ধারা মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলে, শোবে।
ধ্রুব মাথা নেড়ে আবার ফিরে আসে বৈঠকখানায়। একটা কিছু করার জন্য তার হাত-পা নিশপিশ করছে। একটা কিছু ভাঙতে হবে। দান উলটে দিতে হবে। ওলটপালট। ওলটপালট।
ধারার ঘরে একটা ছোট্ট বেতের চেয়ারে পা মুড়ে বসা তার অভ্যাস। আজও সেইভাবে বসে ধ্রুব জানালা দিয়ে চেয়ে আছে। কিছু দেখছে না। বাইরে কিছু আলো, কিছু অন্ধকার দেখবার মতো দৃশ্য কিছু নেই। চেয়ে থেকে সে অন্য কথা ভাবছিল। ভাবছিল এসবের কোনও মানেই হয় না। এই যে এত সব বাড়ি-ঘর, সোফাসেট, গাড়ি-ঘোড়া, নর-নারী।
ধারা চা নিয়ে ঘরে এসে বলে, তোমার ভাত রাঁধছি কিন্তু।
রাঁধো। কিন্তু প্লিজ জিজ্ঞেস কোরো না সঙ্গে আর কী রাঁধব।
করব না। সারপ্রাইজ থাক।
শুধু বলে রাখি আমি শুটকি মাছ, ভঁটা আর শাক চচ্চড়ি খাই না।
নেইও।
বাঁচা গেল।
চায়ে চুমুক দিয়ে একটু চোখ বুজে থাকে ধ্রুব।
উলটোদিকের চেয়ারে বসে চায়ের কাপের কিনারার ওপর দিয়ে নিবিড় চোখে ধারা দেখছিল ধ্রুবকে। সে বুঝতে পারছে না, ও আজ কী চাইছে। থাকবে! সত্যিই থাকবে? যদি থাকে তা হলেও প্রেমিকের মতো যে আচরণ করবে না তা ধারা জানে। ওর মুখে একটা অত্যন্ত উচাটন ভাব। শরীরে অস্থিরতা।
তোমার কী হয়েছে বলো তো!
ধ্রুব চায়ে আর-একবার চুমুক দিয়ে বলে, মনটা ভাল নেই।
কেন ভাল নেই! আবার সেই হিউম্যান রিলেশন নিয়ে ভাবছ নাকি?
ধ্রুব ঠাট্টা বুঝে হাসল। তারপর বলল, ভাবলে কি দোষ?
যার খাওয়া পরার চিন্তা নেই, হৃদয়ঘটিত প্রবলেম নেই, একমাত্র সে-ই ওইসব ফিলজফিক্যাল ব্যাপার নিয়ে ভাবতে পারে।
ধ্রুব তীক্ষ্ণ চোখে ধারার দিকে চেয়ে বলল, হিউম্যান রিলেশনটাই যে সবচেয়ে বড় প্রবলেম সেটা অন্তত তোমার বোঝা উচিত। মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি কথা বলে। অথচ যতদিন যাচ্ছে ততই মনে হচ্ছে এত কথা বলেও আমরা পরস্পরের সঙ্গে কিছুতেই যেন কমিউনিকেট করতে পারছি না। একটা শূন্য বলয় গড়ে উঠছে বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর, স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর, বাপের সঙ্গে ছেলের, ভাইয়ের। সঙ্গে ভাইয়ের, এমনকী প্রেমিকের সঙ্গে প্রমিকার, টের পাও না?
ওসব তোমার মনগড়া ব্যাপার। মোটেই এরকম হচ্ছে না।
ভাল করে অবজার্ভ কোরো, টের পাবে। আসল প্রবলেম হল মানুষের আজ আর কমিউনিকেট করার কিছুই নেই। সে হৃদয়ের চর্চা ছেড়ে দিয়েছে, আদর্শবাদ বলে কিছুই অধিকাংশ মানুষের নেই, অভ্যন্তরে ভালবাসার পুকুর শুকিয়ে গেছে, আবেগ ফুরিয়েছে, আন্তরিকতাও সে অনুভব করে না। কাজেই সে কমিউনিকেট করবেই বা কী?
বাঃ, আজ যে একদম উলটো কথা বলছ!
বলছি নাকি?
বলছ না? তুমিই তো ওসব হৃদয়চর্চার সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলে। লিভিং টুগেদার, প্রেমহীন সহবাস, কনট্রাক্ট ম্যারেজ এসব কত কী বুঝিয়েছ আমাকে।
ধ্রুব একটু লজ্জিত হয়ে বলে, ও ব্যাপারগুলো অবান্তর ঠিকই, কিন্তু ওগুলোই আসলে আঠা। একটু আঠা বা চিট না থাকলে মানুষে-মানুষে ঠিক মোয়াটা বাঁধে না, বুঝলে!
বুঝলাম না। তবে দয়া করে এখনই বোঝতে বসে যেয়ো না।
কেন বলল তো!
এখন থাক। শক্ত কথা বেশি একদিনে বুঝবার চেষ্টা না করলেই ভাল।
মেয়েরা ভারী তত্ত্বকথা অপছন্দ করে। তাই না, ধারা?
তাই। এটুকু বুঝলে যে কত ঝামেলা কমে যায়।
ধ্রুব চা শেষ করে হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলল, তা হলে আসি। এনজয় ইয়োরসেলফ।
ধারা অবাক হয়ে বলে, তার মানে? এই যে খাবে বললে! থাকবে!
বলেছি নাকি? বাট আই হ্যাভ চেঞ্জড মাই মাইন্ড।
ধ্রুব! প্লিজ!
না, আজ আমি এমন একজনকে চাই যে খুব নিবিষ্টভাবে আমার কথা শুনবে। বাধা দেবে না, বিরক্ত হবে না, তর্ক করবে না।
আচ্ছা বাবা, ঘাট হয়েছে। বোসো, আমি সব শুনব, বাধা দেব না, তর্কও করব না।
ধ্রুব একটু হেসে বলে, বাধা দেবে না বটে, কিন্তু মনে মনে বিরক্ত হবে। মেয়েরা এমনিতেই শ্যালো হয়। তুমি আরও অগভীর।
কী বললে?
বললাম যে, অগভীর।
আমি।
কেন তোমার কি ধারণা ছিল তুমি খুব গভীর মানসিকতার মেয়ে?
ধারা থমথমে মুখ করে চেয়ে রইল। কথা বলতে পারল না।
ধ্রুব তার দিকে চেয়ে বলে, তোমার আঠা নেই, ধারা। যার নেই সে এসব বুঝবে না।
ধারা মৃদু স্বরে বলল, একটা কথা বলবে? তুমি সবসময়ে আমাকে অপমান করতে চাও কেন? তুমি কি স্যাডিস্ট?!
কেন? স্যাডিস্ট কি তোমার অপছন্দ? আমার তো মনে হয় তোমার দু-দুটো স্বামীর একজনও যদি স্যাডিস্ট হত তা হলে তোমাকে ডিভোর্স করতে হত না।
ধারা ঠান্ডা গলায় বলে, তাই নাকি? কী করে বুঝলে?
মেয়েরা অত্যাচারীদের পছন্দ করে, জানো না? আমার বউ আমাকে কেন অত ভালবাসে বলো তো! কেননা আমি ওর ওপর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার করি! ও কোনও সময়ে আমাকে ভুলে যায় না। প্রাণপণ আমাকে জয় করার চেষ্টা করে। ক্ষত-বিক্ষত হয়, কাঁদে, কপাল চাপড়ায়, তবু তপ্ত ইক্ষু চর্বণের মতো জ্বলে গাল, না যায় ত্যজন।
মেয়েদের সাইকোলজি খুব ভাল বুঝেছ তো! বাঃ!
তোমার মতও কি তাই নয়?
মেয়েরা অত্যাচারীদের ঘেন্না করে।
ধ্রুব একটু হেসে বলল, তাই নাকি?
তোমার বউ যে তোমাকে ঘেন্না করে তা তুমি টের পাও না। কিন্তু আমি ওর সঙ্গে একদিন কথা বলেই সেটা টের পেয়েছি।
রেগে যাচ্ছ, ধারা?
মোটেই নয়। আমি কখনও রাগি না।
রেগো না। রাগলে তোমার চেহারাটা পালটে যায়।
আমার চেহারা নিয়ে তোমাকে অত ভাবতে হবে না।
চেহারা ছাড়া তোমার আর কী আছে, ধারা?–বলতে বলতে ধ্রুব একটু এগিয়ে যায়। আলতোভাবে ধারার দুগালে দুটো করতল চেপে ধরে। মুখখানা তুলে খুব নিবিষ্টভাবে চোখের দিকে তাকায়।
