তোমার স্বদেশিরাই তো মারতে চেয়েছিল আমাকে। ওদের ধারণা আমিই শশীকে ধরিয়ে দিয়েছি। কাজেই তোমার তো ভয় পেলে চলবে না, মনু। তোমার আদরের স্বদেশিরা আমাকে মারবে, তোমাকেও তার জন্য বাহবা দিতে হবে।
খুব বিঁধিয়ে কথা বলতে শিখেছ তো! এতদিনে এই বুঝলে!
হেমকান্ত ক্ষীণ হেসে বললেন, কী বুঝব তা জানি না। তবে ছোরা খাওয়ার পর আমার ভয়-ডর কেটে গেছে। বেশ ঝরঝরে লাগছে মনটা। জীবন কি আবার শুরু করা যায়, মনু?
কী জানি? তুমি তো আর বুড়ো হওনি। জীবন শুরু করতে বাধা কী? শুধু একটা কথা আমার রাখো। এখানে আর নয়।
তবে কোথায়?
কলকাতায় কনকের কাছে গিয়ে থাকো, না হয় তো অন্য কোথাও।
এস্টেটের কী অবস্থা হবে তা হলে?
সে কথাও আমি ভেবে রেখেছি। বিশাখার বিয়ে দিয়ে দাও। শচীন সব দেখাশোনা করবে।
শচীন? সে কি বিশাখাকে বিয়ে করবে আর?
বিয়ের পিড়িতে ওঠার জন্য পা বাড়িয়ে রয়েছে।
বলো কী? বলে হেমকান্ত একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, কিন্তু এখন তো আর তা হয় না।
কেন হবে না?
শচীন বিশ্বাসযোগ্য নয়। সে আমার বংশের মর্যাদা নষ্ট করতে বসেছিল।
হিরের আংটির আবার বাঁকা আর সোজা!
যে বিশ্বাসযোগ্য নয় তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে পারব না, মনু।
শোনো। শচীন তেমন ছেলে নয় যে অন্যের ঘরের বউকে ফুসলে নিয়ে যাবে। তোমার বউমার ব্যাপারে আমি তো তার দোষ দেখি না। বউমা নিজে এত লোঢলি করেছিল যে বেচারার মাথা খারাপ হয়ে গেল। আমি তার সঙ্গে কথা বলে দেখেছি। খুব অনুতপ্ত, লজ্জায় মুখ দেখাতে চায় না। তাছাড়া দেখলে তো, এই ঘটনার পর কেমন ছোটাছুটি করল। তিন রাত্রি ঘুমোয়নি।
সবই বুঝলাম মনু, তবু মনটা সায় দেয় না।
যদি বিশাখা রাজি থাকে?
বিশাখা রাজি হবে? কী বলছ! সে তো বরাবর অরাজি।
সব ঘটনা তুমি জানো না জেনে কাজও নেই। তবে আমি জানি। বিশাখার এখন অমত তো নেই-ই, বরং আগ্রহই আছে।
হেমকান্ত চুপ করে ছাদের দিকে চেয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর বললেন, আচ্ছা ভেবে দেখি।
বেশি ভেবো না গো। তোমাকে আর বেশিদিন এখানে থাকতে দিতে আমার ভয় করে।
সে তো বুঝলাম, মনু। কিন্তু কলকাতাতেই বা আমার কীসের স্বস্তি? সেখানে কনকের সংসার, আমার সেখানে ভাল লাগবে না। বাপ-পিতামহর এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও গিয়ে কি ভাল লাগার কথা?
সে বললে তো হবে না। আগে প্রাণটা বাঁচুক।
আমি চলে গেলে তোমার কী হবে, মনু?
আমার আবার কী হবে?
পারবে থাকতে আমাকে ছেড়ে?
রঙ্গময়ি স্তব্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। দুটো চোখ ফের টসটসে হয়ে ওঠে জলে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, তোমার ভালর জন্য সব পারি।
হেমকান্ত চোখ বুজলেন। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ধীর স্বরে বললেন, আজই সব ব্যাপারে মতামত চেয়ো না। আমাকে ভাবতে দাও।
রঙ্গময়ি তার কপালে একবার হাত রাখল। বলল, ঘুমোও। পরে আসব।
হেমকান্ত বললেন, ঘুম কি আসে? এক কাজ করো, কৃষ্ণকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।
দিই।–বলে রঙ্গময়ি চলে গেল।
হেমকান্ত চোখ বুজে শরীরের গভীর অবসাদ টের পাচ্ছিলেন। মৃত্যু স্পর্শ করে গেল তাঁকে। কত কাছ দিয়ে গেল। পলকের জন্য অবগুণ্ঠন উন্মােচন করে দেখিয়ে দিয়ে গেল তার মুখ। তবু রহস্যময় মৃত্যুর সবটুকু দেখা হল না। কিছু বাকি রয়ে গেল। আবার অপেক্ষা। সে অপেক্ষা কি খুব দীর্ঘ হবে?
শরীর! শরীর ছাড়া অস্তিত্ব নেই। এই বাহ্য রূপ, এই ক্ষুধা তৃষ্ণা কামাতুর দেহ নিয়ে তার কত না দুশ্চিন্তা ছিল। ছিল মৃত্যুভয়। আজও আছে হয়তো। কিন্তু মৃত্যুর ক্ষণিক নৈকট্য তাকে অনেক জড়তামুক্ত করেছে। মনে হচ্ছে, সাহসের সঙ্গেই একদিন এই দেহ ছাড়তে পারবেন, যখন সময় হবে।
আসব, বাবা?
হেমকান্ত চোখ খুলে হাসলেন। হাত বাড়িয়ে বললেন, এসো।
তাঁর প্রিয় কনিষ্ঠ পুত্রটি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। দীর্ঘ গড়ন আর দেবদূতের মতো পবিত্র মুখশ্রী। দেখলেই তার মন ভরে যায়। জায়া শব্দের অর্থ যার ভিতর দিয়ে পুরুষ আবার জন্মগ্রহণ করে। স্ত্রীর ভিতর দিয়ে হেমকান্ত তাঁর পুত্র-কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু এই কনিষ্ঠ পুত্রটির দিকে তাকিয়ে তার আজ মনে হল, এই দেবশিশুর মধ্যেই তার জন্মগ্রহণ বুঝি সবচেয়ে সার্থক হয়েছে।
বিছানায় তার পাশে এসে বসল কৃষ্ণকান্ত। মুখখানা শুকনো। চোখদুটো করুণ।
আপনি কেমন আছেন বাবা এখন?
তোমরা ভাল থাকলেই আমি ভাল। এখন আর নিজের একার ভাল থাকাটাকে বেশি মূল্য দিই। তোমাদের সবাইকে নিয়ে তো আমি।
কথাটা নতুন। ঠিক এরকম কথা হেমকান্তর মুখে কখনও শোনেনি কৃষ্ণকান্ত। সে স্থির করল, কথাটা তার খাতায় টুকে রাখবে। আজকাল সে একটা উদ্ধৃতি লিখে বাখার খাতা করেছে। বাবার কথাটা তার বড় ভাল লাগল।
কৃষ্ণকান্ত বলল, আমি স্কুলের সেই ছেলেটাকে ধরেছিলাম।
কোন ছেলেটাকে?
ক্লাস নাইনের চুনীলাল।
সে আবার কী করেছে?
আপনাকে যেদিন স্ট্যাব করা হয় তার কয়েকদিন আগে চুনী আমাকে বলেছিল, স্বদেশিরা নাকি আপনাকে মারতে চায়।
বলেছিল?—হেমকান্ত গম্ভীর হয়ে একটু ভাবলেন। সন্দেহটা ছিলই, এখন সাক্ষ্যেরও সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সে যাই হোক, আমাদের ও নিয়ে আর দুশ্চিন্তাব কারণ নেই। ছেলেটা কী বলল?
প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। আমি একটু ভয় দেখাতেই বলল, সে শুনেছে ননীলালবাবুর কাছে।
কোন ননীলাল? মেছোবাজারে যার তামাকের দোকান?
হ্যাঁ।
