ধ্রুব নিজেই জল খাইয়ে দিল তাকে। খুব সাবধানে, আস্তে আস্তে। তবু ধ্রুবর হাত কাঁপছিল। অল্প অল্প চলকাচ্ছিল জল ছোট্ট পোসিলিনের মগটা থেকে।
আঃ, গায়ে জল পড়ছে। ঠান্ডা না!
আমার হাতটা আজকাল কঁপে কেন বলো তো! মাল খাই বলে নাকি?
তুমি যাও, আয়াকে বলো। না হয় নার্সকে ডাকো।
আমিই না হয় দিলাম। দাঁড়াও, গলায় তোয়ালে দিয়ে নিই।
আর লাগবে না। হয়েছে।
ধ্রুব মগটা রেখে দিল। বলল, এবার কেটে পড়তে হবে। বাবা আসবে।
তাই পড়ো না। কে থাকতে বলেছে?
তোমার চেহারাটা ভাল দেখাচ্ছে না রেমি! ইউ আর সিক!
না, মোটেই না। আমি ভাল আছি।খুব জোর দিয়ে রেমি বলেছিল। কিন্তু সে ঠিকই টের পেয়েছিল, সে ভাল নেই। তলপেটে একটা ব্যথা মেরে মেরে নিচ্ছিল। রক্তের কলধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল সে। কিন্তু সে বলেনি সেই কথা। কাউকে বলেনি।
কত বয়স হবে তার এখন? কুড়ি? না, একুশ। হ্যাঁ একুশ। এখনও সে কলেজের ছাত্রী। এই এত অল্প বয়সে সে বউ হয়েছে, মা-ও হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি দরকার ছিল না এসব হওয়া। অপেক্ষা করা উচিত ছিল।
সে আচমকা বলল, শোনো, একটা কথা বলি।
কী?
বাচ্চাটাকে দেখো।
তার মানে?
বাচ্চাটাকে একবার দুটো চোখে দেখে এসো।
বলছি তো দেখব। তাড়া কীসের?
শোনো, এই বাচ্চাটা—এটা তোমার।
তার মানে?
আমাকে সন্দেহ কোরো না।
ধ্রুব একটু লজ্জা পেল কি? হ্যাঁ, পেল। ফরসা রং একটু লাল হল। বেশ দেখতে লোকটা। লম্বা ছিপছিপে চাবুকের মতো চেহারা। স্পষ্টই বোঝা যায় গায়ে অভিজাত বংশের রক্ত আছে। তবু গোলমালটা কোথায়? কেন গোলমাল? কেন লোকটা স্বাভাবিক নয়?
বিয়ের পরই তাদের জোড়ে দার্জিলিং পাঠিয়েছিলেন শ্বশুরমশাই। সেটা এক ধরনের হানিমুনই হবে। আর সেখানে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল।
০০৭. ভাই হেমকান্ত
“ভাই হেমকান্ত, তোমার পত্রখানি ঠিক তিন দিন আগে পাইয়াছি। তাহার পর হইতে কেবলই ভাবিতেছি, তোমাকে কী লিখিব। ভাবিয়া দেখিলাম, দুইটি পন্থা আছে। তোমার মানসিক বৈকল্যে প্রলেপ দিতে দু-একটা সান্ত্বনার কথা, স্তোকবাক্য অথবা এই বৈকল্যকে তোমার দার্শনিক চেতনা বলিয়া বর্ণনা করিয়া লেখা যায়। তাহাতে তোমার মানসিক বৈকল্যের কতদূর কী প্রশমন ঘটিবে জানি না, কিন্তু তোমার দুর্বলতাকে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দেওয়া হইবে। দ্বিতীয় পন্থা মোহমুগর। অর্থাৎ তোমার মতো কূপমণ্ডুককে দেশকাল ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সচেতন করিয়া তুলিয়া তুমি যে কত বড় অপদার্থ তাহাই তোমার চক্ষুর সম্মুখে তুলিয়া ধরা। আমি দ্বিতীয় পন্থাটিই গ্রহণ করিলাম।
“তোমার পত্র হইতে যতদূর উদ্ধার করিতে পারিলাম তাহার মোদ্দা কথা হইল, তোমার নবনীনিন্দিত কোমল কর হইতে কুয়ার বালতি খলিত হইয়া জলে পড়িয়াছে। ঘটনা তো তবে সাংঘাতিক। সারা বিশ্বে তো সাম্প্রতিককালে এরূপ বিশাল বিপর্যয় আর ঘটে নাই। ফলে তোমার মনে হইল, তুমি বুড়া হইতেছ, জীবনদীপের শিখা নিস্তেজ হইতেছে ইত্যাদি। ভাল কথা। কিন্তু এই অবিমিশ্র জলীয় মানসিকতার উৎসটি কোথায় তাহা কোনওদিন স্থিরচিত্তে ভাবিয়া দেখিবার অবকাশ পাইয়াছ কি? তোমার হস্তাক্ষর মুক্তার ন্যায় সুন্দর, ভাষাও প্রাঞ্জল। তথাপি বলি, তোমাকে বাল্যকালাবধি গভীরভাবে জানি বলিয়া পত্রটির অন্তর্নিহিত অর্থটি খানিকটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারিয়াছি। সাধারণ মানুষ এই পত্র পড়িয়া মাথামুন্ডু কিছুই বুঝিবে না। বড় জোর ভাবিবে, ইহা বোধ করি কুপিত বায়ুর প্রভাব।
“তোমার মনে আছে কি না জানি না, বাল্যকালে আমরা উভয়ে পাঠশালায় যাইতাম। একদা ব্রহ্মপুত্রের তীরে এক বুড়া পাগল আমাদের তাড়া করিয়াছিল। দোষটা আমারই। সে নিরিবিলিতে বসিয়া বিষ্ঠা ত্যাগ করিতেছিল। আমি তাহাকে একটি ঢিল মারি। খানুপাগলা তাহাতে ক্ষেপিয়া গিয়া অঙ্গের একটিমাত্র আবরণ ছেড়া গামছাখানি পরিত্যাগ করিয়া ভীম হুহুংকারে আমাদের ধাওয়া করিল। প্রকৃতপক্ষে কে ঢিল মারিয়াছিল তাহা সে জানিত না। প্রভাতসমীরে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসিয়া নিবিষ্টমনে সে প্রাকৃতিক ক্রিয়া সারিতেছিল। ঢিল খাইয়া সে চমকিত হইয়া আমাদের দেখিল এবং তৎক্ষণাৎ তাড়া করিল। কে অপরাধী তাহা সে জানিত না, তবে তোমার রাঙামুলার মতো চেহারাটিই তাহার পছন্দ হইয়া থাকিবে। সুতরাং আমাকে ছাড়িয়া সে তোমার পিছু লইল। সেই বয়েসের পক্ষে যথেষ্ট নাদুসনুদুস শরীর লইয়া তুমি প্রাণভয়ে বইখাতা ফেলিয়া দৌড়াইতেছ আর দিগম্বর খানুপাগলা তোমাকে তাড়া করিয়া লইয়া যাইতেছে, দৃশ্যটা যথেষ্ট হাস্যোদ্রেককারী। কিন্তু মুশকিল হইল সেই সময়ে তুমি দৌড়ঝাপ ভাল জানিতে না। এমনকী আমাদের মতো টিয়া পাঠশালায় যাওয়ার অভ্যাসও তোমার ছিল না। তোমার দৌড় দেখিয়া মনে হইতেছিল যেন স্বয়ং জরদগব দৌড়াইবার চেষ্টা করিতেছে। কালীবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাইতেই তোমার দম বাহির হইবার জোগাড়, আতঙ্কে চোখ ডিম্বাকৃতি ধারণ করিয়াছে, কেমন যেন দিগবিদিগজ্ঞানশূন্য দিশাহারা অবস্থা। জমিদার নন্দনের সেই দুরবস্থা দেখিয়া পথচারীর অবশ্য হস্তক্ষেপ করিল এবং খানুপাগলাও নিরস্ত হইল। কিন্তু বহুক্ষণ তোমার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়া আসে নাই। তোমার বাক্য সরিতে ছিল না, আর বারবার শিহরিয়া উঠিতেছিলে, চোখে এক অস্বাভাবিক দৃষ্টি। তোমার অবস্থা দেখিয়া আমি ভয় পাইয়া গিয়াছিলাম, পাগলের তাড়া, কুকুরের কামড় বা অন্যতর নানাবিধ উৎপাত বাল্যকালের নিত্যসঙ্গী। ইহাতে অতটা আতঙ্কিত হওয়ার কী আছে তাহা আমার শিশু মস্তিষ্কে ঢোকে নাই। তবে বুঝিয়াছিলাম, তোমার মন তেমন শক্তপোক্ত নহে। অথচ তোমারই অগ্রজ বরদাকান্ত অসম সাহসী বালক ছিল। তোমার সহোদর নলিনীর সাহসিকতার খ্যাতি তো ব্যাপক।
