হেমকান্ত আবার চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, এসব কথা যেন পাঁচ কান না হয়, বাবা। স্বদেশিদের মধ্যেও অনেক বাজে লোক আছে। অস্তিত্ব বিপন্ন হলে তারা মরিয়া হয়ে যা-খুশি করতে পারে।
কৃষ্ণকান্ত তার বাবার মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। মাথা নেড়ে বলল, আমি কাউকে বলিনি। তবে–
তবে কী বাবা?
স্বদেশিদের বোঝা উচিত যে কাজটা অন্যায় হয়েছে।
কিশোর ছেলের মুখে কথাটা শুনে একটু চমকে উঠলেন হেমকান্ত। যেন একজন বড় মানুষ কথা বলছে। তিনি একটু হেসে বললেন, তাদের বোঝাবে কে বলো? কেবল আবেগ নিয়ে যারা চলে তারা সবসময় যুক্তির ধার ধারে না। সত্যকেও অনেক সময় সত্য বলে স্বীকার করতে চায় না। তাদের বোঝাতে গেলেই বরং হিতে বিপরীত হবে। তার দরকার নেই।
কেন দরকার নেই, বাবা?
যা করার পুলিশ করবে। এটা তাদেরই কাজ।
পুলিশ কিছু করবে না।
হেমকান্ত অবাক হয়ে বললেন, একথা কে বলল তোমাকে?
শুনেছি। দারোগা রামকান্ত রায়ের আপনার ওপর খুব রাগ।
তাই নাকি? কেন বলো তো!
আপনার কাছে নাকি উনি একটা স্টেটমেন্ট চেয়েছিলেন, আপনি তা দেননি।
আমার স্টেটমেন্ট দেওয়ার কথা নয়। লিখিত পড়িত কিছু দেওয়া বিপজ্জনক বলেই আমি দিইনি। শচীনও বারণ করেছিল।
সেইজন্যই রাগ। আপনাকে স্ট্যাব করে যারা পালিয়েছে তাদের ধরার জন্য পুলিশ কিছুই করেনি।
হেমকান্ত উদাস গলায় বললেন, তাদের ধরেই বা কী হবে বলে তো! হয় জেলে আটকে রাখবে নয়তো ফাঁসি দেবে। তাতে আরও রাগ বাড়বে ওদের।
কৃষ্ণকান্ত চুপ করে থমথমে মুখে চেয়ে থাকে। দাঁতে দাঁত দৃঢ়বদ্ধ। চোখে রাগ, জল।
হেমকান্ত সস্নেহে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, আমার জন্য ভেবো না। মানুষের জীবনের একটা সীমারেখা আছে। সেটা পেরোনো যায় না। কিন্তু তা বলে সে শেষও হয় না। পুত্র-কন্যাদের মধ্যে বেঁচে থাকে।
কৃষ্ণকান্ত তার বাবার দিকে তাকায়। মাথা নেড়ে বলে, না বাবা, না।
না কেন কৃষ্ণ! আমার তো মনে হয় জীবনের সব কাজ আমার ফুরিয়েছে। আমার আর কিছু করার নেই। এই তো বিদায় হওয়ার সঠিক সময়।
কৃষ্ণকান্তর চোখ বেয়ে টসটস করে জল গড়িয়ে পড়ে।
হেমকান্তও কাঁদলেন। বহুদিন পর বুক-ভাঙা এক শোক অনুভব করছেন আজ। আশ্চর্য, সেই শোক নিজেরই জন্য। ছেলের পিঠে হাত রেখে অবরুদ্ধ গলায় অস্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, আমার তো মনে হয়, তোমার মতো উজ্জ্বল একটি ছেলের বাবা হওয়াই আমার জীবনের উদ্দেশ্য ছিল। এখন তুমি যদি বেঁচে থাকো, মানুষের মতো মানুষ হও, তবে আর চিন্তা কী?
আপনি ওকথা বলছেন কেন বাবা? আপনার শরীর খারাপ নয় তো?
না। আমি তো ভালই আছি। ভাবছিলাম, যদি আবার কেউ আমাকে মারে? আমি রাজনীতি জানি না, বুঝি না। তা নিয়ে আমার চিন্তাও নেই। আমি শুধু বুঝি, স্বদেশির রূপ ধরে যে মারতে আসবে সে আমার নিয়তি ছাড়া অন্য কিছু নয়।
মনুপিসি তো বলছে, আপনাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবে।
বাপের ভিটে ছেড়ে কোথায় যাব, বাবা? কলকাতাই কি আর বাঁচিয়ে রাখবে? সেখানেও মরণ আছে। তাছাড়া সেখানে কনক সংসার পেতে বসেছে। আমি গেলে ওদের অসুবিধে হবে।
কৃষ্ণকান্ত কী বলবে? চুপ করে রইল।
হেমকান্ত চোখ বুজে ধীর স্বরে স্বগতোক্তির মতো বলতে লাগলেন, এই নদী, গাছপালা, বাগান, এই নরম মাটির গন্ধ, কত স্মৃতি এসব ছেড়ে কোথায় যাব? মানুষের বাড়ি কীরকম জানো? সে শুধু ইট কাঠ পাথর তো নয়। বংশানুক্রমে একটি পরিবারের বসবাসের ফলে সেখানে একটা প্রাণ জেগে ওঠে। তুমি কি তা টের পাও?
কৃষ্ণকান্ত কান্না গিলে বাবার দিকে বিস্ময়ভরে চেয়েছিল। এরকম তারও মনে হয়। তবে শুধু ওই বাড়ি নয়, তার চারপাশে যা কিছু আছে সবকিছুর মধ্যেই একটা জীবনের আভাস পায় সে। কাকার যে ঘরখানায় সে থাকে তার বাতাসে আজও সে কাকার খাসের শব্দ পায়। তার তো প্রায়ই মনে হয়েছে, তার মা দেহহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, দোতলার রেলিং ধবে ঝুকে তাকে রোজ দেখে, যখন সে ঘোড়ায় চড়ে বা সাইকেল চালায়, মৃতেরা যে সবাই বেঁচে আছে এটা শুধু সে বিশ্বাসই করে না, সে জানে।
সে বলল, করি বাবা।
হেমকান্ত স্বপ্নাতুর চোখে ছেলের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। তার মধ্যে নানা দুঃসাহসী স্বপ্ন জেগে ওঠে। ছেলেকে নিয়ে সকলেই স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এ তা নয়। নিজের এই ছেলেটির মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম অনুভূতি আছে বলে তিনি টের পান।
ক্লান্ত হেমকান্ত চোখ বুজলেন।
আপনি ঘুমোন, আমি যাই।
রোসো। একটু বসে থাকো আমার কাছে। তোমার বড়দা মেজদা সব কোথায়?
ওঁরা বেরিয়ে গেছেন। বউদি আর দিদিরা সব নীচের বৈঠকখানায় পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে গল্প করছেন।
ওরা খুব নিশ্চিন্ত, না? ভাল। খুব ভাল।
আপনার শরীর ভাল নয় বলে ডাক্তার এ ঘরে ভিড় করতে বারণ করেছেন।
হ্যাঁ। শরীরটা ভাল নয় ঠিকই। বড় ক্লান্ত। তবে কেউ কেউ কাছে থাকলে ভাল লাগে, এই যে তুমি বসে আছ কাছে, তাতে আমার খুব ভাল লাগছে।
তার প্রতি হেমকান্তর বিশেষ দুর্বলতার কথা কৃষ্ণকান্ত জানে। তাই সে লজ্জায় মুখ টিপে একটু হাসল। হেমকান্ত তার একখানা হাত ধরে থেকে চোখ বুজে রইলেন।
দুটি রক্তস্রোত পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
রামকান্ত রায় এলেন বিকেলে, তার চেহারায় একটা দৃপ্ত স্পর্ধিত ভাব দেখা যাচ্ছিল। ঘোড়া থেকে নেমে গটগট করে ওপরে উঠে এলেন। কারও অনুমতি নেওয়ার তেমন প্রয়োজন বোধ করলেন না।
হেমকান্তকে ছানা খাওয়ানো হয়েছে একটু আগে। উঁচু তাকিয়ায় আধশোয়া হয়ে বড় আর মেজো ছেলের সঙ্গে মৃদু স্বরে কথা বলছিলেন। রামকান্ত রায় ঘরে ঢোকায় কনকান্তি বিরক্ত হল। বলল, কী চাইছেন আবার? এজাহার তো অনেক নেওয়া হয়েছে।
