অনুমান নয়। আমরা শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে কিছু বলি না।
রামকান্তবাবু, আপনি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন তা ভুলে গেছেন। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ বটে, কিন্তু কেউ আমাকে চোখ রাঙায় এটা আমি পছন্দ করি না।
রামকান্ত রায় একটু অবাক হলেন। লোকটিকে তিনি নিরীহ বলেই জানতেন। কিন্তু আজ হঠাৎ এঁর ভাবান্তর এবং কাঠিন্য দেখে তাকে থতমত খেতে হল। তবে তিনি সব পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নিতে পারেন। তাছাড়া তিনি জানেন, এসব জমিদারদের কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকে, প্রভাব-প্রতিপত্তিও তো কম নয়। একজন দারোগাকে বদলি বা বরখাস্ত করা খুব কঠিন নাও হতে পারে। হেমকান্ত দাপুটে বা প্রভাবশালী লোক নন বটে, কিন্তু তার প্রভাবশালী শুভানুধ্যায়ির অভাব নেই।
রামকান্ত রায় গলার স্বর নরম করে ফেললেন। বললেন, আপনার ভালর জন্যই বলছি। আপনি যে নির্বিরোধী মানুষ একথা কে না জানে? তবু আপনার বাড়িতে কোনওরকম সিডিশাস অ্যাকশন হলে তো বিপদ আপনারই। আমি সরকারের চাকর মাত্র।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, শুধু সেটুকু হলে আমার বলার কিছু থাকত না। কিন্তু আমার মনে হয় আপনার এই পরিবারের প্রতি একটু আক্রোশও আছে।
না, কী যে বলেন।
হেমকান্ত একটু ক্ষীণ হেসে বললেন, প্রথম থেকেই আপনি ধরে নিয়েছেন যে, আমি স্বদেশিদের প্রতি সিমপ্যাথেটিক। ওরকম মনোভাব ভাল নয়। যখন আমাকে ছোরা মারা হল তখনও আপনি এটাকে অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছে।
রামকান্ত রায় গম্ভীর এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় চুপ করে রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, আচ্ছা, তা হলে চলি।
রামকান্ত রায় চলে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কনক এসে ঘরে ঢুকল। পিছনে জীমূতকান্তি।
কী হল, বাবা?
হেমকান্ত সহাস্যে বললেন, কিছু নয়। চিন্তা কোরো না।
কী বলতে এসেছিল?
একটা খবর দিয়ে গেল। লোকটা নাকি ধরা পড়েছে।
পড়েছে?
সত্যি-মিথ্যে জানি না। তবে লোকটা সুবিধের নয়।
কনককান্তি বলল, সুবিধের তো নয়ই। দারুণ বদনাম।
একটা অদ্ভুত কথা বলে গেল। যে আমাকে ছোরা মেরেছে তাকে নাকি আমি চিনি। কিন্তু বলছি না।
এররম অদ্ভুত কথার মানে কী? লোকটা কে?
তা তো কিছু বলল না। আবার কৃষ্ণ সম্পর্কেও নাকি ওদের সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
কৃষ্ণ!–কনক এবং জীমূত দুজনেই অবাক।
হেমকান্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে বললেন, সেইটেই ভাবনার কথা। কৃষ্ণ একটু লাঠি-কাঠি খেলে। বন্দুক চালানো শেখে। এসব দেখেই ওদের ধারণা হয়েছে যে কৃষ্ণ স্বদেশি করে। ওরা এখন ছায়া দেখলেই চমকায়।
কৃষ্ণ স্বদেশি করবে কী! ও তো দুধের ছেলে!—জীমূতকান্তি অকপট বিস্ময়ে বলে।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, দুধের ছেলে বলে কথা নয়। দুধের ছেলেরা অনেকেই স্বদেশি করে। কংগ্রেসে কত ভলান্টিয়ার আছে ওর বয়সি। সেটা কথা নয়। কথা হল, কৃষ্ণ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে আমাকে ঘাবড়ে দিতে চাইছে।
তা হলে এখন কী করা?
হেমকান্ত চিন্তিতভাবে বললেন, সেইটেই ভাবছি। রামকান্ত রায়কে আমিও একটু ভয় দেখিয়েছি। তাতে কাজও হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় না লোক ও সহজে ছাড়বার পাত্র। কিছু লোক আছে যারা কাজ দেখাতে গিয়ে অনেক অনর্থ বাঁধায়। রামকান্ত সেই শ্রেণির লোক। গোডাউনে বিলিতি কাপড় পোড়ানোর ঘটনায় ফায়ারিং করা দরকার ছিল না। কাজেই কৃষ্ণ সম্পর্কে আমার দুর্ভাবনা হচ্ছে।
কনক বলল, তা হলে একটা কাজ করা যাক। কৃষ্ণকে এখান থেকে সরিয়ে নিলে কেমন হবে?
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমাকে একটু ভাবতে দাও। কৃষ্ণ আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। এ জায়গার প্রতিও ওর টান আছে। আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলে দেখি।
কনক ও জীমূত দুজনের মুখেই দুশ্চিন্তা। হেমকান্ত সেটা লক্ষ করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় মুখে দুশ্চিন্তার কথা বললেও ভিতরে ভিতরে তিনি তেমন একটা ভয় পাচ্ছেন না। নিজের ভিতরে এই পরিবর্তন দেখে তিনি নিজেও কম বিস্মিত নন। আততায়ির ছোরা তার কিছু উপকার করেছে।
রামকান্ত রায়ের আগমন এবং নির্গমন দুই-ই ছাদ থেকে নিরীক্ষণ করেছে কৃষ্ণকান্ত। তার চোখে জ্বালা। তার ভিতরে এক অন্ধ রাগ। লোকটা যে তাদের শত্রু এ বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। শশিভূষণের ঘটনা থেকে লোকটার আক্রোশের শুরু। এ পর্যন্ত নানাভাবে হেমকান্তকে জব্দ করার চেষ্টা করেছে লোকটা। অকারণেই।
কৃষ্ণকান্ত বুঝতে পারছে, তাদের শত্রুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অথচ তারা তেমন কোনও অন্যায় করেনি। হেমকান্ত সবরকম ঘটনার ঊর্ধ্বে বিচরণ করেন। অথচ তাকেই লোকে ছোরা মারে। পুলিশ এসে তাকে জ্বালাতন করে, শহরবাসী তার নামে বদনাম রটায়।
কৃষ্ণকান্তর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা রঙ্গময়ি। ছাদ থেকে নেমে সে রঙ্গময়িকে খুঁজতে গেল।
মন্দিরের চাতালে রঙ্গময়ি একা উদাস মুখে বসে আছে। তাকে দেখে খুশি হয়ে বলল, আয়।
দারোগা এসেছিল, দেখেছ?
দেখেছি। মস্ত ঘোড়া, নাল লাগানো বুট, কোমরে বেল্ট, চোখ রাক্ষসের মতো ধক ধক করছে। বলে রঙ্গময়ি বিষমুখে হাসল।
কী চায় বলো তো? রোজ আসে কেন?
কী জানি বাবা কেন আসে! সেই স্টাবিং নিয়েই বোধহয় কথা।
কেউ ধরা পড়েছে?
পড়েছে বোধহয়।
কী করে জানলে?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, জানব কী করে? আন্দাজে বলা। তবে কানাঘুষো শুনছি কে যেন ধরা পড়েছে থানায়।
লোকটা কে জানো?
