতরে গেল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। জগা দৃশ্যটা দাঁড়িয়ে দেখে আস্তে আস্তে ভিতরে চলে গেল। লালটু এগিয়ে গেল পেট্রল পাম্পটার কাছাকাছি। পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগল।
রক্তের শুদ্ধতা সম্পর্কে তার শুচিবায়ু নেই। ওটা কাকার বাতিক ঠিকই। কিন্তু লালটু জানে তাদের পরিবারে আজ অবধি বেচাল কিছু হয়নি। নিজেদের বংশ সম্পর্কে তাদের গৌরব এখন হয়তো বৃথা, কিন্তু এটাও ঠিক গৌরব করার মতো বংশ খুব বেশি লোক পায় না। তারা ভাগ্যক্রমে পেয়েছে। ব্যতিক্রম অবশ্য ধ্রুব। একমাত্র ধ্রুব।
আড়চোখে চেয়ে লালটু দেখে, রেমির ভাই আর-একটু দূরে সরে গিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে আবার সিগারেট ধরিয়েছে। একটা ট্যাকসি বাঁক নিল। তার হেডলাইটের আলোয় রেমির ভাইয়ের সাদা এবং দাড়িওলা মুখটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্পষ্ট দেখা গেল।
চোখ বাঁচাতে মুখ নামিয়ে নিল ছেলেটা।
ট্যাকসি থেমেছে। তাদেরই লোক। লালটু এগোল। তার অনুমান ঠিক। ট্যাকসি থেকে একে একে নেমে আসছে শচীন, অলক, মৃদুল, জয়িতা, শান্তনু আর পৃথা। ছোটকাকার গোষ্ঠী বা ক্ল্যান। আরও আসবে। আত্মীয়রাই তো শুধু নয়, ছোটকাকার বিশাল পরিচিতির জগৎ। রাজনৈতিক দলের লোকেরা আছে। প্রভাবশালী বন্ধুবান্ধব আছে। চামচা আছে। একটু বাদেই নার্সিংহোম হয়তোবা জনসমুদ্রে পরিণত হবে।
পায়ে পায়ে আবার লাউঞ্জে ফিরে আসছিল লালটু। হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল, ধ্রুব তার দুর্বিনীত শালাটির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিমধ্যে। দুজনে নিচু স্বরে কথা বলছে।
দৃশ্যটা ভাল লাগল না লালটুর। ধ্রুবর উচিত শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে কোনও সম্পর্কই না রাখা। ব্যাপারটা একদিন ধ্রুবকে বুঝিয়ে দেবে সে।
পায়ে পায়ে লাউঞ্জে ফিরে আসে লালটু। ছোটকাকা ভ্রু কুঁচকে বসে আছেন সেই একই জায়গায়। অন্যরা নীরবে দাঁড়িয়ে।
কী হয়েছে?—লালটু জিজ্ঞেস করে।
কৃষ্ণকান্ত তার দিকে একবার চেয়ে মাথা নাড়লেন। গলাটা সাফ করে নিয়ে বললেন, হেমারেজটা বন্ধ হচ্ছে না। কন্ডিশন গ্রেভ। লালটু, নিতাইটাকে দেখ তো। বোধহয় গাড়িতে ঘুমোচ্ছে। ওর কাছে আমার প্রেশারের বড়ি আছে। নিয়ে আয়।
আপনি বাড়ি চলে যান না! একটা কামপোজ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। আমরা আছি।
না, ঠিক আছে। ওই গর্ভস্রাবটা কোথায়?
ধ্রুব বাইরে আছে। ডাকব?
ডাকতে হবে না। শুধু বল গিয়ে, বউমার অবস্থা ভাল না।
বলে কী হবে? আপনি উত্তেজিত হবেন না। অপারেশন তো হবে। দেখা যাক।
যে রুগি বাঁচতে চায় না তাকে বাঁচাবে কে?
বাঁচতে চায় না?
তাই তো শুনছি। সার্জেন দাশগুপ্ত বলল, পেশেন্ট বলছে, আমার বাঁচার ইচ্ছে নেই। আমি বাঁচতে চাই না। এমনকী বাচ্চাটার জন্যও না।
লালটু বুঝে নিল, বউমার জন্য দুশ্চিন্তা, ছেলের ওপর রাগ সব মিলিয়ে ছোটকাকা আজ একটু বেহেড। সে গিয়ে ছোটকাকার পাশের খালি জায়গাটায় বসে বলল, ভেঙে পড়বেন না। এভরিথিং উইল বি অলরাইট। আমি বলি, আপনার বাড়ি চলে যাওয়াই ভাল।
কেন, বাড়ি যেতে বলছিস কেন? বাড়ি গিয়ে কী করব? সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা হবে। তার চেয়ে এই-ই ভাল। যা হওয়ার চোখের সামনে হোক। বাচ্চা মেয়েটা… এই সেদিন বিয়ে দিয়ে আনলাম। স্টিল এ চাইল্ড। ওই গর্ভস্রাবটার দোষে…
কাকা!—লালটু সাবধান করে দেয়। দেয়ালেরও কান আছে। কুটুমরা ঘুরছে আশেপাশেই। কোন কথার কোন অর্থ ধরবে তা তো বলা যায় না। গলা খাকারি দিয়ে সে বলল, ধ্রুবরও তো বয়স বেশি না। পঁচিশ কি ছাব্বিশ। এই বয়সে কত আর কাণ্ডজ্ঞান হয় মানুষের।
এই বয়সে যার না হয় তার কোনওকালেই হয় না। ও জন্মেছে আমাকে শেষ করার জন্য।
অপারেশন থিয়েটারে রেমি তখন আলোর নীচে শুয়ে। এত আলো তবু যেন সব আলোও অন্ধকারকে তাড়াতে পারছে না। অন্ধকার চোখে নয়। ভিতরে।
রক্তে সে আজ স্নান করছে কখন থেকে। ভেসে যাচ্ছে নিজের রক্তের স্রোতে।
বাচ্চাটা জন্মাল দুপুরের একটু পর। অনেক যন্ত্রণা দিয়ে নাড়ি ছিঁড়ে, শরীর অবশ করে নেমে গেল। দুর্বহ যন্ত্রণার অবসান। কচি গলার কান্নার শব্দ পৃথিবী জুড়ে মাদল বাজাতে লাগল।
ছেলে? না মেয়ে?
ছেলে! ছেলে! ছেলে হয়েছে গো! সোনার গয়না দিতে হবে কিন্তু।–ধুইয়ে মুছিয়ে ছেলেটাকে দেখিয়ে এই কথা বলে নিয়ে গেল একটা আয়া।
কিন্তু তারপর থেকে রেমির শরীরের ভিতরে রক্তের কলধ্বনি আর থামতে চায় না।
হেমারেজটা ধরতে অনেক সময় নিয়েছে ডাক্তার। কিন্তু শুধু ডাক্তারেরই কি দোষ? লেবার রুম থেকে বেডে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সব টের পেয়েও কি চুপ করে থাকেনি রেমি?
শুধু সে টের পেয়েছিল। কিন্তু কিছু বলেনি কাউকে। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল অয়েলক্লথের ওপর পাতা চাদর। ঢাকা কম্বলের নীচে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছিল। রিমঝিম করছিল মাথা। কানে সব শব্দ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছিল।
কে?
আমি। আমি ধ্রুব।
খুব লাজুক মুখেই ধ্রুব এসে দেখা করেছিল।
চোখের দুর্বল পাতা অতি কষ্টে তুলে রেমি জিজ্ঞেস করল, ওকে দেখেছ?
কাকে?
বাচ্চাটাকে।
ন্ না। দেখব। তাড়া কী?
দেখো। ভাল করে দেখো।
তোমার কি খুব কষ্ট হয়েছে?
না। কষ্ট কীসের? মেয়ে হয়ে জন্মেছি, এ কষ্ট তো কপালের লেখন।
তা বটে। বাপদের গর্ভযন্ত্রণা নেই। কিন্তু অন্য যন্ত্রণা আছে।
আছে নাকি? আছে আছে।
রেমির চোখে সেই সময় একটা মস্ত পাথর চাপা দিল কে। আবার একটু বাদে চোখ মেলতে পারল সে। গলাটা বড় শুকনো। ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আমাকে একটু জল দিতে বলে। বড় তেষ্টা।
