রঙ্গময়ি হেসে বললেন, আজ যে তোর মুখে ও ছাড়া আর কথা নেই! কী হল বল তো ভাই?
বলো না! আমার জানা দরকার।
জানা দরকার কেন?
কারণ আছে।
রঙ্গময়ি হাত উলটে বলেন, তার ছিল ওই একরকম স্বভাব। বাইরে থেকে দেখলে ঠান্ডা, শান্তশিষ্ট, একটু আত্মভোলা। কিন্তু ভিতরটা ছিল শুকনো খটখটে। ভালবাসতে চাইত না যে তা নয়। পারত না। যেমন কৃষ্ণ পারেনি। তুই পারিস না।
তোমার কৃষ্ণ আমার মাকে ভালবাসত না কেন জানো?
জানব না কেন? খুব জানি। তুইও তো সেই দুঃখে বাপকে দেখতে পারিস না। মা গায়ে আগুন দিয়ে মরল, সে তো দুঃখের কথা ঠিকই। কিন্তু কৃষ্ণকে দুষে লাভ কী রে ভাই? দোষ ওর স্বভাবের নয়, বংশের। তুই যে এত ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াস বলে শুনি, কেন জানিস? নাতবউকে ভালবাসতে পারিসনি বলে। যদি পারতিস তবে ঘরে এতদিন স্থিতু হয়ে যেতি।
ধ্রুব কৃত্রিম শঙ্কার গলায় বলে, তা হলে কী হবে, ঠাকুমা?
কী আর হবে! কতগুলো কপাল পুড়বে, যেমন আমার পুড়েছে।
কিন্তু শেষ অবধি তো তোমরা মিলেছিলে, ঠাকুমা!
রঙ্গময়ি হাত তুলে বলেন, ও কথা থাক। বলিস না। বড় ফুর্তির জোয়ার লেগেছিল বলে ভাবিস নাকি? বউকে ভাল না বাসলে কী হয়, সে ছিল ছেলে-পাগলা। তাও সব ছেলে নয়। ওই কৃষ্ণ। তা কৃষ্ণ ছেলের মতো ছেলে ছিল বটে। যেমন চেহারা, তেমনি সাহস, তেমনি তেজ। আবার বড় সৎ, দয়ালু। ছেলে ছাড়া সে আর কিছু বুঝত না। ঠিক সেই ধাত আবার পেল কৃষ্ণ। বউ বড় কথা নয়, ছেলেই সব। তাও সব ছেলে সমান নয়। তাদের মধ্যে বিশেষ একজন।
সেই ছেলে কে ঠাকুমা?
আহা জানিস না যেন।
কে বলো।
কেন, তুই!
আমি! তোমার কৃষ্ণ আমাকে দু চোখে দেখতে পারে না তা জানো?
জানি, খুব জানি। তোকে গালাগাল না দিয়ে নাকি জলস্পর্শ করে না।
তা হলে?
তা হলেও কিন্তু আছে রে ভাই। সে তুই বুঝবি না, বুঝতে চাসও না। এ যুগের ছেলেরা বাপের ভালবাসার তোয়াক্কা করছে ঘোড়াই। ওসব সেকেলে মায়া ভালবাসা তারা পছন্দও করে না। স্বার্থপরতার যুগ না এটা!
আমি কি স্বার্থপর?
নোস? ওরকম বাপকে তিলে তিলে দগ্ধে মারছিস, তোর মতো স্বার্থপর আছে?
কৃষ্ণকান্ত শেষ হচ্ছে তার নিজের কর্মফলে, ঠাকুমা।
তার কর্মফল তুই বিচার করবি কেন? তুই কি তার জন্ম দিয়েছিস? বিচার করতে হলে করবে আদালত, করবে দেশ, করবে ভগবান। তোর অত মাথাব্যথা কেন?
ঠাকুমা, রেগে যাচ্ছ।
রঙ্গময়ি একটু হাসলেন। বললেন, রাগ হয় রে। কৃষ্ণকে এইটুকু বেলা থেকে দেখেছি। একখানা আস্ত দেবশিশু। এতটুকু পাপ কোথাও ছোঁয়নি। কলিযুগের মানুষ বলে মনে হত না। সেই কৃষ্ণ পলিটিক্স করতে গিয়ে কত কাদা মাখল। মন্ত্রী হয়েছিল বলে কত লোকের চোখ টাটিয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণর মতো অত প্রাণ দিয়ে ভালবাসুক তো কেউ দেশকে! সেই ছেলেটা যখন এই বুড়ো বয়সে আমার কাছে এসে হাউহাউ করে কাঁদে তখন তোদের ওপর আমার রাগ হলে কি দোষ? তোরা কে তাকে কতদিন একটু সুখ একটু শান্তি দিয়েছিস?
কাঁদে?—ধ্রুব ভীষণ অবাক হয়ে বলে।
কাঁদবে না কেন? পাথর তো নয়? তবে সব চোখের জল জমা করে রেখে দেয়। আর কারও কাছে ঈদে না। আমার কাছে এসে কাঁদে।
রঙ্গময়ির চোখে একটু জল এল। মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে নিলেন। তারপর একটু সময়ের ফাঁক দিয়ে বললেন, আর কার কাছেই বা যাবে! কৃষ্ণর তো যাওয়ার জায়গা নেই।
এসব কথা শুনে যে ধ্রুবর বাপের ওপর স্নেহ উথলে উঠল মোটেই তা নয়। তবে সে কোনও কথাও বলল না। চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ আসি বলে উঠে চলে এল।
সন্ধের অনেক পর সে ধারার ফ্ল্যাটে পৌঁছাল।
ধারা কিছু করছিল না আজ। রেকর্ড-চেঞ্জারে একগাদা রেকর্ড চাপিয়ে বসে নিজের চুল এলোমেলো করছিল শুধু। ঠিক করেছিল আজ রান্নার ঝামেলা করবে না। শুধু ডিম ভেজে খেয়ে শুয়ে থাকবে।
এমন সময় ধ্রুব এল।
ধারা ভারী উদ্বেগের মুখ নিয়ে তাকিয়ে ধ্রুবর মুখে কী খুজল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার বউ কেমন আছে?
ভাল।
বাচ্চা?
ভাল।
বাব্বাঃ, বাঁচলাম। কাল থেকে যা ভাবছিলাম!
ধ্রুব আচমকাই ধারার দুধ শক্ত হাতে চেপে ধরে বলল, কী ভাবছিলে?
রেমি বাঁচবে কি না! ও বাবা, তুমি অমন খুনির মতো তাকাচ্ছ কেন?
ধ্রুব হাত সরিয়ে নিয়ে মাথা নেড়ে কী যেন একটা কিন্তু ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে। তারপর বলে, কিছু খাওয়াবে? আই অ্যাম হাংরি।
কী খাবে?
লাইট কিছু নেই?
থাকবে না কেন! সব আছে। কিন্তু তুমি কী খেতে চাও বলবে তত। ডিম ভেজে দিই?
ধ্রুব বিরক্ত স্বরে বলে, হোপলেস। যেখানেই যাব একটা করে ডিম ভাঁজার অফার। ওই বোগাস পোলট্রির ডিমগুলো তোমরা খাও কী করে বলো তো! আর কী অফার করতে পারো?
ধারা লজ্জিতভাবে হেসে বলে, পাউরুটি আছে। মাখন দিয়ে দেব?
দূর!
তা হলে? চিজ খাবে একটু?
ধ্রুব মাথা নাড়ল, না। বরং একটু চা করো।
শুধু চা?
ওতেই হবে। আর বি কুইক।
ধারা চলে গেলে ধ্রুব মুখে একটা ভ্রুকুটি মেখে বসে থাকে। মাঝে মাঝে কপালে হাত বোলায়। মাথাটা ধরে আছে। খুব ধরে আছে। অনেকদিন সে কলকাতার বাইরে যায় না। বড় রুদ্ধ লাগছে এখানকার বাতাস। কিন্তু সারা ভারতবর্ষেই সে একটা পুরনো বদ্ধ বাতাসের গন্ধ পায়। দেশ কি তার জানালা দরজা এঁটে বন্ধ করে রেখেছে! কিছু বইছে না তো! ধ্রুব উঠল। রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ধারা, আমার জন্য ভাত রাঁধবে?
ভাত! ও মা! খেলে করে দেব।
ভাত খাওয়ার পর যদি আমি শুতে চাই।
