ছেলেটার গায়ে এই শীতেও মাত্র শার্ট দেখে লালটু বলল, গরম জামাও তো পরে আসোনি দেখছি।
সময় পাইনি। দিদির খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছি।
আরে, এত চিন্তার কী? আমরা তো আছি। আফটার অল রেমি আমাদের বাড়ির বউ। তুমি মা বাবাকে নিয়ে বাড়ি চলে যাও। টেক রেস্ট।
ছেলেটা একটু অভিমান ভরে বলল, যদি কোনও দরকার হয় সেইজন্যই আছি। শুনেছিলাম দিদির রক্ত লাগবে। কিন্তু তালুইমশাই কিছুতেই আমাদের রক্ত অ্যাকসেপ্ট করতে রাজি নন। কেন বলুন তো!
লালটু হোট হোর করে হাসল। বলল, আরে! তার জন্য রাগছ কেন? কাকার একটু বাতিক আছে।
এটা কী ধরনের বাতিক? আমরা তো দিদিব পর নই। আমাদের রক্ত কি অশুচি? তালুইমশাই অত্যন্ত ক্লাস কনশাস।
লালটু ছেলেটাকে একটু ভাল করে দেখল। রোগা ফরসা চেহারা। গালে কৈশোরের নরম কিছু দাড়ি এবং গোঁফ। আজকাল দাড়ি গোঁফটা বেশ চালু ফ্যাশন। ছোকরার মাথার চুলও মেলা। ঘাড় পর্যন্ত বাবরি। লালটু বুঝতে পারছিল না ছোকরা কমিউনিস্ট কি না। আগে পায়জামা এবং পাঞ্জাবি ছিল দেশি কমিউনিস্টদের মার্কামারা পোশাক। দেখেই চেনা যেত। আজকাল অবশ্য বাইরেটা দেখে চেনা মুশকিল। ছেলেটার নাম কিছুতেই মনে পড়ছিল না লালটুর। তবে সে বিগ ব্রাদারের মতো ছোকরার কাঁধে হাত রেখে বলল, আরে না, ক্লাস কনশাস কথাটা বড্ড ভারী। ওসব নয়। কাকার ধারণাটা কী জানো? শুনলে তুমি হাসবে, বাট ইট ইজ এ ফ্যাক্ট। কাকার বিশ্বাস, যারা ইস্টবেঙ্গলের লোক তারা এককালে ভাল খেয়েছে-দেয়েছে, ফ্রেশ এয়ার পেয়েছে, কাজেই তাদের রক্তটা একটু বেশি পিউরিফায়েড অ্যান্ড হেলদি।
বলে লালটু আর-এক চোট হোঃ হোঃ করে হাসল।
কিন্তু রেমির ভাই হাসল না। বলল, এই বিজ্ঞানের যুগে ওসব বিশ্বাস অচল। রক্ত কার কত পিউরিফায়েড সেটা স্পেশালিস্টরা বলবে। আমরা পশ্চিমবঙ্গের লোক বলে আমাদের রক্ত পিউরিফায়েড নয় এটা তো অশিক্ষিত লোকের ধারণা। তাই যদি হবে তবে পশ্চিমবঙ্গের মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিতে যাওয়াই বা কেন?
প্রশ্নটা হকের। জবাবটা লালটু খানিক জানে। তবে সে কথা এই দুধের বাচ্চাকে বলবার মতো নয়। সে একটু উদার গলায় বলল, আফটার অল কাকা বুড়ো হয়েছেন, কিছুটা সেনিলিটিও এসে যায় এই বয়সে। এক সময়ে জমিদারি করেছেন, মেজাজটাও তেমন। ওঁর ওপর আমরা কোনও কথা বলি না। তবে জানি, ওঁর অনেক ধারণাই লজিক্যাল নয়।
রেমির ভাই গম্ভীর মুখে বলল, এই বিয়েতে আমরাও খুব খুশি •ই! জামাইবাবুর বিহেবিয়ার খুব খারাপ। দিদি সাইকোলজিক্যালি ভীষণ আপসেট। অনেকদিন ধরেই আমরা সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে আসছি লালটুদা। কিন্তু এখন রক্তের পিউরিটির ব্যাপারটা আমাদের কাছে খুব হাস্যকর লাগছে। জামাইবাবুর রক্ত কি আপনার কাছে খুব পিয়োর বলে মনে হয়?
কোথাও কিছু না, এই সামান্য কথাটায় হঠাৎ লালটুর মাথাটা দপ করে জ্বলে উঠল। সেই আগুন ঝলসে উঠল তার চোখেও। ঠিক কথা, ধ্রুব অল্প বয়স থেকে মদ খায়, অন্যান্য দোষও আছে। কিন্তু তা বলে তার সম্পর্কে এরকম কথা অন্তত কুটুমের মুখে মানায় না। লালটু একটু দম ধরে থেকে রাগটা সামলাল। চণ্ড রাগটাকে সে নিজেই আজকাল ভয় পায়। তারপর চাপা রাগের গনগনে গলায় বলল, ধ্রুবকে আমি বাচ্চাবেলা থেকে জানি, হি ইজ মাই ব্রাদার। মদ আমিও খাই। কিন্তু কোন শুয়োরের বাচ্চা আমার রক্তকে ইমপিয়োর বলবে হে?
রেমির ভাই যে এই ধমকে ভয় খেল এমন নয়। বরং খুবই উদাস একরকম বেপরোয়া মুখে স্তিমিত গলায় বলল, একটু আগে আমার বাবাকে তালুইমশাই ইনডিরেক্টলি অপমান করেছেন। দিদির এই প্রথম বাচ্চা। একটা প্রিমিটিভ নিয়ম আছে প্রথম বাচ্চা হওয়ার দায়দায়িত্ব মেয়ের বাপের বাড়ির। আমার বাবা নার্সিংহোমের খরচটা নিজে দিতে চেয়েছিলেন। তাতে তালুইমশাই এমন সব কথা বললেন যাতে মনে হয় এখনও এদেশে সামন্ততন্ত্র চালু আছে এবং গোটা দেশটাই ওঁর জমিদারি। নার্সিংহোমের খরচ দিতে চেয়ে আমার বাবা যেন ওঁকে অপমান করেছেন।
লালটু খুবই অবাক হয়ে গেল। তার ছোটকাকা নেতা মানুষ। পাবলিক তার সম্পর্কে ভাল কথাও বলে, খারাপ কথাও বলে। কিন্তু তা বলে কুটুমরা বলবে কেন? লালটুর গা-হাত-পা নিশপিশ করছিল।
ঠিক এই সময়ে একটা প্রাইভেট গাড়ি এসে থামল নার্সিংহোমের ফটকে। দরজা খুলে প্রথমে নামল জগা। তারপর ধ্রুব। সঙ্গে আর-একটা বাচ্চা চাকর।
লালটুর রাগটা গিয়ে পড়ল ধ্রুবর ওপর। সে গিয়ে শরীরটা চিতিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। গলায় ফেটে পড়ল রাগ, এতক্ষণ কোথায় ছিলি রে হারামজাদা? তোর জন্য কি আমাদের মুখে চুনকালি পড়বে? শালার তিন পয়সার সব কুটুমও আজকাল লম্বা চওড়া লেকচার ঝেড়ে যায়। ফর ইউ। ওনলি ফর ইউ।
বলে আচমকা ধ্রুবর পুলওভারের বুকের কাছটা খামচে ধরে দুটো মগজ-নাড়ানো ঝাঁকুনি দিল লালটু।
এই একটা লোককে ধ্রুব বরাবর ভয় পায়। নেশা এখন আর নেই। মাথাটা এমনিতেই কেমন ভোম্বল হয়ে আছে। ঝাঁকুনিতে সে আরও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। বলে, কেন, কী হয়েছে? ইজ শি ডেড?
মরলে তোরই মরা উচিত। গো হোম অ্যান্ড শুট ইয়োরসেলফ।
ধ্রুব কিছু বুঝতে পারছে না। অসহায়ভাবে বলল, কী হয়েছে লালটুদা? এনিথিং রং?
এভরিথিং রং। যেসব লোক আমাদের জুতোবরদার হওয়ার যোগ্যতা রাখে না তাদের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়াই বোকামি হয়েছে। যা ভিতরে যা। কাকা বসে আছেন।
