রামকান্ত রায় একটু মাথা উঁচু করে বললেন, আরও নিতে হবে। আপনারা যদি একটু ঘবেব বাইরে যান তা হলে ভাল হয়।
কনক উঠে দাঁড়িয়ে একটু উষ্মর সঙ্গে বলে, স্ট্যাবিং-এর পর দশ-এগারো দিন কেটে গেছে, এখনও আপনারা কাউকে অ্যারেস্ট করতে পারেননি। কিন্তু একজন সিরিয়াস উন্ডেড লোককে খামোকা বকবক করিয়ে মারছেন। এটা কেমন কথা?
রামকান্ত রায় তাঁর আলিসান দেহটি নিয়ে স্তম্ভের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন শুধু। জবাব দিলেন না। স্থির দৃষ্টি হেমকান্তর মুখে নিবদ্ধ।
হেমকান্ত ছেলেদের দিকে চেয়ে মৃদুস্বরে বললেন, তোমরা যাও। কথা বলতে হলে বলব। চিন্তার কিছু নেই।
ছেলেরা চলে গেল।
হেমকান্ত বললেন, বসুন। কী খবর?
খবর একটা আছে। লোকটা ধরা পড়েছে।
হেমকান্ত চমকে উঠে বললেন, কে?
বলব। আপনিই তাকে আইডেনটিফাই করবেন।
হেমকান্ত চিন্তিত মুখে বললেন, সনাক্ত করব? কিন্তু আমি যে তাকে ভাল করে দেখিনি। অন্ধকার ছিল। আপনি তো জানেন।
সবই জানি। কিন্তু তবু কিছু লক্ষণ ঠিকই মেলাতে পারবেন। ধরুন হাইট, গলার স্বর, হাতের গড়ন এইসব কিছু না কিছু।
যা মনে পড়েছে সবই বলেছি।
এইবার লোকটাকে চোখে দেখুন। হয়তো আরও কিছু মনে পড়বে।
কবে যেতে হবে?
আপনি এখন কেমন আছেন? থানায় যেতে পারবেন?
আজ পারব না।
আজ নয় যেদিন পারবেন সেদিন গেলেই হবে। তবে দেরি করা চলবে না।
হেমকান্ত চুপ করে রইলেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটা ধরা পড়ুক তা তিনি চাননি।
আচমকা রামকান্ত রায় বললেন, হেমকান্তবাবু, একটা কথা বলব?
বলুন।
আমার প্রথম থেকেই কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি লোকটাকে চিনতে পেরেছেন। কিন্তু বলতে চাইছেন না।
০৭৬. ধ্রুব রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে
ধ্রুব রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে তার আঁকিবুকিওলা মুখে সেই নব যুবতীকে দেখবার চেষ্টা করছিল, যাকে দেখে মজে গিয়েছিল তার দাদু। সারাজীবন যথার্থ সংযম ও ঘটনাশূন্য কাটিয়ে বুড়ো বয়সে তিনি ওঁর প্রেমে মগ্ন হন। ধ্রুব প্রেম ব্যাপারটা আজও জানে না। সে কি খুব একটা ভসভসে আবেগ? এককেন্দ্রিক কাম? না ব্যাখ্যার অতীত আর কিছু? যে বয়সে তার দাদু প্রেমে পড়েছিলেন সেটা এ আমলের পক্ষে খুব বেশি বয়স নয়। প্রেমে পড়া চলে তো বটেই, হচ্ছেও আকছার। কিন্তু সেই আমলের পক্ষে সেটা স্বাভাবিক ছিল না। হেমকান্তের মতো সংযত পুরুষের তো আরও নয়।
রঙ্গময়ির মুখ-চোখে বেশ একটু সত্যিকারের খুশি ছড়িয়ে আছে। ধ্রুবর ছেলে হওয়া যেন তারও কিছু হওয়া। বুড়ো বয়সের এক ধরনের স্থায়ি ধরা গলায় রঙ্গময়ি বললেন, দেখছিস কী অমন হ করে? রূপ নাকি?
ধ্রুব একটু হাসল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, সত্যিই তাই, ঠাকুমা। আমি তোমার রূপ দেখছিলাম।
ও বাবা! আমি কিন্তু বয়সকালেও সুন্দরী ছিলাম না। তোর ঠাকুমার কাছে দাড় করালে তো বাঁদরি বলে মনে হত। আর তোর বউটাও ভারী ভাল দেখতে। তা তোদের এত রূপের বংশ, তুই আমার বুড়ো মুখের রূপ দেখছিস কী রে?
আমি দেখি বা না দেখি, একজন তো দেখেছিল। আমি তার চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি।
সে আবার কে?
সে দাদু। বলল তো তুমি যদি সুন্দরীই না হবে তবে তোমাকে দেখে দাদু মজেছিল কেন?
রঙ্গময়ি তেমন প্রাণ খুলে হাসলেন না। কেমন একটু স্নান দেখাল তাকে। ধরা গলায় বললেন, এই বুঝলি, দাদু?
কী বুঝব?
মজতে কি চেহারা লাগে রে! তা হলে তুই কেন মজলি না আমার অমন নাতবউ পেয়ে?
আমার কথা বাদ দাও।
কেন? তোর কথা বাদ থাকবে কেন? তুই কি সৃষ্টিছাড়া কিছু? সেই দাদুরই নাতি, সেই বাপেরই ছেলে। তোর কথা বাদ থাকবে কেন? তা তোর দাদুর কথাই ধর না, অমন বউ পেয়েছিল তবু কেমন যেন গা করত না। ঢলাঢলি ছিল না। তখন তো আর আমি প্রতিবন্ধক ছিলাম না, অন্য কোনও মেয়েও এসে মন টলায়নি। তবু ওরকম হয়েছিল কেন তার?
সেসব শুনব বলেই তো এসে বসলাম তোমার কাছে। বলো।
মজবার কোনও আইন নেই, নিয়ম নেই।
ধ্রুব মাথা নাড়ল। তারপর মুখ টিপে একটু হেসে বলল, একথাটা আমি মানি না। বুঝলে? সব কিছুরই একটা আইন আছে। থাকতেই হবে।
রঙ্গময়ি একটু হেসে বললেন, শোন পাগলা। মজবার একটা আইন বা নিয়ম আছে ঠিকই। কিন্তু সেসব জেনে কী করবি? তোদের বংশের পুরুষেরা কোনওকালে কাউকে দেখে মজেনি।
এই যে আমার দাদু মজেছিল তোমার রূপে!
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলেন, সে ধাতই তোদের নয়। সারাজীবন আমি তার তাঁবেদারি করেছি, সেবা দিয়েছি। কিন্তু ভবি কি ভোলে রে পাগল! সে পাথর শেষ অবধি গলেনি।
কী যে বলো!
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বাইরে থেকে অনেকরকম শোনা যায়। লোকে রটাতেও ভালবাসে। কিন্তু যে জানে সে-ই শুধু জানে। যখন শুনলাম তোর সঙ্গে নাতবউয়ের মিল হয় না তখন মনে মনে হেসেছিলাম। তারই নাতি তো। হবে কী করে? ওই যে কৃষ্ণ, পরের জন্য প্রাণটা দিতে পারে, বুকে কত সাহস, কত তেজ, তবু নিজের বউয়ের চোখের জল কোনওদিন ঘোচাতে পারেনি। তিন পুরুষ ধরে তোদের চিনি রে নিমকহারাম। রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনি। তোর দাদু দায়ে পড়ে আমাকে মেনে নিয়েছিল মাত্র।
ধ্রুব খুব শান্তভাবে রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে ছিল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা অস্থিরতা টের পাচ্ছিল সে। বংশের ধারা? বংশের ধারাই কি সে বহন করে চলেছে? এরকম তো কথা ছিল না। সে তো ধারাটা উলটো বওয়াতে চেয়েছিল।
ঠান্ডা গলাতেই ধ্রুব বলে, তুমি কি বলতে চাও হেমকান্ত চৌধুরী তোমাকে কোনওদিন ভালবাসেনি?
