ধারার ভিতর ঠান্ডা রাগটা সেই স্পর্শে মরে গেল। রক্তে লাগল এসে উত্তাপ। ধ্রুবর চোখে চোখ রেখে বলল, কেন মাঝে মাঝে ওরকম হয়ে যাও তুমি! কেন ওরকম অদ্ভুত লাগে তোমাকে!
আমি স্যাডিস্ট, ধারা। তোমাকে এখন আমার খুন করতে ইচ্ছে করছে।
করো না খুন। করো!
করব?
ধারা হাসল, করো। তবু তোমার মুরোদ দেখে যাই। আর তো কিছু পারোনি। ভিতু কোথাকার!
কিন্তু খুনটা পারি, ধারা। আমার শরীরে খুনির রক্ত আছে।
তাই নাকি?
আমার বাবা খুনি। অবশ্য স্বদেশি খুনি। বাট হি ইজ এ ডাউনরাইট মার্ডারার অলরাইট। আমাকে তোমার ভয় পাওয়া উচিত।
পাচ্ছি না।
ধ্রুবর হাত দুটো ধারার গলায় নেমে আসে। দশটা আঙুল বাঁকা হয়ে ধীরে ধীরে চেপে বসতে থাকে তার নরম গলায়।
০৭৭. লোকটা কী বলছে
লোকটা কী বলছে তা কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছিল না হেমকান্তর। কিন্তু ধীর স্থির মানুষ, বেশি কথা বলা বা তর্ক করা তার স্বভাব বিরুদ্ধ। তাই তিনি খানিকক্ষণ সামান্য বিস্ময়ের দৃষ্টিতে রামকান্তর দিকে চেয়ে থেকে বললেন, আমি তাকে চিনি?
চেনারই কথা।
চিনতে পেরেও বলছি না? এ কী করে সম্ভব? যে আমাকে খুন করতে চেষ্টা করেছে তাকে চিনতে পেরেও চুপ করে থাকব কেন?
আমাদেরও সেইটেই প্রশ্ন।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
এমনও তো হতে পারে যে আততায়ি আপনার একজন প্রিয়পাত্ৰই হবে। সেক্ষেত্রে তার নাম বলতে না চাওয়াটা স্বাভাবিক।
হেমকান্ত চুপচাপ দারোগা সাহেবের মুখের দিকে বিস্মিত চোখে চেয়ে রইলেন। এরা তিলকে তাল করতে ওস্তাদ। সরলকে জটিল করায় এদের জুড়ি নেই।
হেমকান্ত মৃদু একটু হেসে বললেন, রহস্য না রেখে যদি তার নামটা বলেন তা হলে আমার উৎকণ্ঠা অনেক কমে যায়।
রামকান্ত রায় হাসলেন। খুবই উচ্চাঙ্গের হাসি। তাতে প্রচুর অহংকার এবং প্রত্যয় মিশে আছে। বললেন, ব্যস্ত হবেন না। এখনই তার নামটা করতে পারছি না।
হেমকান্ত ধৈর্য হারালেন না। শরীরটা দুর্বল। আচমকা আততায়ি গ্রেফতারের খবরটায় এবং রামকান্ত রায়ের এইসব হেঁয়ালি শুনে উদ্বেগে শরীরটা আরও দুর্বল লাগছে। তিনি চোখ দুটো একটু বুজলেন।
রামকান্ত রায় বললেন, আপনাকে আমার দু-একটি প্রশ্ন করার ছিল।
করুন।
স্বদেশি অর্থাৎ টেররিস্টদের প্রতি আপনার এই দুর্বলতা কেন?
কে বলল আমি টেররিস্টদের প্রতি দুর্বল?
আমরা সবই টের পাই, হেমকান্তবাবু।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি তো কিছুই করিনি যাতে আপনার ওরকম মনে হতে পারে!
আপনি করেননি? আপনার বাড়িতে শশীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন সেকথা না হয় ছেড়েই দিচ্ছি। কিন্তু আপনার ছোট ছেলে কৃষ্ণকান্ত যে স্বদেশি হিসেবে তৈরি হচ্ছে সে খবর আপনার অজানা থাকার কথা নয়।
কৃষ্ণ!বলে হেমকান্ত চমকে উঠে বলতে চেষ্টা করলেন। বুকটা বড় বেশি ধক ধক করতে লাগল। রক্তস্রোত কি ভীষণ জোরে বইছে? হেমকান্ত খলিত কণ্ঠে বললেন, কী করেছে কৃষ্ণ?
কী করেনি বলুন? সে স্বদেশি করবে বলে ব্যায়াম করে, লাঠি খেলে, বন্দুক চালায়, ব্রহ্মচর্য করে। আমরা সব খবরই রাখি।
হেমকান্ত অবাক হয়ে বলে, শরীরচর্চা বন্দুক চালানো এসব তো আমরাও করতাম।
কিন্তু কৃষ্ণকান্ত এসব অকারণে করছে না। তার বন্ধুদের কাছে আমরা জানতে পেরেছি সে খুব বেশি মাত্রায় স্বদেশি মনোভাবাপন্ন।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, হতেই পারে না। আপনি ভুল জানেন।
আমাদের ইনফরমেশন কদাচিৎ ভুল হয়।
কৃষ্ণ আমার ছেলে, তার নাড়িনক্ষত্র আমি জানি।
সবটা জানেন না। আপনি স্নেহান্ধ বাবা, সবটা কী করে জানবেন? আর-একটা কথাও না জানিয়ে পারছি না।
বলুন।
আপনাদের পুরুতঠাকুরের মেয়ে রঙ্গময়ি সম্পর্কেও আমাদের কাছে কিছু ইনফরমেশন আছে।
হেমকান্ত ফের উত্তেজিত হয়ে উঠে বসার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেন না। মাথাটা একটু ঘুরে যায়। বলেন, সে আবাব কী করল?
ওঁর প্রতি আপনার সফটনেসের কথাও আমরা জানি। এক্ষেত্রেও আপনি আমাদের সঠিক তথ্য জানাবেন না বলেই ধরে নিচ্ছি। শুধু বলে দিচ্ছি, ওঁর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে আমাদের বাধ্য করবেন না।
হেমকান্ত খুব বিস্বাদ অনুভব করলেন মনটায়। তার ও রঙ্গময়ির সম্পর্ক নিয়ে পুলিশও কথা বলছে! ভিতরটা উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল তার। দারোগা সাহেব বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ তাকে ছোট ছেলের মতো ধমকাচ্ছেন। এবার একটু প্রতিবাদ করা উচিত।
হেমকান্ত মৃদু স্বরে বললেন, আপনি আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন কি?
ভয় দেখানো আমার কাজ নয়। আমার কাজ সতর্ক করা।
কিন্তু রঙ্গময়ি কী করেছে তা আপনি এখনও বলেননি। ক্রমাগত হেঁয়ালিতে কথা বললে তো হবে। আপনাকে পরিষ্কার করে বলতে হবে আমার ছেলে এবং রঙ্গময়ি সম্পর্কে আপনার অভিযোগ কী।
অভিযোগ এখনও করছি না। শুধু সন্দেহ প্রকাশ করছি। বিলিতি কাপড় পোড়ানোর ব্যাপারে রঙ্গময়ির ইনস্টিগেশন ছিল। আপনি ওঁকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। সেই ঘটনায় ফায়ারিং-এ দুজন মারা গেছে। যে কজন অ্যারেস্টেড হয় তাদের একজনের কাছ থেকে আমরা। রঙ্গময়ির সম্পর্কে ইনফরমেশন পাই। অবশ্য সন্দেহ আমাদের আগে থেকেই ছিল। শশীকে উনি শেল্টার দেওয়ার খুব চেষ্টা করেছিলেন।
হেমকান্ত হতাশভাবে মাথা নেড়ে বললেন, আমি কিছুই জানি না। আর বিলিতি কাপড় পোড়ানো থেকে শুরু করে সবরকম আন্দোলন তো সারা দেশেই হচ্ছে। এর জন্য রঙ্গময়ির প্ররোচনার দরকার কী? আপনিই-বা এসব অনুমান করতে যাচ্ছেন কেন?
